kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চীনা প্রেসিডেন্টের সফর

চট্টগ্রাম পাচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৪ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



চট্টগ্রাম পাচ্ছে ৩৫ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প

চীনের ৩৫ হাজার কোটি টাকা অর্থায়নে চট্টগ্রামে বাস্তবায়িত হবে চারটি বড় প্রকল্প। চলতি বছরের ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়ে আগামী ২০২০ সালের মধ্যে এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।

চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরে ২১ প্রকল্পে চার হাজার কোটি ইউএস ডলারের অর্থায়ন আশা করছে সংশ্লিষ্টরা। এর মধ্যেই চট্টগ্রামের ওই চার প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

চীনের অর্থায়নে নির্মিতব্য প্রকল্পগুলো হচ্ছে কর্ণফুলী নদীর নিচে দেশের প্রথম টানেল নির্মাণ, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত সমুদ্রের পারঘেঁষে চার লেনের মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ এবং উপকূল রক্ষা বাঁধ। চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য আনোয়ারায় চায়না স্পেশাল ইকোনমিক জোন এবং সাগরে জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল পাইপলাইনে সরাসরি চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে পৌঁছানোর প্রকল্প। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে উপকূলীয় এলাকায় সড়ক যোগাযোগে বিপ্লব হবে। চট্টগ্রাম শহরের পরিধি বাড়বে, কর্ণফুলীর ওপারে অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে, চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত বিকশিত হবে পর্যটন।

জানতে চাইলে টানেল নির্মাণ এলাকার সংসদ সদস্য এম এ লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্ব বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য যে বাংলাদেশ হচ্ছে চীনা প্রেসিডেন্টের সফর তারই প্রমাণ। ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণ, সহজলভ্য ও সস্তা শ্রম, শিল্পবান্ধব কর্মী এবং বিনা মূল্যে সুপেয় পানি শিল্প উৎপাদনের ব্যবহার সুবিধার কারণে বিশ্ব এখন বাংলাদেশে বিনিয়োগে ঝুঁকছে। ’

বাংলাদেশের মধ্যে চট্টগ্রামকে বেছে নেওয়ার কারণ হচ্ছে, সার্ক ও আসিয়ানের মধ্যবর্তী স্থানে চট্টগ্রামের অবস্থান, বন্দরকেন্দ্রিক সুবিধা কাজে লাগিয়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন এবং বড় শিল্প কারখানা গড়ে ওঠার সুবিধা।

চট্টগ্রাম চেম্বারের সাবেক সভাপতি এম এ লতিফ আরো বলেন, এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে কর্ণফুলী নদীর ওপার ঘিরে ইতিপূর্বে কোরিয়া বিনিয়োগ করেছে, ভারতের টাটা কম্পানি বিনিয়োগের জন্য বাঁশখালীকে বেছে নিয়েছিল। এখন চীন, জাপানকে দিয়ে যে শিল্পায়নের পরিকল্পনা সরকার নিয়েছে তা বাস্তবায়িত হলে চট্টগ্রাম ‘বিনিয়োগের হাব’ হবে।

জানা গেছে, চট্টগ্রামের কর্ণফুলী নদীর নিচে তিন কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল নির্মাণের জন্য চায়না কমিউনিকেশন কনস্ট্রাকশন কম্পানির সঙ্গে অনেক আগে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। চলতি ২০১৬ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২০ সালের জুনের মধ্যে প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হবে, আর প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে আট হাজার ৪৪৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীন অর্থায়ন করবে প্রায় চার হাজার ৮০০ কোটি টাকা। বাকি টাকা সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে জোগান দেবে।

জুনিয়র চেম্বার ইন্টারন্যাশনাল চট্টগ্রামের নির্বাহী সহসভাপতি গিয়াস উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের ভিশন ২০২১ বাস্তবায়নে বাংলাদেশে চীনের এই বিনিয়োগ বড় অগ্রগতি। দেশের পুরো অর্থনীতির জন্য ইতিবাচক পদক্ষেপ। ’

গিয়াস উদ্দিন আরো বলেন, কর্ণফুলী নদীর নিচে টানেল নির্মাণের ফলে নদীর ওপারে চায়না ইকোনমিক জোনে চীনের বিনিয়োগ বিশাল সম্ভাবনার দুয়ার উন্মোচিত করবে। এই সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দেশি-বিদেশি শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠবে। কর্ণফুলীর ওপার শিল্পনগরী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।

টানেলের পর চীনের অর্থায়নে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি হচ্ছে প্রায় ২৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের মেরিন ড্রাইভ এক্সপ্রেসওয়ে ও উপকূল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড থেকে সমুদ্রের পারঘেঁষে কর্ণফুলী নদীর টানেল হয়ে ওপারে আনোয়ারা। সেখান থেকে সাগর উপকূল দিয়ে পেকুয়া, চকরিয়া হয়ে খুরুসকুল, সেখান থেকে নদী পার হয়ে কক্সবাজার কলাতলী গিয়ে শেষ হবে। ২৩০ কিলোমিটার  দীর্ঘ চার লেনের এই সড়ক ও বেড়িবাঁধ নির্মিত হলে উপকূলীয় এলাকাগুলো দেশের সড়ক যোগাযোগের মূল স্রোতে ফিরে আসবে।

গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল হক চৌধুরী বাবর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম শহরে না ঢুকেই একজন পর্যটক সাগর ও লবণ মাঠ, চিংড়ি ঘের এবং পাহাড়-নদী দেখতে দেখতে কক্সবাজারের কলাতলী এমনকি হিমছড়ি ইনানী মেরিন ড্রাইভ সড়ক দিয়ে টেকনাফ পর্যন্ত পৌঁছতে পারবে। এই একটি সড়ক খুলে দিতে পারে পর্যটনের লুকায়িত সম্ভাবনা। চীনের বিনিয়োগের কারণে আমরা সত্যিই উচ্ছ্বসিত। ’

জানা গেছে, টানেল ও মেরিন ড্রাইভ নির্মিত হলে চট্টগ্রামের সঙ্গে কক্সবাজারের দূরত্ব অনেক কমে আসবে। এই সড়কটি যুক্ত হবে এশিয়ান হাইওয়ের সঙ্গে। শুধু তাই নয়, প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম-ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ে এবং চট্টগ্রাম-কক্সবাজার চার লেন সড়কও এই টানেলের সঙ্গে যুক্ত হবে। আর প্রস্তাবিত চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন বে টার্মিনালে জাহাজ থেকে পণ্য নামিয়ে একজন ব্যবসায়ী পণ্যগুলো টানেল মেরিন ড্রাইভ দিয়ে সরাসরি কক্সবাজার নিতে পারবে, আবার ঢাকাও নিতে পারবে।

এদিকে চীনের অর্থায়নে চীনের বিনিয়োগকারীদের জন্য চট্টগ্রামের আনোয়ারায় বাস্তবায়িত হচ্ছে চায়না স্পেশাল ইকোনমিক জোন। চীনা প্রেসিডেন্টের সফরে এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে।


মন্তব্য