kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ধুম

শেখ সাফায়াত হোসেন   

১২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের ধুম

চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই-আগস্ট) সঞ্চয়পত্র থেকে প্রায় আট হাজার কোটি টাকা নিট বিনিয়োগ এসেছে। যা অর্থবছরের পুরো সময়ের লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ।

চলতি অর্থবছরের পুরো সময়ে সরকারের ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

এদিকে একক মাস হিসেবে আগস্টে সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। জাতীয় সঞ্চয়পত্র অধিদপ্তরের প্রকাশিত সর্বশেষ প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত আগস্টে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে চার হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। যা আগের বছরের আগস্টে আসা বিনিয়োগ থেকে দেড় হাজার কোটি টাকা বেশি। গত বছরের আগস্ট মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ আসে দুই হাজার ৬৫০ কোটি ৫১ লাখ টাকা।

তা ছাড়া অর্থবছরের জুলাই মাসে এ খাতে নিট বিনিয়োগ আসে তিন হাজার ৪৯৮ কোটি ৩৭ লাখ টাকা। গত অর্থবছরের জুলাই মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ ছিল এক হাজার ৯৭৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা।

সব মিলিয়ে অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছে সাত হাজার ৭৯৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। যা অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের বাজেটে নির্ধারিত ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৪০ শতাংশ।

তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, বরাবরের মতো গত দুই মাসে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয়েছে পরিবার সঞ্চয়পত্র। এর পরেই রয়েছে তিন মাস অন্তর মুনাফাভিত্তিক ও পাঁচ বছর মেয়াদি সঞ্চয়পত্র। মূলত এই তিন ধরনের সঞ্চয়পত্রের বিক্রিই বেশি হয়ে থাকে। গত সোমবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মতিঝিল অফিসে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে অসংখ্য বিনিয়োগকারী সারি ধরে দাঁড়িয়ে সঞ্চয়পত্র কিনছে। কেউ বা আবার মুনাফার টাকা তুলতে এসেছে। এমন এক ক্ষুদ্র সঞ্চয়ী সোহেল রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, গত এক বছর ধরে তিনি সঞ্চয়পত্রের মুনাফা তোলেননি। এখন একসঙ্গে সেই মুনাফার টাকা তুলে নতুন করে আবার বিনিয়োগ করবেন।

এদিকে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি অর্থবছরের বাজেট অনুযায়ী সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ১৯ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। তাতে প্রতি মাসে গড়ে এক হাজার ৬৩৫ কোটি টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ হলেই লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে। সেখানে দুই মাসেই প্রায় আট হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। এই হারে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ বাড়তে থাকলে এ খাত থেকে সরকারের ঋণের পরিমাণ লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণ পরিমাণ ছাড়িয়ে যাবে। তাতে সরকারকে বিপুল পরিমাণ সুদ গুনতে হবে, যা ভবিষ্যতে বাজেট ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।  

আর্থিক খাতসংশ্লিষ্টরা বলছে, আমানতের সুদের হার কমে যাওয়ায় সাধারণ সঞ্চয়ীরা এখন সঞ্চয়পত্রের দিকে ঝুঁকছে। এক দফা কমানোর পরও সঞ্চয়পত্রের সুদের হার এখনো ব্যাংক আমানতের প্রায় দ্বিগুণ। এ কারণে প্রতি মাসেই বেড়ে চলেছে সঞ্চয়পত্রের বিনিয়োগ।

বিক্রি অস্বাভাবিক বেড়ে যাওয়ায় ঋণের বোঝা কমাতে ২০১৫ সালের মে মাসে সব ধরনের সঞ্চয়পত্রের সুদের হার গড়ে ২ শতাংশ করে কমায় সরকার।

গত ২০১৫-২০১৬ অর্থবছরের পুরো সময়ে সঞ্চয়পত্রে নিট বিনিয়োগ এসেছিল ৩৩ হাজার ৬৮৮ কোটি টাকা। ওই অর্থবছরে ব্যাংকবহির্ভূত উেসর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে সরকারের ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫ হাজার কোটি টাকা। বিক্রি বাড়ায় সংশোধিত বাজেটে তা প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ২৮ হাজার কোটি টাকা করা হয়। কিন্তু অর্থবছর শেষে সঞ্চয়পত্র বিক্রি সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রাও ছাড়িয়ে যায়।

অথচ একটা সময় ছিল যখন এক অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র থেকে মাত্র ৮০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ আনাই কষ্টকর হয়ে পড়েছিল। অবশ্য এর পরের অর্থবছর থেকেই সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়তে থাকে। সর্বশেষ গত আগস্টে একক মাস হিসেবে নিট বিনিয়োগ চার হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়।

বাজেট ঘাটতি মেটাতে দেশের ভেতর ও বাইরে থেকে ঋণ নেয় সরকার। দেশের ভেতর থেকে সরকার ব্যাংকব্যবস্থা ও ব্যাংকবহির্ভূত উৎস—এই দুই উৎস থেকে ঋণ করে থাকে। একটা সময় সরকারকে ঘাটতি মেটাতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ব্যাংকব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো। কিন্তু বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ঋণ আসছে ব্যাংকবহির্ভূত উৎস থেকে। আর তা আসছে এই সঞ্চয়পত্র থেকে।


মন্তব্য