kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত

অর্থ ব্যয়ে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি বিসিসিসিআইয়ের

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



উন্মোচিত হবে নতুন দিগন্ত

বিসিসিসিআই সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মৃধা

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে বলে আশা করছে ব্যবসায়ীরা। এই সফরে চীনে রপ্তানি বাড়ানো, নতুন পণ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধা, আর্থিক লেনদেন সহজ করাসহ বেশ কিছু দাবি-দাওয়া তুলে ধরতে চায় তারা।

এ ছাড়া চীনের কাছ থেকে সহনীয় শর্তে অর্থায়ন এবং তা ব্যয়ের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মৃধা। চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের নানা দিক নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন কালের কণ্ঠ’র বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমী

 

চীনা প্রেসিডেন্টের সফরকে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ এবং ঐতিহাসিক উল্লেখ করে বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সাধারণ সম্পাদক মো. শাহজাহান মৃধা বলেন, ‘চীন আমাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। বাণিজ্য, প্রযুক্তি, সংস্কৃতিসহ নানা ক্ষেত্রে তারা আমাদের বড় অংশীদার। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরে ৪০ বিলিয়ন ডলারের চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো দেশ থেকে এত বড় অর্থায়ন আমরা অতীতে পাইনি। এই অর্থায়নের যথাযথ ব্যবহার করতে পারলে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন মাত্রা যোগ হবে। চীনের মতো বড় বাজারের সামান্য অংশও যদি আমরা ধরতে পারি তাহলে বাংলাদেশের রপ্তানি বাণিজ্যের প্রেক্ষাপট বদলে যাবে। ’

বিসিসিসিআই সাধারণ সম্পাদক আরো বলেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য বাড়ানোর পূর্বশর্ত উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা। চীনের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির বড় অংশজুড়েই থাকছে অবকাঠামো উন্নয়ন। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, সড়ক, ট্যানেল, প্রযুক্তি, মেরিন ড্রাইভ সম্প্রসারণ, দোহাজারি থেকে ঘুনধুম পর্যন্ত রেললাইন, পরিবেশ উন্নয়ন, গভীর সমুদ্রবন্দরসহ অসংখ্য নানা প্রকল্পে অর্থায়নের আশা করা হচ্ছে। এমনকি তারা আমাদের জীবনমান উন্নয়নেও সহায়তা দিতে চায়। ’ তবে তিন দশমিক দুই তিন ট্রিলিয়ন বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে বিশ্বে বিনিয়োগকারীদের শীর্ষে থাকা চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দিন দিন বাড়ছেই। বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনতে নানা উদ্যোগের কথা তুলে ধরে মো. শাহজাহান মৃধা বলেন, ‘বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সবার লক্ষ্য থাকে আমদানির পাশাপাশি রপ্তানি বাড়িয়ে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো। চীনের সঙ্গে আমাদের বড় ধরনের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে, যা কার্যকর উদ্যোগে নিলে আরো কমে আসবে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে আমরা শুভ লক্ষণ দেখছি। এ সময় চীনে আমাদের রপ্তানি বেড়েছে ২৫ শতাংশ, যা খুবই আশাব্যাঞ্জক। ’

চীনের প্রেসিডেন্টের সফরে একটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এসেছে। তাদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে রপ্তানি বাড়ানোর নানা ইস্যু তুলে ধরা হবে জানিয়ে শাহজাহান মৃধা বলেন, ‘চীন ছয় হাজারের মতো পণ্যে আমাদের শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে থাকে। আমরা এটি পুরোপুরি ব্যবহার করতে পারছি না। চারকল রপ্তানিতে তারা ১৫ শতাংশ কর আরোপ করেছে। এটি না থাকলে রপ্তানি বাড়বে। এখন ৭০ শতাংশ পণ্যই চীন থেকে আনা হয়। কারণ আমরা সেখানে সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য কিনতে পারি। তাই রপ্তানির ক্ষেত্রেও আমরা কিছু সুবিধা আশা করি। ’ চীনের সঙ্গে আমাদের লেনদেনে কিছু সমস্যা আছে উল্লেখ করে বাংলাদেশে চীনা ব্যাংকের শাখা খোলার দাবি জানান এই ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, ‘এখানে চায়নিজ ব্যাংক এলে এবং আমাদের ব্যাংকগুলো চীনে শাখা খুলতে পারলে বাণিজ্য আরো সহজ হবে। আমরা টিটির পরিবর্তে সরাসরি ব্যাংকিং লেনদেন চাই। ’

বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডর বাস্তবায়িত হলে চীনের সঙ্গে বাণিজ্য বহুগুণ বাড়বে—এমন আশা করে বিসিসিসিআই সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘এটি হলে আমরা বাণিজ্য বাড়াতে পারব। এ ছাড়া পণ্য পরিবহনের ব্যয়ও অনেকাংশে কমে যাবে। কারণ চীন থেকে সমুদ্রপথে পণ্য আনতে প্রায় এক মাস লেগে যায়। কিন্তু বিসিআইএম বাস্তবায়িত হলে মাত্র ৪৮ ঘণ্টায় আমরা পণ্য আনতে পারব। এ ছাড়া এর মাধ্যমে আমাদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও অনেকটা ভারসাম্য তৈরি হবে। ’

জনসংখ্যা আর আয়তনে বৃহত্তম দেশ হিসেবে চীনের পর্যটকের সংখ্যা যেকোনো একক দেশের তুলনায় সর্বোচ্চ। ২০১৫ সালে ১২ কোটি চীনা পর্যটক বিদেশে ভ্রমণ করেছে এবং তারা ব্যয় করেছে ১০ হাজার ৫০০ কোটি মার্কিন ডলার, যা ২০১৪ সালের তুলনায় যথাক্রমে ১২ ও ১৬.৭ শতাংশ বেশি। এ ছাড়া বিদেশে ভ্রমণকারী মানুষের সংখ্যা ও ব্যয়ের দিক থেকে চীনা পর্যটকরা বিশ্বে প্রথম স্থান দখল করেছে। বিসিআইএম বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশে চীনা পর্যটক আগমন বাড়বে বলে মনে করেন শাহজাহান মৃধা। তিনি বলেন, ‘চীন এখানে পর্যটন খাতে বিনিয়োগ করতে চায়। কিন্তু পর্যটনে চীনা পর্যটকরা যে পরিবেশ চায় আমরা তা এখনো নিশ্চিত করতে পারিনি। কক্সবাজারে পর্যটক গেলে নানা সীমাবদ্ধতার মুখে পড়তে হয়। সমুদ্র সৈকতে সন্ধ্যার পরে আর কোনো কিছু হয় না। সারা বিশ্বে গভীর রাত পর্যন্ত পর্যটনকেন্দ্রগুলো জমজমাট থাকে এবং সেখানে কোনো নিরাপত্তা সমস্যা নেই। এটি ঠিক করা কি কঠিন কাজ? পর্যটন শুধু মুখে বললে হবে না। আমরা অতিথিপ্রিয়, কিন্তু এর মধ্যেও কিছু হায়েনা লুকিয়ে আছে। তাদের মাথা তুলতে দেওয়া যাবে না। জঙ্গিদের যেভাবে দমন করা হয়েছে, তাদেরও সেভাবে দমন করতে হবে। তা না হলে পর্যটন এগোবে না। ’

চীনের সঙ্গে ভিসা ব্যবস্থা আরো সহজীকরণ প্রসঙ্গে এই উদ্যোক্তা বলেন, ‘কিছু পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা আমাদের ভিসা দিচ্ছে। তবে আমার দৃষ্টিতে চায়নিজরা ব্রিটিশদের চেয়ে ভালো। তারা কাগজপত্র দেখে পাসপোর্ট রাখলে ভিসা দিয়ে দেয়। না দিলে তারা ভিসা ফি নেয় না। কিন্তু ব্রিটিশরা যারা ভিসা পায় না তাদের কাছ থেকেও মোটা অঙ্গের ফি নিয়ে নেয়। আমরা আশা করি চীন বাংলাদেশি নাগরিকদের জন্য ভিসা পদ্ধতি আরো সহজ করবে। ’

চীনের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ দক্ষতা ও সততার সঙ্গে যথাযথভাথে ব্যবহারের ওপর জোর দিয়ে শাহজাহান মৃধা বলেন, ‘তাদের টাকার অভাব নেই। তবে দরপ্রস্তুত যাতে ভালো হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। চীনের ঋণচুক্তির শর্তগুলো সাধারণত একটু কঠিন হয়। সেটি যাতে সহনীয় পর্যায়ে থাকে তার জন্য আমাদের দেনদরবার অব্যাহত রাখতে হবে। চীনারা ঋণের ক্ষেত্রে ২.৫ শতাংশ সুদ চায়, কিন্তু তা যাতে ২ শতাংশের নিচে থাকে সেটি নিশ্চিত করতে হবে। ’


মন্তব্য