kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুঁজিবাজারে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল

বিচারক আছে মামলা নেই

রফিকুল ইসলাম    

১৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বিচারক আছে মামলা নেই

রফিকুল ইসলাম

পুঁজিবাজারে কারসাজি-সংক্রান্ত মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি করতে ২০১৫ সালের মাঝামাঝিতে কার্যক্রম শুরু করেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। একজন বিচারক নিয়ে গঠিত এই ট্রাইব্যুনালে এখন আর কোনো মামলা না থাকায় বিচারিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে না।

১৭টি মামলা নিয়ে ট্রাইব্যুনাল চালু হলেও বিচারিক কার্যক্রম শেষে রায় হয়েছে মাত্র ছয়টির। পরবর্তী সময়ে আরো কয়েকটি মামলা যোগ হলে মামলাগুলো উচ্চ আদালতের রায়ে স্থগিত রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের দাপ্তরিক কার্যক্রম চললেও বসছে না এজলাস। মামলাশূন্যতায় ভুগছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। যদিও পুঁজিবাজারে কারসাজি-সংক্রান্ত মামলা রয়েছে পাঁচ শর বেশি।  

সংশ্লিষ্টরা বলছে, পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বিনিয়োগকারীদের আশার বাণী শুনিয়েছিলেন। বাজারে মূল্য কারসাজিতে জড়িতদের বিচার হবে এমন প্রত্যাশাও ছিল। আশার বাণী অনেকটা হতাশায় পরিণত হয়েছে। বাজার কারসাজিতে জড়িত রাঘববোয়ালরা উচ্চ আদালত থেকে ট্রাইব্যুনালের বিচারে স্থগিতাদেশ আনছে। কারসাজির বিচারের কোনো সমাধান হচ্ছে না। বছরের পর বছর ঝুলে রয়েছে মামলাগুলো।

১৯৯৬ ও ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে আলোচিত কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। কেলেঙ্কাকারিতে রাঘববোয়ালরা লাভবান হলেও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা। অনেকে পুঁজি হারিয়ে রাস্তায় বসেছে, আবার পুঁজি ফিরে পেতে বিক্ষোভ ও আন্দোলনও দেখিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ফান্ড গঠন করে সরকার কম সুদে ঋণের ব্যবস্থাও করেছে। কেউ সেই ঋণ নিয়ে নতুনভাবে বিনিয়োগ করেছে, আবার কেউ কেউ পুঁজি হারানোর বেদনায় কাতর হয়েই আছে।

সেই কেলেঙ্কারির ঘটনার পর বর্তমানে আবার ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে পুঁজিবাজার। টানা সূচক বাড়ছে, বাড়ছে লেনদেনও। তারল্যের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। ভালো ভালো কিছু কম্পানিও পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে, আবার কয়েকটি ভালো কম্পানি তালিকাভুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াতে রয়েছে। কেলেঙ্কারির পর বাজার উন্নয়নে সরকারের পক্ষ থেকে নানামুখী উদ্যোগে গতিশীল হওয়ার পথে পুঁজিবাজার।

বড় দুই কেলেঙ্কারিতে সেই সময়ের আলোচিত সব মামলা এখন হিমঘরে। আবার কোনোটির বিচার শুরু হলেও কার্যক্রম পরিচালনায় আদালতে স্থগিতাদেশ রয়েছে। সর্বশেষ ১৯৯৬ সালের চিটাগাং সিমেন্টের শেয়ার কারসাজির মামলায় ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দিয়েছেন উচ্চ আদালত। এর আগে এক রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৫ সালের ৩ নভেম্বর আদালত মামলার কার্যক্রমে ছয় মাসের স্থগিতাদেশ দেন। উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ শেষে চলতি বছরের ১৫ সেপ্টেম্বর মামলা কার্যতালিকায় রাখা হয়। কিন্তু ৮ সেপ্টেম্বর আবারও মামলার কার্যক্রমে স্থগিতাদেশ দিয়েছেন আদালত।

পুঁজিবাজার-সংক্রান্ত বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সূত্র জানায়, মামলাটির বিচারিক প্রক্রিয়ায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হয়েছে। এখন শুধু রায় ঘোষণা বাকি। গত বছরের ২৭ অক্টোবর রায় ঘোষণার দিন নির্ধারিত ছিল। রায়ের আগে মামলাটির কার্যক্রমে উচ্চ আদালতের স্থগিতাদেশ আসে।

১৯৯৬ সালে কেলেঙ্কারির ঘটনায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য আমিনুল ইসলামের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি ১৯৯৭ সালের মার্চে সরকারের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেই কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতেই ১৫টি মামলা করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিএসইসি। এ মামলায় ৩৮ জন ব্যক্তি, পুঁজিবাজার তালিকাভুক্ত আটটি কম্পানি ও কয়েকটি ব্রোকারেজ হাউসকে মামলায় অভিযুক্ত হিসেবে দেখানো হয়।

সেই মামলাগুলোর বিচার না হতেই ২০১০ সালে আবারও কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি অধিকতর অনুসন্ধান করে জড়িতদের বিরুদ্ধে শাস্তি দিতে সুপারিশ করবে। কমিটি ব্যর্থতার মূল দায়িত্ব এসইসি পুনর্গঠন, স্টক এক্সচেঞ্জ ডিমিউচ্যুয়ালাইজেশন, স্টক এক্সচেঞ্জ ও এসইসি সমন্বয়, ব্যাংকের অর্থায়ন, প্লেসমেন্ট বাণিজ্য, অমনিবাস অ্যাকাউন্টে স্বচ্ছতা আনয়ন, সরকারি ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের শেয়ার লেনদেন, বুক বিল্ডিং পদ্ধতিতে শেয়ার মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন মনিটরিংসহ ২৬টি সুপারিশ করে। এই কেলেঙ্কারির ঘটনায় মামলাও হয়েছে। কিন্তু বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি আজও।

সূত্র জানায়, ১৯৯২ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত শেয়ার কারসাজি-সংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তি করতে ২০১৫ সালের ২১ জুন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠিত হয়। হাউজ বিল্ডিং ফাইন্যান্স করপোরেশন ভবনের ১০ তলার পূর্ব কোণে এই বিশেষ ট্রাইব্যুনাল। এক বিচারপতিকে দায়িত্ব দিয়ে গত জুন মাসে এজলাস বসানো হয়। বর্তমানে নিম্ন আদালতের ২৪টি মামলায় বিচারিক কার্যক্রম রয়েছে ট্রাইব্যুনালে। ছয়টি মামলার রায় ঘোষিত হয়েছে আর ১৬টি মামলা উচ্চ আদালতে স্থগিত রয়েছে।

ট্রাইব্যুনালের এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, দীর্ঘ চার মাস থেকে ট্রাইব্যুনালে কোনো মামলা নেই। নিয়মিতভাবেই অফিস চলে, কিন্তু বিচারিক কার্যক্রম হয় না। বেশির ভাগ মামলা স্থগিত রয়েছে। মামলার স্থগিতাদেশ মেয়াদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিংবা নতুন মামলা না আসা পর্যন্ত এভাবেই চলবে।

বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সূত্র জানায়, কমিশন ও কমিশনের বিরুদ্ধে বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৫১৫টি। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ১৮টি ও হাইকোর্ট বিভাগে ২০৮টি, মহানগর দায়রা জজ আদালত, ঢাকা ও স্পেশাল ট্রাইব্যুনালে ২৬টি, জেলা জজ, যুগ্ম জজ ও সহকারী জজ আদালতে ১১টি, চিফ মেট্রোপলিটন আদালতে ছয়টি, শ্রম আদালতে দুটি ও জেনারেল সার্টিফিকেট আদালতে মামলা ২৪৪টি। ২০১৪-২০১৫ সালে বিএসইসি মামলা দায়ের করে ৩৪টি। সিকিউরিটিজ আইন ভঙ্গে কমিশন কর্তৃক আরোপিত জরিমানা আদায়ে পিডিআর অ্যাক্ট ১৯১৩-এর অধীনে এই মামলা করে। যার মধ্যে একটি মামলা নিষ্পত্তি হয়েছে। ২২টিতে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা, সাতটিতে সমন জারি ও স্থগিত রয়েছে চারটি মামলা। আর কমিশনের জরিমানার আদেশ চ্যালেঞ্জ ও অন্যান্য কারণে হাইকোর্ট বিভাগে ২৫টি এবং প্রতিষ্ঠান ও ৯টি কম্পানি স্যাটায়ার দায়ের করে।

পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের নির্বাহী পরিচালক সাইফুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের বাইরে আমাদের কিছুই করার নেই। কিন্তু সেই মামলাগুলোতে আদালতের স্থগিতাদেশ শেষ না হওয়া পর্যন্ত কিছুই করা যাচ্ছে না। বিচারের বিষয়ে চেষ্টার কোনো ত্রুটি নেই। চেষ্টা চলছে পুঁজিবাজারের মামলাগুলোর বিচারে। ’

ট্রাইব্যুনালে নতুন মামলা আনা প্রসঙ্গে সাইফুর রহমান আরো বলেন, ‘অন্য মামলাগুলো ট্রাইব্যুনালে আনতে কমিশনের আইন বিভাগ কাজ করছে। আইনি প্রক্রিয়া শেষে আনা হবে। ’


মন্তব্য