kalerkantho

মঙ্গলবার। ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৯ ফাল্গুন ১৪২৩। ২৩ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এসডিজি বাস্তবায়নে প্রস্তুত নয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এসডিজি বাস্তবায়নে প্রস্তুত নয় রাজনৈতিক নেতৃত্ব

২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) বাস্তবায়নে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব প্রস্তুত নয় বলে মনে করছেন এ অঞ্চলের রাজনীতিবিদ, উন্নয়ন বিশেষজ্ঞ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা। তাঁরা বলছেন, এ অঞ্চলের প্রত্যেকটি দেশই আর্থসামাজিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু দ্বিপক্ষীয় সমস্যা ও সন্ত্রাসবাদের কারণে সম্মিলিত উদ্যোগগুলো ভেস্তে যাচ্ছে। যেমন—সার্ক এখন আর কোনো ফলপ্রসূ উদ্যোগের নাম নয়। একই কারণে অন্য আঞ্চলিক উদ্যোগগুলোও লক্ষ্য অর্জন করতে পারছে না। যদিও এসডিজি অর্জনের প্রয়োজনীয় সামর্থ্য এবং জনবল ও সম্পদ এ অঞ্চলের রয়েছে। আঞ্চলিক উন্নয়নের জন্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর রাজনৈতিক নেতৃত্বের মনোভাবের পরিবর্তন দরকার বলে মনে করেন তাঁরা।

গতকাল শনিবার নবম দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে প্যানেল আলোচকরা এমন মত ব্যক্ত করেন। অধিবেশনের আলোচনার বিষয় ছিল, ‘২০৩০ সালের লক্ষ্য বাস্তবায়নে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক নেতৃত্ব কি প্রস্তুত?’ ২০৩০ সালের লক্ষ্য হচ্ছে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য। যাকে জাতিসংঘ ‘টেকসই উন্নয়নের জন্য বৈশ্বিক লক্ষ্যমাত্রা’ হিসেবে প্রচার করছে। জাতিসংঘ ইতিমধ্যে লক্ষ্যমাত্রাগুলো নির্ধারণ করেছে। দারিদ্র্য দূর, ক্ষুধামুক্তি, সুস্বাস্থ্য, মানসম্মত শিক্ষাসহ ১৭টি লক্ষ্যমাত্রা ও ১৬৯টি লক্ষ্য রয়েছে এসডিজিতে। এসব লক্ষ্য অর্জনের মেয়াদ ২০১৬ থেকে ২০৩০ সাল।

ঢাকার লা মেরিডিয়ান হোটেলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) দুদিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে। দুপুরে দ্বিতীয় অধিবেশনে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। দক্ষিণ এশিয়া অর্থনৈতিক সম্মেলন হচ্ছে আঞ্চলিক উন্নয়নে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর যৌথ করণীয় নির্ধারণে আলোচনা ও বিতর্কের একটি প্ল্যাটফরম। ২০০৮ সাল থেকে এই সম্মেলন হয়ে আসছে। প্রথমবার শ্রীলঙ্কাতে আয়োজন করা হয়েছিল এই সম্মেলন। সর্বশেষ গত বছর ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও নেপালের পাঁচটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবছর এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। দক্ষিণ এশিয়ার নীতিনির্ধারক, বিশেষজ্ঞ ও গবেষকদের একত্রীকরণেরও চেষ্টা হয় এই সম্মেলনে।

অনুষ্ঠানের প্রধান আলোচক ছিলেন ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের সভাপতি সাবের হোসেন চৌধুরী। তিনি বলেন, এসডিজির লক্ষ্যগুলো অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী। এ জন্য অনেক বিনিয়োগ ও কাজ করতে হবে। বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশ সে অনুযায়ী কাজও করছে। কিন্তু যৌথ উদ্যোগও দরকার আছে। বিশেষ করে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলায় যৌথ উদ্যোগ জরুরি। এ ছাড়া ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষার ক্ষেত্রেও আঞ্চলিক যোগাযোগ দরকার। কিন্তু সেগুলোর জন্য উদ্যোগ যথেষ্ট নয়।

বাংলাদেশের এই সংসদ সদস্য আরো বলেন, এ জন্য সবাইকে আশাবাদী হতে হবে। সহযোগিতা ও প্রতিযোগিতা দুটোই বাড়াতে হবে। কিন্তু সেগুলো সবই হতে হবে শান্তিপূর্ণভাবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর নীতিতে সংস্কার ও মনোভাবের পরিবর্তন দরকার।

শ্রীলঙ্কার মন্ত্রী শরৎ আমুনুগামা বলেন, ‘শ্রীলঙ্কা শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণে বিনিয়োগ করছে। গণতন্ত্র, সুশাসন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির উন্নতি হচ্ছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলো থেকে বিশেষ সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে, তা জোরের সঙ্গে বলা যাবে না। এ জন্য আমি বলব দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের চেয়ে আঞ্চলিক সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দেওয়া দরকার। তাতে সবাই সমানভাবে উপকৃত হবে। ’ 

ভুটানের সংসদ সদস্য চইদা জামশো বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার কোনো আঞ্চলিক উদ্যোগকেই সফল বলা যায় না। ২০৩০ সালের এজেন্ডা বাস্তবায়নে যে ধরনের আঞ্চলিক উদ্যোগ দরকার তা বাস্তবায়নে রাজনৈতিক নেতারা এখনো প্রস্তুত নন।  

পাকিস্তানের সংসদ সদস্য রানা মুহাম্মাদ আফজাল খান বলেন, সার্ক এখন আর কোনো আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয় নয়। এটি এখন রাজনৈতিক বিষয়। পাকিস্তান ভারতের সঙ্গে আলোচনার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, কিন্তু ভারত আলোচনার শর্ত দিচ্ছে। একে সহযোগিতা বলা যায় না। এভাবে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়ন করা যাবে না। তিনি আরো বলেন, শুধু দেশ নয়, মানুষকে ভালোবাসতে হবে। মানুষের উন্নয়নে চিন্তা করতে হবে। তাহলে সব অঞ্চলের উন্নয়নই প্রয়োজন বলে মনে হবে।

বাংলাদেশের সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী বিএনপি নেতা আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, আইনের শাসন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা—এগুলো নিশ্চিত করা না গেলে আঞ্চলিক উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা যাবে না। দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশে এসবের ঘাটতি রয়েছে। ফলে রাজনৈতিক নেতৃত্ব উন্নয়নের চেয়ে ক্ষমতা নিয়ে বেশি ব্যস্ত। আফগান সরকারের অর্থমন্ত্রীর উপদেষ্টা নাজির কাবিরী বলেন, সন্ত্রাসবাদের কারণে আঞ্চলিক সহযোগিতা তৈরি হচ্ছে না।

নেপাল ইনস্টিটিউট অব আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল স্টাডিজের চেয়ারম্যান জগদিশ চন্দ্র পোখারেল বলেন, আঞ্চলিক সহযোগিতার অভাবে এ অঞ্চলে অর্থনেতিক প্রবৃদ্ধি হলেও তার সুফল তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সাফল্য দেখাতে প্রবৃদ্ধির দিকে ঝুঁকছে, কিন্তু তাতে সমতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ কম।

ভারতের মিডিয়াস্কেপ প্রাইভেট লিমিটেডের প্রধান সম্পাদক শেখর গুপ্ত বলেন, বিশ্বের প্রায় ৪৫ শতাংশ মুসলমান দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাস করে। অথচ এই অঞ্চলে আইএস নেই। এটি যেমন ভালো উদাহরণ, তেমনি অনুমোদনহীন অস্ত্রধারী রয়েছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যা বাধা।

গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম প্রমুখ মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। সামগ্রিক উন্নয়নের জন্য সবাই দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে বন্ধুত্ব সৃষ্টির পরামর্শ দেন। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।


মন্তব্য