kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দেশের পোশাক খাতের বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে চীন

সায়েম টিপু   

১৮ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



দেশের পোশাক খাতের বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে চীন

বাংলাদেশ ২০২১ সালের মধ্যে পোশাক খাতে ৫০ বিলিয়ন ডলার রপ্তানি আয় করতে চায়। অন্যদিকে চীনও চায় নিজেদের উৎপাদন সক্ষমতা রপ্তানি করতে।

এ ক্ষেত্রে চীন যদি বাংলাদেশ থেকে আউটসোর্সিং করে, তবে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে বলে মনে করে এ খাতের উদ্যোক্তারা। এ ছাড়া চীনের কম্পানিগুলোর উন্নত প্রযুক্তি ও পেশাদার ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা এই সম্ভাবনাকে আরো কার্যকর করবে বলে তারা মনে করে।

উদ্যোক্তারা জানায়, এ মুহূর্তে প্রতিযোগিতাপূর্ণ পোশাকশিল্পের জন্য বাংলাদেশকে বেশ গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করে চীন। কারণ তারা নিজেদের শিল্প খাত হালনাগাদ করার চেষ্টা করছে। তাই সুলভ মূল্যে শ্রমশক্তিপ্রধান বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ করার অনেক সুযোগ আছে।

উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্টের বাংলাদেশ সফর দুই দেশের অর্থনৈতিক এবং দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি ফলপ্রসূ এবং গুরুত্বপূর্ণ করেছে। তারা মনে করে, চীনের উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ করলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি আয় অনেকটাই সম্ভব। চীনের প্রেসিডেন্টের সফরকালীন ২৭টি চুক্তি এবং ২৪.৪৫ বিলিয়ন ডলারের আর্থিক সহযোগিতার চুক্তি এটাই প্রমাণ করে। তবে সব কিছুই নির্ভর করে চুক্তি ও বিনিয়োগ বাস্তবায়নে বাংলাদেশের দক্ষতার ওপর।

তবে বিনিয়োগে বাংলাদেশের কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে উল্লেখ তারা জানায়, বাংলাদেশের দুর্বল পরিবহন অবকাঠামো, রেলওয়ে ও বন্দরের সক্ষমতা সীমিত এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ খুবই অপর্যাপ্ত। অনেক মানুষ হালকা শিল্পের শ্রমিক এবং কৃষক। এ ছাড়া পেশাদার টেকনিশিয়ান এবং ব্যবস্থাপক সংকটও রয়েছে বাংলাদেশের। আইনি ও আয়কর পদ্ধতিতেও চীনের সঙ্গে পার্থক্য রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ‘চীন বাংলাদেশের অবকাঠামো, জ্বালানি এবং বস্ত্র খাতে বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এর ফলে উচ্চমূল্য সংযোজনী পণ্যে দেশটি বিনিয়োগ করলে তাদের কারিগরি অভিজ্ঞতা আমাদের পোশাক খাতে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এ ছাড়া চীন যেহেতু আমাদের পাশাপাশি দেশ, তাই বাংলাদেশে উৎপাদন খরচ কম হবে, জাহাজের ভাড়া কম লাগবে এবং লিড টাইমও কমবে। ’ তাঁর প্রত্যাশা, আগামীতে চীন হবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানির বড় বাজার।

এদিকে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চীন প্রতিবছর দেড় ট্রিলিয়ন ডলারের পণ্য আমদানি করে। তবে দেশটি প্রধান যে পাঁচটি পণ্য আমদানি করে এর কোনোটাই রপ্তানি করে না বাংলাদেশ। এ ছাড়া তৈরি পোশাক খাতে চীনের অভ্যন্তরীণ বাজার প্রায় ৩০ হাজার কোটি ডলারের। আর এর ৯০ শতাংশই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে দেশটি। যে ১০ শতাংশ আমদানি করে সেখানে বাংলাদেশের হিস্যা ১০০ ভাগের এক ভাগ।

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর বলেন, বাংলাদেশে যেটি নেই, চীন এসব পণ্য আমদানি করে। এই পণ্যগুলো হলো প্রাইমারি প্রোডাক্ট এবং ইন্টার মিডিয়েট প্রোডাক্টস। অর্থাৎ এক ধরনের ভ্যালু চেইন প্রোডাক্ট। ফলে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি সম্ভাবনা সবটুকুই নির্ভর করছে তৈরি পোশাক খাতে।

আহসান এইচ মনসুর আরো বলেন, এক গবেষণায় দেখা গেছে, চীনের তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান ২৭০ বিলিয়ন ডলারের বাজার আগামী ২০১৯ সালের মধ্যে অন্তত ৩৩০ বিলিয়ন ডলারে ছাড়িয়ে যাবে। তবে সেই বাজারের মাত্র ১২ শতাংশ বা ৩২ বিলিয়ন ডলার আমদানি করে মেটানো হয়। এর মধ্যে গত অর্থবছরে  বাংলাদেশের অবদান ছিল ৩৪ কোটি ১২ লাখ ডলার। তার পরও চীনে বাড়তে থাকা শ্রমিক মজুরির সুযোগটা বাংলাদেশ কাজে লাগাতে পারে। এই অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘চীনে পণ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে গেছে। ফলে এখানে আমাদের সুযোগ আছে। ’

এক্সপোটার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএ সাবেক সভাপতি সালাম মুর্শেদী বলেন, ‘পোশাক খাত ছাড়া চীনের বাজারে বাংলাদেশ থেকে রপ্তানি হতে পারে তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো পণ্য নেই। কারণ চীন বর্তমানে উন্নত প্রযুক্তির গাড়ি, কম্পিউটার ও টেক্সটাইল মেশিনারি তৈরি করে। ফলে দেশটিতে আমাদের পণ্য রপ্তানিও কম। ’ চীন আমদানি করে এমন কয়েকটি শীর্ষ পণ্যের কথা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে ইলেকট্রনিক পণ্য, জ্বালানি, কারখানার যন্ত্রপাতি, চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং শিল্পের বিভিন্ন কাঁচামাল। তাই অদূর ভবিষ্যতে চীনের উদ্যেক্তারা বাংলাদেশের বস্ত্র খাতে বিনিয়োগ করলে এখান থেকে রপ্তানির বিপুল সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া দেশটির শ্রমিক মজুরি বেড়ে যাওয়ায় তারা এ খাতে বিনিয়োগ করে লাভবান হতে পারে বলে তিনি মনে করেন।

বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সহসভাপতি মো. ফজলুল হক চীনের বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তবে বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগে কিছু প্রতিবন্ধকতাও রয়েছে। যেমন—দুর্বল পরিবহন অবকাঠামো,  রেলওয়ে ও বন্দরের সক্ষমতা সীমিত এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ অপর্যাপ্ত।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীনের বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বস্ত্র খাতে বিনিয়োগের বিশাল সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ তৈরি পোশাকের জন্য যে পরিমাণ কাপড়ের স্থানীয় চাহিদা রয়েছে, এর ৫০ শতাংশের বেশি আমাদের উদ্যোক্তারা আমদানি করে থাকে। চীন যদি তাদের আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং অভিজ্ঞতা নিয়ে বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে তাহলে দুই দেশই বিশেষভাবে লাভবান হবে। ’


মন্তব্য