kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


বিআইবিএমের সেমিনারে উদ্যোক্তাদের উদ্দেশে বক্তারা

বড় প্রকল্পে যৌথভাবে ঋণ দেবে ব্যাংক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৭ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



বড় প্রকল্পে যৌথভাবে ঋণ দেবে ব্যাংক

সেমিনারে বক্তব্য দেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী

সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত বিদ্যুৎ, বস্ত্র, টেলিকম, সিমেন্ট, আবাসন, ইস্পাত, অবকাঠামোসহ বিভিন্ন খাতে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছে। আর এই আয়োজনে অর্থের জোগান দিয়ে উন্নয়নে শামিল হচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

তবে একক কোনো ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান বা গ্রুপকে এক-দেড় হাজার কোটি টাকা একটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ঋণ দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় সিন্ডিকেটেড বা যৌথভাবে ঋণ দিচ্ছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক জরিপে দেখা গেছে, দেশে কার্যরত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এ রকম ৩৯৮টি বড় প্রকল্পে মোট ৭৬ হাজার ৫২৯ কোটি টাকা ঋণ জোগান দিয়েছে। সিন্ডিকেটেড ঋণ খেলাপি হওয়ার প্রবণতাও কম। দেশের ব্যাংক খাতের মোট খেলাপি ঋণের ০.৬৪ শতাংশ সিন্ডিকেটেড ঋণ। যেখানে সামগ্রিক ব্যাংক খাতে বিতরণ করা ঋণের ১০.০৬ শতাংশই খেলাপি। তা ছাড়া সিন্ডিকেটেড ঋণ খেলাপিতে পরিণত হলেও একক কোনো ব্যাংকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে না। চাপটা অংশগ্রহণকারী সব ব্যাংকই ভাগ করে নেয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর মিরপুরে বিআইবিএমের উদ্যোগে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে সিন্ডিকেটেড ঋণ : বর্তমান অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক সেমিনারে বক্তারা এসব তথ্য তুলে ধরেন। এ সময় তাঁরা দেশের উদ্যোক্তাদের বড় বড় প্রকল্প হাতে নিতে উৎসাহিত করেন এবং সিন্ডিকেটেড ঋণ প্রাপ্তির আশ্বাস দেন।

বড় কোনো বিনিয়োগ প্রকল্পে একক কোনো ব্যাংকের পক্ষে পুরো ঋণের অর্থ জোগান দেওয়া সম্ভব না হলে ওই ব্যাংক আরো কয়েকটি ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে সঙ্গে নিয়ে সিন্ডিকেটেড ঋণ দিয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা হবে দুটি। একটি ব্যাংক হবে প্রধান আয়োজক বা লিড অ্যারেঞ্জার। অন্য ব্যাংকগুলোকে বলা হয় এজেন্ট ব্যাংক।  

১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হলেও মূলত ২০০৫ সাল থেকেই সিন্ডিকেটেড ঋণ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। গত ২০ বছরের বেশি সময়ে প্রায় ৭৬ হাজার ৫২৮ কোটি ৭৩ টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ দিয়েছে দেশের কার্যরত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। এই সময়ে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তির ১২টি খাতের ৩৯৮টি প্রকল্পে এসব ঋণ দেওয়া হয়েছে। এসব ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে ৪৫.৭৩ শতাংশ প্রকল্পের এবং  মোট ঋণের ৩৬ শতাংশ অর্থের জোগান দিয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। গত ২০ বছরে সিন্ডিকেটেড ঋণ দিতে গিয়ে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মাত্র ০.৬৪ শতাংশ খেলাপি হয়েছে। এই সময়ে সিন্ডিকেটেড ঋণের ০.৫২ শতাংশ পুনর্গঠন করা হয়েছে।

বিআইবিএম মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ওই কর্মশালায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী। গবেষণাপত্র উপস্থাপন করেন বিআইবিএমের সুপারনিউম্যারারি অধ্যাপক হেলাল আহমদ চৌধুরী। আরো বক্তব্য দেন অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস উল ইসলাম, এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হাফিজ আহমদ, আইডিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ খান। সঞ্চালকের ভূমিকা পালন করেন বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমেদ চৌধুরী।

এস কে সুর চৌধুরী বলেন, কোনো প্রজেক্টে বড় আকারে ঋণ দেওয়ার জন্য এটি একটি ভালো সুযোগ। বিআইবিএমের গবেষণায় উঠে এসেছে এখানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ খুবই কম। যেখানে ব্যাংকগুলো অনেক দিন ধরে খেলাপি গ্রাহকদের হাত থেকে বের হয়ে আসার জন্য কাজ করছে সেখানে এটি একটি ভালো সুযোগ বলতেই হবে। কারণ এখানে বিভিন্ন ধাপে, কয়েকটি মাধ্যম মিলে ঋণটি পর্যবেক্ষণ করতে থাকে বলেই আদায় বেশি হয়।

অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস উল ইসলাম বলেন, ‘আমরা এখন পর্যন্ত ১৮টি প্রকল্পে দুই হাজার ছয় কোটি টাকা সিন্ডিকেটেড অর্থায়ন করেছি। এর মধ্যে ১৬টি প্রকল্পে অগ্রণী ব্যাংক প্রধান সমন্বয়কের (লিড অ্যারেঞ্জার) ভূমিকায় ছিল। ’

তবে এনসিসি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোলাম হাফিজ বলেন, গ্রাহকরা অনেক সময় নিয়ম-কানুন মানতে চায় না। তারা যত দ্রুত সম্ভব টাকা হাতে পেতে চায়। সব কিছু সমন্বয় করতে যে সময়ের প্রয়োজন তা তারা দিতে চায় না। এতে করে অনেক সময় ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বিপদে পড়তে হয়। তবে যেসব ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান সিন্ডিকেটেড ঋণ দেয় সেখানে কোনো ধরনের জটিলতা তৈরি হলেই সমন্বয়হীনতা তৈরি হয় বলে জানান তিনি।

গোলাম হাফিজ আরো বলেন, ঋণ আদায়ে কোনো সমস্যা হলে বা প্রকল্প ব্যর্থ হলে প্রধান আয়োজক অন্যদের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেয়। তবে সব কিছুর পরও  ৫০, ৬০ বা ১০০ কোটি টাকার বেশি প্রজেক্ট ফিন্যান্সে সিন্ডিকেটেড ঋণ দেওয়াই অনেক বেশি যুক্তিযুক্ত। এখানে এককভাবে যাওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশ ব্যাংককে এ বিষয়ে একটি নীতিমালা এমনভাবে তৈরি করার অনুরোধ করেন তিনি, যেখানে এ বিষয়ে যেন কাউকে বাধ্য না করা হয়।

আইডিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আরিফ খান বলেন, ‘১৯৯৫ সাল থেকে শুরু হলেও মূলত ২০০৫ সাল থেকেই সিন্ডিকেটেড ঋণ জনপ্রিয় হতে শুরু করে। এসব ঋণের জন্য ১০ থেকে ১৫ বছরের সময় দিতে পারলে ভালো হয়। কিন্তু আমরা গ্রাহকদের পাঁচ-সাত বছরের বেশি দিতে পারি না। ’

কর্মশালায় গবেষণাপত্রে উল্লেখ করা হয়, সবচেয়ে বেশি পরিমাণে সিন্ডিকেটেড ঋণ দেওয়া হয় জ্বালানি খাতে। এ খাতের ৬৩টি প্রকল্পে বিতরণ করা হয় ২২ হাজার ১৭১ কোটি টাকা। যা মোট প্রকল্পের ১৫.৮৩ শতাংশ ঋণ দেওয়া হয়েছে জ্বালানি খাতে। অন্যদিকে মোট সিন্ডিকেটেড ঋণের ২৮.৯৭ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে এ খাতে। এর পরেই রয়েছে টেলিকম খাত। এ খাতের ২৯টি প্রকল্পে ১৩ হাজার ৬৮৫ কোটি ১৮ লাখ টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ দেওয়া হয়। যা মোট সিন্ডিকেটেড ঋণের ১৭.৮৮ শতাংশ।

প্রকৌশল ও ইস্পাত খাতের ৪৯টি প্রকল্পে বিতরণ করা হয় ৯ হাজার ৪৯৬ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১২.৪১ শতাংশ। গার্মেন্ট, টেক্সটাইল এবং স্পিনিং এই তিন খাত নিয়ে পোশাকশিল্পের ৮৫টি প্রকল্পে বিতরণ করা হয় ছয় হাজার ৫৫১ কোটি টাকা। যা মোট প্রকল্পের ২১.৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৮.৫৬ শতাংশ সিন্ডিকেটেড ঋণ বিতরণ করা হয়েছে দেশের অন্যতম রপ্তানি শিল্প খাতে। এ ছাড়া বিমান ও পরিবহন খাতের ১২টি প্রকল্পে ছয় হাজার ২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ দেওয়া হয়, যা মোট ঋণের ৭.৮৭ শতাংশ। খাদ্য, পানীয় এবং কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ২৬টি প্রকল্পে ঋণ দেওয়া হয় দুই হাজার ৩৫৫ কোটি ৩১ লাখ টাকা, যা মোট সিন্ডিকেটেড ঋণের ৩.৮ শতাংশ। সিমেন্ট ও সিরামিক খাতের ২৩টি প্রকল্পে এক হাজার ৯০০ কোটি টাকার সিন্ডিকেটেড ঋণ দেওয়া হয়, যা মোট ঋণের ২.৪৮ শতাংশ। ওষুধ ও রাসায়নিক খাতের ১৫টি প্রকল্পে এক হাজার ৩৩০ কোটি টাকা দেওয়া হয়, যা মোট সিন্ডিকেটেড ঋণের ১.৭৪ শতাংশ। সেবা খাতের ২১টি প্রকল্পে এক হাজার ৮৩২ কোটি টাকা এবং বিবিধ খাতের ৪১টি প্রকল্পে পাঁচ হাজার ৫৫৮ কোটি ২৬ লাখ টাকার ঋণ দেওয়া হয়েছে। যা মোট সিন্ডিকেটেড ঋণের যথাক্রমে ২.৩৯ ও ৭.২৬ শতাংশ।

সিন্ডিকেটেড ঋণ অনুমোদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে প্রধান সমন্বয়ক ব্যাংক। বিআইবিএমের গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৯৫-২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মোট সিন্ডিকেটেড ঋণের ৪৫.৭৩ শতাংশ প্রকল্পের বেশির ভাগই প্রধান সমন্বয়কে ছিল বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। এর মধ্যে ১৮.৮৪ শতাংশ প্রকল্পে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো এবং ১৭.৩৪ শতাংশ প্রকল্পে সরকারি, বিদেশি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো প্রধান সমন্বয়কের (লিড অ্যারেঞ্জার) ভূমিকা পালন করেছে।

গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা যায়, গত ২০ বছরের বেশি সময়ে প্রধান সমন্বয়ক ব্যাংক হিসেবে বিতরণকৃত মোট ঋণের ৪১ শতাংশ অর্থের জোগান দিয়েছে বিদেশি খাতের ব্যাংকগুলো। পাশাপাশি প্রধান সমন্বয়ক হিসেবে ৩৬ শতাংশ অর্থের জোগান দিয়েছে বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলো। আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো দিয়েছে ১৫ শতাংশ অর্থের জোগান এবং সবচেয়ে কম সংখ্যক ৮ শতাংশ অর্থের জোগান দিয়েছে সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো।

প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৫-২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের ব্যাংকিং খাতের মোট ঋণের মধ্যে ১০ শতাংশ বিতরণ করা হয়েছে সিন্ডিকেশন করে। প্রতিবেদনে এই ১০ শতাংশ ঋণের মধ্যে মাত্র ০.৬৪ শতাংশ খেলাপি দেখানো হয়েছে।


মন্তব্য