kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অর্থপাচার রোধে কমিশনের প্রস্তাব

বানিজ্য ডেস্ক    

২ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



অর্থপাচার রোধে কমিশনের প্রস্তাব

নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অতিথিরা

বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অপরাধ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। বড় অঙ্কের ঋণখেলাপি হচ্ছে, শেয়ারবাজার লুট হচ্ছে, সেই সঙ্গে প্রতিবছর দেশ থেকে ২০ বিলিয়ন ডলার অর্থপাচার হয়।

বিষয়টি তদন্ত করতে একটি নিরপেক্ষ, বিশ্বাসযোগ্য ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠন করার দাবি জানান যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা। গত শুক্রবার নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটসের জুইস সেন্টারে ইন্টারন্যাশনাল কমিটি অ্যাগেইনস্ট ফিন্যানশিয়াল ক্রাইমস ইন বাংলাদেশ আয়োজিত সেমিনারে বক্তারা এসব দাবি জানান।

‘বাংলাদেশের জনগণের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক অপরাধ’ বিষয়ক এ আন্তর্জাতিক সেমিনারটি আয়োজনে সহযোগিতা করেছে বিশ্বব্যাপী অর্থপাচার বিষয়ক ওয়াচডগ ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি (জিএফআই)’। সেমিনারে ‘ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম ইন বাংলাদেশ : মানি লন্ডারিং অ্যান্ড বিয়ন্ড’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন লং আইল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক ড. শওকত আলী। ইলিসিট মানি ট্রান্সফার ফ্রম বাংলাদেশ : পলিসি রিকমেন্ডশন ফর গভর্নমেন্ট’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জিএফআইর প্রধান অর্থনীতিবিদ দেব কর। ‘ফিন্যানশিয়াল ক্রাইম ইন বাংলাদেশ : হাউ উইল ইট ইমপ্যাক্ট অ্যাচিভিং সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট গোল’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্কের (সানি) অর্থনীতির অধ্যাপক মাহফুজুর রহমান এবং ‘সোসিও-ইকোনমিক কন্ডিশন অব বাংলাদেশ’ বিষয়ক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিশিষ্ট লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মাহমুদ রেজা চৌধুরী। লেখক ও সাংবাদিক কাউসার মুমিনের সঞ্চালনায় সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী ইমরান আনসারী। এ ছাড়া সেমিনারে মূক্ত আলোচনায় অংশ নেন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখা বিশেষজ্ঞরা।

ড. শওকত আলী বলেন,  সবার জন্য অর্থনৈতিক ন্যায় বিচার মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। যদি কোথাও কোনো সমাজে সরকারি দুর্নীতি কিংবা পাবলিক প্রাইভেট সেক্টরে দুর্নীতি হয় তাহলে আবশ্যিকভাবে মানুষের মৌলিক মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়। তিনি বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডাটা গবেষণা করে দেখিয়ে বলেন, স্বাধীনতার বিগত ৪৫ বছরে সরকারি পর্যায়ের দুর্নীতির কারণে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থপাচার হয়েছে।   সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে যে ১০০ মিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল ঘটনা। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশে প্রধানত অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা হচ্ছে শেয়ারবাজারকে কুক্ষিগত করা, রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা ঋণখেলাপি হওয়া, সংসদ সদস্য, আমলা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ মওকুফ করা ইত্যাদি কারণে।

সেমিনারে আলোচনায় অর্থনীতিবিদ ড. দেব কর বলেন, অর্থপাচার নিয়ে জিএফআইর সম্প্রতি যে গবেষণা প্রতিবেদন বেরিয়েছে তাতে যে পরিমাণ অর্থ অবৈধভাবে বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পাচারের তথ্য দেখানো হয়েছে তার থেকেও বেশি অর্থপাচার হয়েছে।

বিশ্বব্যাপী অবৈধ অর্থপাচারের সঠিক চিত্র তুলে ধরতে না পারার সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরে দেব কর আরো বলেন, জিএফআইর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাপী অবৈধ অর্থপাচারের যে প্রতিবেদন তুলে ধরে তা পুরো নির্ভরশীল বিভিন্ন দেশের সেন্ট্রাল ব্যাংক ও অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর দেওয়া তথ্যের ওপর। কিন্তু এ তথ্য বিনিময় ও সহযোগিতা নিতান্ত সীমাবদ্ধ। দর্শকদের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, যদি সত্যিকার অর্থেই বাংলাদেশ সরকার অবৈধ অর্থপাচার বন্ধ করতে চায় তাহলে তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে জিএফআইর মতো গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে সহযোগিতা চাইতে পারে।

দেব কর বলেন, যদি বাংলাদেশ সরকারের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারকরা অর্থপাচার বন্ধে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন তাহলে এ জন্য তাঁদের কোনো অর্থও খরচ করতে হবে না। কারণ নরওয়ে, সুইডেন এবং ফিনল্যান্ডের মতো বহু দেশ রয়েছে যারা এসব কাজে গবেষণা চালাতে  নিয়মিত অর্থ সহযোগিতা দিয়ে যাচ্ছে।

দেব কর বলেন, বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোর কাস্টমস ও ব্যাংকিং প্রশাসন সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত। বাংলাদেশের জনগণের মধ্য থেকে যদি কোনো গ্রুপ নতুন ধারণা নিয়ে এই অবৈধ অর্থপাচার রোধে গণসচেতনতা বাড়াতে পারে তাহলে এ ক্ষেত্রে খুবই কাজ হবে।

মাহমুদ রেজা চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমানে আমরা পুরো জাতি সংকীর্ণ মনমানসিকতা নিয়ে রাজনৈতিক কারণে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছি। আর এ কারণেই আমরা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়ছি। ’

অধ্যাপক ড. মাহফুজুর রহমান বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স মাত্র দেশের ১ শতাংশ লোক লুটপাট করে খাচ্ছে। স্বাধীনতার এই ৪৫ বছরে দেশের জীবনযাত্রার মান উন্নত না হয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার অবনতিই হচ্ছে। আর রাজনীতিবিদরা তাদের সন্তানদের দেশের টাকায় বিদেশে পড়াচ্ছে।


মন্তব্য