kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


এসডিজি অর্জনে বাধা অর্থায়ন ও জনপ্রশাসনের অদক্ষতা

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



এসডিজি অর্জনে বাধা অর্থায়ন ও জনপ্রশাসনের অদক্ষতা

গতকাল এমসিসিআই ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্মের যৌথভাবে আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রায় (এমডিজি) বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সূচকে কাঙ্ক্ষিত ফল অর্জন করলেও ২০৩০ সালের মধ্যে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) বাস্তবায়নে বড় বাধা হবে অর্থায়ন ও সরকারি কর্মকর্তাদের অদক্ষতা। ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্য (এসডিজি) অর্জনে ব্যক্তি খাতের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে উপস্থিত বক্তারা এসব মন্তব্য করেন।

গতকাল রবিবার মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই) ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে।

এমসিসিআইয়ের সভাপতি সৈয়দ নাসিম মঞ্জুরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান, এমপি। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রথম সহসভাপতি শফিউল ইসলাম। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নিউ এইজ গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান বিজনেজ ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিইউআইএলডি) চেয়ারম্যান আসিফ ইব্রাহিম।

সেমিনারে বক্তারা বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে বেসরকারি খাত প্রস্তুত রয়েছে। তবে এ জন্য বড় ধরনের অর্থায়ন প্রয়োজন। বিষয়টি আগামী বাজেটে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এ ছাড়া দেশে আমলাদের দক্ষতার অভাব রয়েছে। ছোট কোনো বিষয় সমাধান করতেও তাদের দিয়ে কাজ হয় না। প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। এসব অদক্ষ আমলারা বহাল থাকলে এসডিজি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

প্রবন্ধে বলা হয়, এমডিজিতে বাংলাদেশ বেশ কয়েকটি সূচকে উন্নতি করেছে। তবে ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজির ৮, ৯ এবং ১২-এর সূচক উন্নয়নে ব্যক্তি খাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। এ ছাড়া প্রচুর অর্থায়নের দরকার রয়েছে। এ জন্য সরকার, উদ্যোক্তা এবং সুধীসমাজের সমন্বয়ে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা কমিটি করতে হবে। নীতিমালা বাস্তবায়নে এই সমন্বয় কমিটি কাজ করবে। এ ছাড়া দেশের উন্নয়নসংক্রান্ত প্রতিটি খাতের তথ্য ব্যাংক থাকতে হবে। পাবলিক প্রাইভেট সংলাপের মঞ্চ, উদ্ভাবনী সক্ষমতা বাড়াতে তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে সহায়তা বাড়ানো এবং শিল্পনীতিতে অগ্রাধিকার দেওয়া খাতগুলোতে কর্মশক্তির হালনাগাদ তথ্য ব্যাংক জরুরি বলে মত দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রতিমন্ত্রী আব্দুল মান্নান বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার ও বেসরকারি খাতকে বড় অবদান রাখতে হবে। এ জন্য এ খাতের উন্নয়নে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘চলতি অর্থবছরের বাজেটে বৈদেশিক অনুদান ১ শতাংশেরও নিচে। আর এসডিজি বাস্তবায়নে ৮০ শতাংশ অর্থই ব্যয় হবে দেশীয় সম্পদ থেকে। আমরা এখন আর বিদেশি অর্থায়নের দিকে তাকিয়ে নেই। তাই এসডিজি বাস্তবায়নে আমাদের রাজস্ব বাড়াতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা। আমরা ব্যবসায়ীদের সংগঠন এফবিসিসিআই, এমসিসিআই, ডিসিসিআইসহ সবার সহযোগিতায় আগামী অর্থবছরেই নতুন ভ্যাট আইন বাস্তবায়ন করব। ’ এসডিজি অর্জন করতে হলে আমাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে গবেষণা করতে হবে উল্লেখ করে এম এ মান্নান বলেন, ‘এ জন্য সঠিক তথ্যের জোগান থাকা প্রয়োজন। তাই তথ্যভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে আমরা বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোকে আধুনিকায়ন করছি। ’ এম এ মান্নান  আরো বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য হলো আমরা বাংলাদেশে একটি মেগা ভিলেজ করে গড়ে তুলব। যেখানে জেলাগুলোর মধ্যে যোগাযোগব্যবস্থা খুব সহজ হবে। ’

শফিউল ইসলাম বলেন, ‘বাংলাদেশের আমদানি ও রপ্তানির বেশির ভাগই হয় চট্টগ্রাম বন্দরের মধ্য দিয়ে। এ বন্দরের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন হতে হবে। অথচ সম্প্রতি চট্টগ্রাম বন্দর সচল করাকে কেন্দ্র করে আমাদের আমলাদের অদক্ষতা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে উদ্যোক্তাদের। শেষ পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে সমস্যার সমাধান করতে হয়েছে। এ ধরনের অদক্ষ আমলাদের দিয়ে এসডিজি বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। এ ছাড়া বাজেটের সময়ও আমাদের আমলাদের অদক্ষতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাজেটের আগে তারা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করে। কিন্তু বাজেটে ব্যবসায়ীদের সুপারিশের কোনো প্রতিফলন থাকে না। ’

ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, ‘এসডিজি বাস্তবায়নের অর্থ শুধু প্রবৃদ্ধি অর্জন আর বেকারত্ব দূর করা নয়। বরং এর অর্থ হলো একটি বসবাসযোগ্য পৃথিবী তৈরি করা। শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল তৈরি করা। নারীদের জন্য সহায়ক কর্মপরিবেশ তৈরি করা। বেসরকারি খাতের জন্য বিনিয়োগ সহায়ক অবকাঠামো তৈরি করা এবং মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা। এ বিষয়গুলো সরকার একা করতে পারবে না। এ জন্য সবার সমন্বিত পদক্ষেপ প্রয়োজন। সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করে এগিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু আমাদের দেশে তথ্যের অপর্যাপ্ততা রয়েছে। গবেষণার অভাব রয়েছে। ’

ফারজানা চৌধুরী বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নে সরকার ও বেসরকারি খাতের সমন্বয়ে একটি কমিটি করা দরকার। যারা এসডিজি বাস্তবায়নে একটি গাইডলাইন তৈরি করবে। বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হচ্ছে কি না, তা তদারকি করবে। আর বেসরকারি খাত যেন তাদের দায়িত্ব পালনে সহজ শর্তে অর্থ পায়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।

ঢাকা চেম্বারের সাবেক সভাপতি আবুল কাশেম খান বলেন, এসডিজি বাস্তবায়নের জন্য শিল্পায়নের বিকল্প নেই। তবে জমি ব্যবহারে সতর্ক হতে হবে। এ জন্য একটি নীতিমালা করা যেতে পারে। পরিকল্পিত নগরায়ণ, সরকারি কেনাকাটায় স্বচ্ছতা ও উদ্ভাবন খুব জরুরি।

প্রবন্ধের ওপর প্যানেল আলোচক ছিলেন গ্রিন ডেল্টা ইনস্যুরেন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফারজানা চৌধুরী। সভায় অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম, বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী কল্যাণ সমিতির প্রতিষ্ঠাতা আব্দুস সাত্তার দুলাল, বাংলাদেশ ইন্ডেন্টিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এম এস সিদ্দিকী প্রমুখ।

 


মন্তব্য