kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও প্রবাসী আয়ে উল্টো গতি

শেখ শাফায়াত হোসেন ও জামাল হোসেইন   

২১ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



জনশক্তি রপ্তানি বাড়লেও প্রবাসী আয়ে উল্টো গতি

নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও গত বছর থেকে জনশক্তি রপ্তানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। সেই হিসাবে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স তো বাড়েইনি, উল্টো কমছে।

ইউএস ডলারের বিপরীতে অন্যান্য মুদ্রার দরপতনের ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডির মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দরপতনের ফলে মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশের শ্রমিকদের আয় কমে যাওয়া এবং সেখানকার চলমান রাজনৈতিক ও সামাজিক অস্থিরতাকে রেমিট্যান্স কমে যাওয়ার কারণ বলে মনে করছে সংশ্লিষ্টরা।

জনশক্তি রপ্তানি ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) প্রকাশিত তথ্যে দেখা গেছে, ২০১৫ সালে পাঁচ লাখ ৫৫ হাজার ৮৮১ জন বাংলাদেশি অভিবাসন নিয়ে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমিয়েছে। যা এর আগের বছরে ছিল চার লাখ ২৫ হাজার ৬৮৪ জন। সে হিসাবে গত বছরে জনশক্তি রপ্তানি বেড়েছে এক লাখ ৩০ হাজার ১৯৭ জন, অর্থাৎ ২৩.৪২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিদেশে গেছে পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ২৭৫ জন। জনশক্তি রপ্তানির বিদ্যমান ধারা অব্যাহত থাকলে তা আগের বছরকেও ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করছে সংশ্লিষ্টরা।

তবে গত বছর এবং চলতি বছর জনশক্তি রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও এর আগের দুই বছর এর প্রবণতা কিছুটা কম ছিল। ২০১২ সালে ছয় লাখ সাত হাজার বাংলাদেশি কাজের উদ্দেশ্যে বিদেশ যায়। ২০১৩ সালে এই সংখ্যা কমে চার লাখ ৯ হাজারে নামে। ২০১৪ সালে জনশক্তি রপ্তানি সামান্য বেড়ে চার লাখ ২৫ হাজার হয়।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) ৩২৩ কোটি ২১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছে প্রবাসীরা। গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স এসেছিল ৩৯৩ কোটি ৩৬ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে রেমিট্যান্স কমেছে ১৭.৮৩ শতাংশ।

তা ছাড়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে এক হাজার ৪৯২ কোটি ৬২ লাখ ডলারের প্রবাসী আয় দেশে আসে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এসেছিল এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। সেই হিসাবে গত অর্থবছরে ২.৫৫ শতাংশ রেমিট্যান্স কম এসেছে। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রবাসী আয়ে প্রবৃদ্ধি ছিল ৭.৬ শতাংশ। এর আগে ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমেছিল ১.৬৫ শতাংশ।

অর্থনীতির বিশ্লেষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বেশ কয়েকটি দেশে জনশক্তি রপ্তানি কম এবং ওই দেশগুলোতে তেলের দর পড়ে যাওয়ায় সার্বিকভাবে সেখানকার অবকাঠামো উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়েছে রেমিট্যান্সে।

অভিবাসন নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ইউনিট দ্য রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট বা রামরুর সভাপতি তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রেমিট্যান্স কমার প্রধান কারণ হলো ২০১২ সালের পর থেকে ২০১৪ পর্যন্ত অভিবাসন বা দেশের বাইরে যাওয়া লোকের সংখ্যা কমেছে। ২০১৫ সালে অভিবাসন কিছুটা বেড়েছে। তবে সেটিও আগের বছরের কম ছিল বলে পরের বছর বেশি দেখাচ্ছে। তা ছাড়া নতুন করে যারা যাচ্ছে তাদের রেমিট্যান্স পাঠাতে বছরখানেক লাগবে। তো এভাবে অভিবাসন কমলে তার একটা প্রভাব রেমিট্যান্সে পড়বেই। আরেকটি বড় কারণ হলো মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তেলের দাম পড়ে যাওয়ায় ওই অঞ্চলের দেশগুলোর অনানুষ্ঠানিক খাতে কাজ কমছে। অনেক অভিবাসী হয়তো মূল কাজের পাশাপাশি অন্য একটি কাজ করত, যেটি এখন করতে পারছে না। সেই কারণেও আগের তুলনায় রেমিট্যান্স অনেকটা কমে এসেছে।

সাম্প্রতিক সময়ে জঙ্গি হামলা ও জঙ্গি অর্থায়ন নিয়ে বাড়তি সতর্কতার প্রভাব এতে পড়লেও এমন পরিস্থিতির জন্য হুন্ডিকেই দায়ী করছেন অভিবাসী উন্নয়ন প্রোগ্রামের (ওকাপ) চেয়ারম্যান শাকিরুল ইসলাম।

শাকিরুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন দেশে মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে লাভের আশায় হুন্ডির মাধ্যমে দেশে অর্থ পাঠাতে উৎসাহী হচ্ছে প্রবাসীরা। ব্যাংকসহ বৈধ পথে বিদেশি মুদ্রার হিসাব কষে রেমিট্যান্সের তথ্য দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। হুন্ডির মাধ্যমে আসা অর্থের হিসাব কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাবে থাকে না। ’

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘একসময় দেশের সার্বিক পরিস্থিতি যা-ই থাকুক না কেন, রেমিট্যান্সের প্রবাহ ভালো ছিল। কিন্তু যখন আমরা আরো উন্নতি করতে চাচ্ছি, সেই সময়ে রেমিট্যান্স কমে যাওয়া এক ধরনের বাড়তি চাপ। ’

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব জাবেদ আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জনশক্তি রপ্তানি বাড়ার পরও কেন রেমিট্যান্স কমছে তা অনুসন্ধানের চেষ্টা চলছে। যারা বিদেশে আছে, তারা কিভাবে টাকা পাঠায়, ব্যাংকিং চ্যানেলে নাকি অন্য কোনো পন্থায়, সে বিষয়টিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ’


মন্তব্য