kalerkantho


ঘুরে দাঁড়াবে রূপালী ব্যাংক

দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যাংকে রূপান্তরের প্রত্যয় নতুন এমডির

মোশতাক আহমদ   

১০ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



ঘুরে দাঁড়াবে রূপালী ব্যাংক

সম্পদের মান উন্নয়ন ও নিত্যনতুন কৌশলে আবার ঘুরে দাঁড়াতে চায় রূপালী ব্যাংক। ব্যাংকের নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আতাউর রহমান প্রধান রূপালী ব্যাংককে দেশের দ্বিতীয় শীর্ষ ব্যাংক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘ব্যাংকটিতে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তা রয়েছেন। তাঁদের কাছ থেকে অভিজ্ঞতা নিয়ে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূচক বিশেষ করে আমানত সংগ্রহ, শাখা বিস্তার, বিনিয়োগ, ঋণ প্রদানসহ নানা সূচকে উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে চাই। দেশের শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংক সোনালী ব্যাংকের পরেই অবস্থান হওয়ার কথা ছিল রূপালী ব্যাংকের। কিন্তু সেই অগ্রগতি কিছুটা থেমে গিয়েছিল। সেটাকে কাটিয়ে সবার সহযোগিতায় ব্যাংকটিকে সামনে এগিয়ে নিতে চাই। ’

আগে শিল্প-কারখানা হতো খুলনায় আর ঋণ নেওয়া হতো ঢাকার কোনো ব্যাংকের শাখা থেকে। আবার যেমন শিল্প স্থাপন হতো ঢাকায়, ঋণ নেওয়া হতো ঢাকার বাইরের কোনো ব্যাংকের শাখা থেকে। এখন এই পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করা হচ্ছে বলে জানালেন আতাউর রহমান প্রধান। তিনি বলেন, বর্তমান সময়ে ঝামেলা কম পোহাতে ও শিল্প মালিকদের ঋণ প্রদান সহজীকরণের স্বার্থে যেখানে শিল্প-কারখানা স্থাপন করা হবে সেখানের ব্যাংকের শাখা থেকেই ঋণের প্রস্তাব আসতে হবে।

এই পদ্ধতি ইতিমধ্যেই চালু করেছে রূপালী ব্যাংক। আগামীতে এই পদ্ধতিটি স্থায়ীভাবে অনুমোদন করার চেষ্টা চলছে। এটি করা গেলে ঋণ নিয়ে অনিয়ম-দুর্নীতি বা ঋণখেলাপি অনেকটা কমে আসবে।

ব্যাংক নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে এমডি আরো বলেন, ‘ব্যাংকটির নেতিবাচক যেসব সূচক রয়েছে সেগুলো কমিয়ে আনার চেষ্টা করব। সিদ্ধান্তহীনতা, নতুন করে ঋণ না দিতে পারা, বিনিয়োগ বাড়ানোয় অক্ষমতা ইত্যাদির কারণে রূপালী ব্যাংক পিছিয়ে ছিল। ওই সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠে যথাসম্ভব এগোনো যায় সে চেষ্টাই করব। একনিষ্ঠ, একাগ্রতা ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করলে ভালো কিছু করা সম্ভব। ’

প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক থেকে গত ২৮ আগস্ট রূপালী ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও এমডি হিসেবে দায়িত্ব নিয়েছেন আতাউর রহমান প্রধান। ১৯৮৪ সালে ফিন্যানশিয়াল অ্যানালিস্ট হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে সোনালী ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সোনালী ব্যাংক ইউকে শাখার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ ৩৩ বছরের অভিজ্ঞ এই ব্যাংকার বলেন, ‘খেলাপি ঋণ শ্রেণিবিন্যাস ও পুনর্বিন্যাস করে কমানো হবে। মন্দ ঋণকে ভালো ঋণে রূপান্তর করা আমার কাছে প্রধান বিবেচ্য বিষয়। প্রভিশন ঘাটতি, ক্যাপিটাল শর্ট—সব কিছুর মূলে হলো নন-পারফর্মিং লোন তথা মন্দ ঋণ। এটিকে যত তাড়াতাড়ি কমিয়ে সহনীয় মাত্রায় আনতে পারব তত তাড়াতাড়ি আমার ব্যাংকের সম্পদ ভালো হবে। ’

আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘কিভাবে মন্দ ঋণ নন-পারফরমিং ঋণকে পারফরমিং করা যায় ও ঋণ বৃদ্ধি করা যায় সেটি নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। অতীতে যা-ই ঘটুক না কেন এখন থেকে ওইগুলো আর ওইভাবে ঘটতে দেওয়া যাবে না, সেই রকম পদক্ষেপ আমরা নিয়েছি। যে ঋণগুলো কুঋণ হয়ে গেছে, সেই ঋণগুলো শ্রেণিবিভাগ করে আমরা বিভিন্নভাবে আদায় করার চেষ্টা করছি। সর্বশেষ আমরা আইনের আশ্রয় নিচ্ছি। কর্মকর্তারা ঋণ দিতে ভয় পান, সেটির পেছনে নানাবিধ কারণ আছে। প্রথমে শক্তি, সুযোগ, দুর্বলতা ও হুমকি বিবেচনা করে এবং সার্বিক বিষয় বিশ্লেষণ করে লক্ষ্য ও কৌশল নির্ধারণ করতে চান। ’

রূপালী ব্যাংকের নবনিযুক্ত এমডি বলেন, ‘আমার প্রধান নীতি হবে সততা। আর সেটি আমার নিজের কাছ থেকেই শুরু করব। আমার সহকর্মী যদি জানেন আমি নৈতিকভাবে সৎ বা শক্তিশালী নই, তাহলে তিনি কেন আমাকে মানবেন। এখানে বিষয়টি হলো, যারা অনিয়ম বা অনৈতিক কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত, তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ, কিন্তু তারা একজোট। যারা সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারী তাদের মধ্যে কোনো জোট নেই এবং তাদের কোনো ব্যক্তিগত স্বার্থ নেই। এখন আমি চেষ্টা করছি কিভাবে তাদের অনুপ্রাণিত করে একটি সঠিক জায়গায় নিয়ে যাওয়া যায়। ’

ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কার্যক্রম নিয়ে ব্যাংকের এই শীর্ষ নির্বাহী বলেন, কয়েকটি শাখার মাধ্যমে মোট ঋণের বেশির ভাগই বিতরণ করা হচ্ছে। বিকেন্দ্রীকরণের ওপর আমরা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছি। আমরা একটি ভারসাম্যপূর্ণ ঋণ পোর্টফোলিও তৈরি করতে চাচ্ছি। সরকার আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে, কর্মকর্তাসহ সবাই সহায়তা করলে রূপালী ব্যাংক একদিন ঘুরে দাড়াবে। আমি মনে করি সোনালী ব্যাংকের পরে রূপালী ব্যাংক হওয়া উচিত ছিল, কিন্তু হয়নি। তবে আমরা চেষ্টা করব ওই ধারাটা ঠিক রাখা যায় কি না। ’

কর্মকর্তাদের কাজের বিচার বিশ্লেষণ করে পদোন্নতি ও পুরস্কারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে জানিয়ে এমডি বলেন, অন্যদিকে কেউ অসদুপায় অবলম্বন কিংবা সামর্থ্যের প্রয়োজনীয়টুকু না দিলে তাদের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রতিষ্ঠানের প্রতি আকৃষ্ট করা, আগ্রহীদের মধ্য থেকে যোগ্যদের খুঁজে বের করে দায়িত্ব প্রদান করা, কর্মীদের অনুপ্রাণিত করা ও তাদের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের সুসম্পর্ক বজায় রাখা, তাদের কর্মজীবনে উত্তরোত্তর উন্নয়নের দিক উন্মোচিত করা, প্রয়োজনে কঠোর হওয়াসহ সব ধরনের পদক্ষপ গ্রহণ করা হবে।

ঋণের সুদহার এক অঙ্কে নামিয়ে নিয়ে আসার বিভিন্ন ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘সুদের হার এক অঙ্কে নামিয়ে আনতে না পারার পেছনে নন-পারফর্মিং ঋণ একটা বড় বাধা। আমরা যেদিন এই ঋণকে পারফর্মিং করতে পারব সেদিনই আমরা সিঙ্গেল ডিজিটে আসতে পারব। ’

রূপালী ব্যাংকের যে রেমিট্যান্স প্রবাহ আছে তা একেবারে কমে যায়নি। কিভাবে রেমিট্যান্স বাড়ানো যায় সে বিষয়ে কাজ করা হচ্ছে জানিয়ে ব্যাংকের এমডি বলেন, ‘বিদেশে আমাদের রেমিট্যান্স হাউস নেই। আমরা বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে কাজ করে থাকি। আমরা সার্ভে করে দেখব কোন কোন দেশে রেমিট্যান্স হাউস করলে আমাদের রেমিট্যান্স বাড়বে। ’

কৃষিঋণ প্রসঙ্গে আতাউর রহমান প্রধান বলেন, ‘আমাদের নন-পারফর্মিং ঋণ বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু আমরা কৃষিঋণও দিয়েছি। কৃষক উপকৃত হয়েছে, ফলে দেশের উন্নতি হয়েছে, উৎপাদন বেড়েছে, দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়েছে। একসময় আমরা আমদানি করতাম, এখন আমরা রপ্তানি করছি। এই উন্নয়নগুলো ব্যাংকের উপস্থিতিতে হয়েছে। কৃষিঋণ আরো বাড়ানোর চেষ্টা করছি। কেননা কৃষির উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নির্ভর করছে। আর কৃষিঋণের বহুমুখিতা আনতে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। ’

 


মন্তব্য