kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্যাংকঋণে উপেক্ষিত কৃষিপ্রযুক্তি

মোশতাক আহমদ   

২০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাংকঋণে উপেক্ষিত কৃষিপ্রযুক্তি

কুড়িগ্রামের নিভৃত গ্রাম প্রতাপ। এ গ্রামের কৃষক আলমগীর হোসেন গত বছর একটি বেসরকারি কম্পানির কাছে সাড়ে তিন লাখ টাকা ডাউন পেমেন্ট করে একটি ট্রাক্টর কেনেন কিস্তিতে।

বাকি টাকা ৩০টি কিস্তিতে—মাসে প্রায় ৪৬ হাজার টাকা পরিশোধ করতে হবে। আরো প্রায় ১৪ লাখ টাকা দিতে হবে তাঁকে।

এ হিসাবে ১২ লাখ ৭০ হাজার টাকা দামের একটি ট্রাক্টর কিনতে তাঁকে গুনতে হবে প্রায় সাড়ে ১৭ লাখ টাকা। এটি যদি সরকারি বা বেসরকারি ব্যাংক থেকে কৃষিঋণ নিয়ে কেনা যেত তাহলে তাঁর সাশ্রয় হতো পাঁচ লাখ থেকে ছয় লাখ টাকা।

শুধু আলমগীর হোসেন নন, সারা দেশে হাজার হাজার কৃষককে বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে কৃষি যন্ত্রপাতি কিনতে গিয়ে। কারণ তারা কৃষিঋণ নিতে পারছে না। সরকার বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে প্রতিবছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ বাবদ দিচ্ছে। অনেক ব্যাংক এ ঋণ দিতে পারছে না। ঋণ বিতরণ করতে না পারায় গত বছর চারটি ব্যাংকের কাছ থেকে ১৪০ কোটি টাকা কেটে রাখে বাংলাদেশ ব্যাংক।

সংশ্লিষ্টরা বলছে, সরকার কৃষি খাতে স্বল্প সুদে ঋণের ব্যবস্থা করেছে। তবে বিতরণনীতিতে স্পষ্টতার অভাব রয়েছে। সেটি ঠিক করে দিলেই কৃষক সহায়তা পেতে পারে।

আলমগীর হোসেন বলেন, তিনি দুই বছর আগে রাজশাহী কৃষি ব্যাংকের কুড়িগ্রাম শাখায় গিয়ে ট্রাক্টর কেনার জন্য ঋণ চান। ম্যানেজার তাঁকে সাড়ে চার বিঘা জমি মর্টগেজ করতে ও কাগজপত্র জমা করতে বলেন। কিন্তু নিজের জমি না থাকায় তিনি ঋণ নিতে পারেননি।

সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বলে, বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে প্রাইভেট কার কেনার জন্য ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ডাউন পেমেন্টে ১৪ লাখ থেকে ১৬ লাখ টাকা, কখনো কোটি টাকা কনজ্যুমার ঋণ পাওয়া যায়। এর জন্য জমির মর্টগেজ লাগে না। গাড়িটিই ব্যাংকের কাছে মর্টগেজ হিসেবে থাকে। কৃষি যন্ত্রপাতি মর্টগেজ রেখে কৃষককেও এভাবে ঋণ দেওয়া যায়। কিন্তু সেই ব্যবস্থা নেই। যন্ত্রপাতির আমদানিকারকরা ঠিকই ঋণ পাচ্ছে।

ঋণের প্রাইভেট কার বা অন্য গাড়ির নিবন্ধন হয় ব্যাংকের নামে। ঋণগ্রহীতা ব্যাংকের অনুমতি ছাড়া তা বিক্রি বা হস্তান্তর করতে পারে না। কিন্তু কৃষিযন্ত্রের (ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার প্রভৃতি) নিবন্ধন হয় না। ফলে মালিক বিক্রি বা হস্তান্তর করলে দায় চাপে ব্যাংকের ওপর। তাই তারা ঝুঁকি নিতে চায় না। ব্যাংক সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা বলেন, নীতিতে বদল ঘটিয়ে বা শর্ত শিথিল করে এ সমস্যার সমাধান করা যেতে পারে।

বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান ইব্রাহিম খালেদ বলেন, মাঠপর্যায়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর মনিটরিং অনেক বেড়েছে। তাই শর্ত শিথিল করে হলেও কৃষকদের ঋণ দেওয়া উচিত।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক বিঘা জমিতে হালের চাষে যে সময় লাগে কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করলে তার চল্লিশ ভাগের এক ভাগেরও কম সময় লাগে। খরচও অনেক কম। আগামী দিনের কৃষি যন্ত্রনির্ভর হবে। তারা বলে, কৃষকদের কৃষিপ্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা করতে হবে সরকারকে।

কৃষিযন্ত্র আমদানিকারকরা জানায়, উত্তরাঞ্চলীয় বিভিন্ন জেলা এবং যশোর, খুলনা, বরিশাল, কুষ্টিয়া, নোয়াখালী প্রভৃতি জেলায় বছরে সাড়ে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার ট্রাক্টর এবং ৩৫ হাজার থেকে ৪০ হাজার পাওয়ার টিলার বিক্রি হয়। তারা বছরে দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করে। কিছুটা ঝুঁকি রয়েছে। তবে আড়াই শ কোটি থেকে তিন শ কোটি টাকা মুনাফা হচ্ছে। তারা বলে, কৃষক যদি ব্যাংক ঋণ নিয়ে কৃষিযন্ত্র কিনতে পারত তবে তারা উপকৃত হতো, দেশও উপকৃত হতো। কৃষিপণ্যের দাম নাগরিকদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকত।

কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানিকারক একটি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা ব্যাংক থেকে শত কোটি টাকা ঋণ পাই। কিন্তু যাদের ঋণ দরকার সেই কৃষক পায় না। সরাসরি ঋণ পেলে তারা লাভবান হবে। কৃষিপণ্যের দাম কমবে।

সরকারের খামার যান্ত্রিকীকরণ প্রকল্পের পরিচালক শেখ মো. নাজিম উদ্দিন বলেন, কৃষক ঋণ ফেরত দেবে না তা নয়। এ জন্য সুষ্ঠু মনিটরিং দরকার।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো তাদের মোট ঋণের দুই শতাংশ কৃষি ও পল্লীঋণ হিসেবে বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করে থাকে। এর মাত্র ০.৮৩ শতাংশ বিতরণ করা হয় কৃষিযন্ত্র (সেচ, চাষ, কাটা ও মাড়াই) বাবদ। গত এক বছরে এ ঋণ প্রায় ১০ শতাংশ কমেছে।

সূত্র জানায়, এ বছর সেচ ও কৃষি যন্ত্রপাতি বাবদ ঋণ দিতে বিশেষভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে। নির্দেশনা এরই মধ্যে পেয়েছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।

বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংক সিটি ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারুক মইন উদ্দিন বলেন, ‘আগে কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণে তেমন বাধ্যবাধকতা ছিল না। গত কয়েক বছরে এ বিষয়ে সরকার নজর দিয়েছে। এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা অনুযায়ী বরাদ্দের পুরো টাকাই কৃষকদের মাঝে বিতরণের ব্যবস্থা নিচ্ছি। ’ তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংক ভালো একটি ব্যবস্থা করেছে—এনজিওর মাধমেও এ ঋণ বিতরণ করা যাবে। তৃণমূলে অনেক ব্যাংকের শাখা নেই। তারা এনজিওর মাধ্যমে কৃষিঋণ বিতরণ করছে। ’

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকারি-বেসরকারি ৫৫টি ব্যাংকের জন্য কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয় ১৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ব্যাংকগুলো বিতরণ করেছে ১৭ হাজার ৬৪৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ এক হাজার ২৪৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা বেশি ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। তবে ১০টি ব্যাংক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এসবের মধ্যে ছয়টি সরকারি, তিনটি বেসরকারি ও একটি বিদেশি ব্যাংক রয়েছে। তারা ৭৪২ কোটি ১৫ লাখ টাকা কম বিতরণ করছে। ছয়টি সরকারি ব্যাংক ৬০২ কোটি ৩৪ লাখ টাকা এবং অন্য চারটি ব্যাংক ১৩৯ কোটি ৮১ লাখ টাকা কম বিতরণ করেছে। বেসরকারি চারটি ব্যাংক যে পরিমাণ টাকা কম বিতরণ করেছে, সে পরিমাণ টাকা কেটে রাখবে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে পরে অতিরিক্ত ঋণ বিতরণ করলে এ অর্থ ফেরত পাবে।

এবার বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, মোট কৃষিঋণের ৩০ শতাংশ যেন যন্ত্রপাতি উপখাতে বিতরণ করা হয়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কৃষকদের মর্টগেজ দেওয়ার সামর্থ্য নেই। তাই নির্দেশনা কতটুকু কার্যকর হয় সেটিই দেখার বিষয়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হতে হলে বছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি সাত শতাংশ হওয়া দরকার। কৃষি ক্ষেত্রে চার থেকে সাড়ে চার শতাংশ প্রবৃদ্ধি ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তার জন্য দরকার উন্নত কৃষি উপকরণ ও নতুন প্রযুক্তি। শস্য খাতে উৎপাদন এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। সেটিকে ধরে রেখেই আরো উন্নত কৃষিপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। যন্ত্রপাতি বাবদ ঋণ দিতে ব্যাংকগুলোকে স্পষ্ট নির্দেশনা দিতে হবে।

চলতি অর্থবছরে (২০১৬-১৭) ১৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকা কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত ৩১ জুলাই এ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কৃষি ও পল্লীঋণ নীতিমালা ও কর্মসূচি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ৯ হাজার ২৯০ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য আট হাজার ২৬০ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, শস্য চাষের জন্য আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত স্বল্পমেয়াদি কৃষিঋণ দিতে সিআইবি রিপোর্টিং ও সিআইবি ইনকোয়ারি লাগবে না। এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের অনুমতি পাওয়া ব্যাংকগুলো কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ করতে পারবে। কমিশন বা সার্ভিস চার্জ হিসেবে তারা নির্ধারিত সুদের অতিরিক্ত ০.৫০ শতাংশ আদায় করতে পারবে।

এ ছাড়া বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে কৃষি ও পল্লীঋণের নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার কমপক্ষে ৩০ শতাংশ নিজস্ব কাঠামো ব্যবহার করে বিতরণ করতে হবে। কৃষি যন্ত্রপাতির জন্য প্রদেয় ঋণ কৃষিকাজে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সব ব্যক্তিকে একক বা দলগতভাবে দেওয়া যাবে। এ ঋণের সুদের সর্বোচ্চ সীমা হবে ১০ শতাংশ। পেয়ারা উৎপাদনেও ঋণ দেওয়া যাবে। অমৌসুমি সবজি বা ফল চাষের জন্য একরপ্রতি ঋণসীমার অনধিক ২৫ শতাংশ বিতরণ করা যাবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের সুপারনিউম্যারি অধ্যাপক ও পূবালী ব্যাংকের সাবেক প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হেলাল আহমেদ চৌধুরী বলেন, কৃষিঋণ বিতরণ কার্যক্রমে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভূমিকায় খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এসেছে। এটি ধরে রাখতে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো ঋণদানে বহুমুখিতা আনতে পারে। প্রযুক্তি ও যন্ত্রে ঋণ দিলে কৃষকের উৎপাদন খরচ কম হবে। তাদের মুনাফা বাড়বে। ফলে তারা দ্রুত ঋণ ফেরত দিতে উদ্বুদ্ধ হবে।


মন্তব্য