kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


অনলাইনে দরপত্র পূরণ

বেশি সার্ভিস চার্জ নেওয়ার অভিযোগ ব্যাংকের বিরুদ্ধে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



বেশি সার্ভিস চার্জ নেওয়ার অভিযোগ ব্যাংকের বিরুদ্ধে

সরকারি কাজে দরপত্র জমা দিতে গিয়ে দুই গ্রুপের মধ্যে মারামারি ও দরপত্রের বাক্স ছিনতাই রোধে ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে দরপত্র পূরণ ও টাকা জমা দেওয়ার নিয়ম করেছে সরকার। কিন্ত এ সুযোগে ব্যাংকগুলো ঠিকাদারদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ‘সার্ভিস চার্জ’ কেটে রাখছে বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার ও বাস্তবায়নকারী সংস্থার কর্মকর্তারা।

গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক সেমিনারে সারা দেশ থেকে আসা ঠিকাদাররা তাঁদের ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তাঁরা বলেছেন, বর্তমান সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে ব্যাংকের মাধ্যমে অনলাইনে দরপত্র আহ্বান শুরু করলেও সরকারি ব্যাংকগুলো দরপত্র পদ্ধতিতে তেমন আগ্রহ দেখায় না। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এখনো বেশির ভাগ ব্যাংকে ই-জিপি পদ্ধতি চালু হয়নি। কোনো শাখায় গেলে তাঁদের হয়রানি করে। একটি জেলায় হাতে গোনা দু-একটি ব্যাংকে অনলাইনে দরপত্র পূরণ ও টাকা জমা দেওয়ার সুযোগ আছে। বেশির ভাগ ব্যাংক তা পূরণ করে না। ই-জিপি সমন্বয়কের দায়িত্বে থাকা সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটের (সিপিটিউ) কর্মকর্তারা বলেছেন, কোনো একজন ঠিকাদার ব্যাংকে গিয়ে অনলাইনে দরপত্র পূরণ করলে তাঁর সব তথ্য অন্যের কাছে চলে যাওয়ার ঘটনা ঘটছে। ব্যাংকের কর্মকর্তাদের এ ধরনের অনৈতিক কাজে জড়িয়ে যাওয়া কিছুতেই কাম্য হতে পারে না। ব্যাংকের সার্ভিস চার্জ যৌক্তিক পর্যায়ে নিয়ে আসার দাবি করেন তাঁরা।

‘ই-জিপি সিস্টেমে ব্যাংকের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ’ শিরোনামের সেমিনারে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) সচিব ফরিদ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী, ঢাকায় নিযুক্ত বিশ্বব্যাংকের আবাসিক প্রধান চিমিয়াও ফান। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিটিইউয়ের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফারুক হোসেন। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন ই-জিপিতে সরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ পেমেন্ট গ্রহণকারী অগ্রণী ব্যাংকের এমডি মোহাম্মদ শামস-উল ইসলাম এবং বেসরকারি ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ পেমেন্ট গ্রহণকারী ইউনাইডেট কমার্শিয়াল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুহাম্মদ আলী। সেমিনারে ক্রয়কারী সংস্থার কর্মকর্তা, ঠিকাদার, সিপিটিইউ-এর সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ৪২টি ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অংশগ্রহণ করেন। সেমিনারে অংশ নেওয়া ঠিকাদার আকরাম হোসেন ভূঁইয়া, সাইফুল ইসলামসহ সিপিটিইউ মহাপরিচালক ফারুক হোসেন বলেন, ব্যাংকগুলো সার্ভিস চার্জ বাবদ অতিরিক্ত টাকা কেটে রাখে। এটাকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনা জরুরি। সেমিনারে জানানো হয়, সার্ভিস চার্জ কত হবে, তা নিয়ে ব্যাংককের নীতিনির্ধাকরদের সঙ্গে বৈঠকে বসে চূড়ান্ত করা হবে।

পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেছেন, মন্দ ঋণের মূল কারণ হচ্ছে আমাদের দেশে সুদের হার অনেক বেশি। এত সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো লাভ করতে পারে না। বিশ্বের অন্য কোনো দেশ আমাদের দেশের ব্যাংকের মতো ব্যবসা করে না। দেশের ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণ নিয়েই কাজ করে। বিদেশে ব্যাংকগুলো আমানত ও ঋণ নিয়ে কাজ করে না। অন্যান্য দেশে ব্যাংকের সুদের হার অনেক কম। ব্যাংকগুলোকে খুঁজে বের করতে হবে কিভাবে ঋণ দেওয়া যায়। অন্যদিকে যারা ঋণগ্রহীতা তাদের উচিত টাকা পরিশোধ করা এবং ব্যাংকগুলোর উচিত মামলা না করা। মন্ত্রী বলেন, একজন গ্রাহক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে যদি পরিশোধ না করেন, তাহলে ব্যাংকগুলোর উচিত তাঁর বিরুদ্ধে মামলা না করে ঋণগ্রহীতাসহ তাঁর আত্মীয়স্বজনদের তথ্য অন্য ব্যাংকে মন্দ ঋণের কথা বলে দেওয়া।

পরিকল্পনামন্ত্রী  আরো বলেন, যাঁরা  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জমি দান করেন তাঁরা কোনো রকম একটি ঘর তুলে কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে সরকার ভবন করে দেয়। শিক্ষকদের বেতন দেয়। কিন্তু ওই জমিদাতা মনে করেন, তিনি সেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মালিক। তেমনি ব্যাংকগুলো যাঁরা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন তাঁরা নিজেদের ব্যাংকের মালিক মনে করেন। কিন্তু এটা ঠিক নয়। ব্যাংকের প্রকৃত মালিক জনগণ। পরিবারতন্ত্র থেকে ব্যাংক খাতকে বের করে আনতে হবে। সেবার মনোভাব নিয়ে ই-জিপিতে ব্যাংকগুলোকে সহযোগিতা করতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গর্ভনর সিতাংশু কুমার সুর চৌধুরী বলেন, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যেসব ব্যাংকের শাখা রয়েছে সেগুলোকে ই-জিপি সেবা দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। ব্যাংকের ফি জাতীয়ভাবে নির্ধারণ করা দরকার। এ জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের করণীয় কিছু থাকলে তা করা হবে। বিভিন্ন ব্যাংকের দুই হাজারের মতো শাখা এখন ঠিকাদারদের সহযোগিতা দিচ্ছে। যেসব ব্যাংকের শাখা ঠিকাদারদের তথ্য অন্যের কাছে দেয়, তাদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে তিনি বলেন, ব্যাংকের মূল দায়িত্বই হলো তার গ্রাহকের তথ্য সংরক্ষণ করা। অন্যের কাছে দেওয়া নয়।

ই-জিপিতে সহযোগিতাকারী সংস্থা বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের আবাসিক প্রধান চিমিয়াও ফান বলেন, ‘আমরা চাই সরকারের টাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা। সরকারি টাকায় যাতে অপচয় না হয় সেদিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া। এ জন্য দরপত্র বাক্সের পরিবর্তে অনলাইনে দরপত্র পূরণ ও অংশগ্রহণের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের দক্ষতা আরো বাড়াতে হবে। আইএমইডি সচিব ফরিদ উদ্দিন আহম্মদ চৌধুরী বলেন, বর্তমানে ৪৫০টি সরকারি সংস্থা ই-জিপিতে যুক্ত রয়েছে। ২৩ হাজার ৭৬৩ জন ঠিকাদার  নিবন্ধন করা হয়েছে। ৬৩ হাজার ২৩৭টি টেন্ডার সম্পন্ন হয়েছে। যার মূল্য হচ্ছে ৫৫ হাজার কোটি টাকা।


মন্তব্য