kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এক ধাপ এগোল বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এক ধাপ এগোল বাংলাদেশ

গতকাল বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন প্রকাশ করে সিপিডি

বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা সূচকে এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ১৩৮টি দেশের মধ্যে এবার বাংলাদেশ ১০৬তম স্থানে উঠে এসেছে।

গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১০৭তম। গতকাল বুধবার ‘বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতা প্রতিবেদন ২০১৬-১৭’ প্রকাশ করে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম (ডাব্লিউইএফ)। বিশ্বের ১৩৮টি দেশ থেকে একযোগে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়।

গতকাল রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বাংলাদেশ সম্পর্কিত প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, নানা সীমাবদ্ধতার পরও অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এক ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। এর একটি কারণ হতে পারে, প্রতিযোগী দেশগুলোর আরো বেশি খারাপ পারফরম্যান্সের কারণে বাংলাদেশ এগিয়ে এসেছে। ১২টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ৮৯টি মাঝারি ও বড় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মতামত নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে।

মূল প্রতিবেদনটি তুলে ধরেন সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খোন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এ সময় অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. মোস্তাফিজুর রহমান। গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। তবে এগোনোর ক্ষেত্রে যে গতি থাকা দরকার তা নেই। ‘আমরা হাঁটছি আর অন্যরা দৌড়াচ্ছে’। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘আমরা এখন নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশের তালিকায় আছি। আমাদের লক্ষ্য হলো উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া। এ ক্ষেত্রে আমাদের প্রতিযোগিতার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। ’ ২০০১ সাল থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে সক্ষমতা সূচক প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ডাব্লিউইএফ। সিপিডি ফোরামের সহযোগী হিসেবে কাজ করে আসছে।

প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে সিপিডি বলেছে, দেশের অর্থনীতিতে ১৬টি মৌলিক সমস্যা রয়েছে। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা হলো আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব এবং অবকাঠামো দুর্বলতা। সাম্প্রতিক সময়ে অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ বাড়লেও তা এখনো ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য পর্যাপ্ত নয়। ব্যবসার ক্ষেত্রে পুঁজির সহজলভ্যতা নেই। এ ক্ষেত্রে ঋণের উচ্চ সুদ এবং বিভিন্ন উপখাতে ব্যবসার ব্যয় বেড়েছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত হারে বিনিয়োগ বাড়ছে না। বড় কয়েকটি গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে ব্যবসা-বাণিজ্য। সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে বলেও অভিমত ব্যক্ত করেছে সিপিডি।

বৈশ্বিক সক্ষমতা সূচক প্রতিবেদন তৈরি করতে গিয়ে একটি দেশের অবস্থান নির্ণয়ের জন্য প্রতিষ্ঠান, অবকাঠামো, সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ, স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষা, উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ, পণ্য বাজারে দক্ষতা, শ্রমবাজারে দক্ষতা, আর্থিক খাতের উন্নয়ন, প্রযুক্তিগত উন্নতি, বাজারের আকার; বাজারের সংবেদনশীলতা এবং নতুনত্ব—এই ১২টি সূচক বিবেচনায় নেওয়া হয়। প্রতিবেদন অনুসারে, ১৩৮টি দেশের মধ্যে ২০১৬ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬তম। আগের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে এই অবস্থান ছিল ১০৭তম। সাত স্কোরের মধ্যে সব মিলিয়ে বাংলাদেশের স্কোর হয়েছে ৩ দশমিক ৮। আগের বছর স্কোর ছিল ৩ দশমিক ৭।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও প্রাথমিক শিক্ষায় সন্তোষজনক অগ্রগতি নেই। এ ছাড়া সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিবেশ এবং বাজারের আয়তনের দিক থেকে বাংলাদেশ কিছুটা পিছিয়েছে। কিছুটা অগ্রগতি হলেও এখনো যেসব বিষয়ের ওপর নজর দিতে হবে, সেগুলো হলো—প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা, বিচার বিভাগ, শ্রমবাজারের দক্ষতা, উদ্ভাবন এবং প্রযুক্তিগত প্রস্তুতি। প্রকাশিত রিপোর্ট অনুসারে, প্রতিযোগিতা সক্ষমতায় এবারও প্রথম অবস্থান ধরে রেখেছে সুইজারল্যান্ড। তাদের স্কোর সাতের মধ্যে ৫ দশমিক ৮। আর সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে আছে ইয়ামেন।

প্রতিযোগিতা সক্ষমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ১৬টি সমস্যা চিহ্নিত করা হয়েছে। জরিপে মতামত দেওয়া ৮৯ জন ব্যবসায়ীর মধ্যে ৮০ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য প্রধান সমস্যা অবকাঠামো দুর্বলতা। ব্যবসায়ীদের মতে, ঘুষ-দুর্নীতি কিছুটা কমেছে। তবে এখনো প্রতিযোগী দেশের তুলনায় দুর্নীতি অনেক বেশি। ৬২ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন ব্যাংকঋণ পেতে ঘুষ দিতে হয়। গত বছর যা ছিল ৮৯ শতাংশ। বিভিন্ন কম্পানির কর প্রদানের ক্ষেত্রে রসিদ ছাড়া টাকা দিতে হয়। অর্থাৎ ঘুষ ছাড়া কর দেওয়া যায় না। ৬১ শতাংশ ব্যবসায়ীর মত হলো—বিচার বিভাগে সরকার হস্তক্ষেপ করছে। এতে ব্যক্তিগতভাবে এবং প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিচার কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ৬৩ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করেন সরকার ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রভাব সৃষ্টি করছে। ৫৩ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করছে, দেশের সংবাদপত্রের স্বাধীনতা সীমিত। গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বাড়াতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অন্যতম সমস্যা হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। এখানে পুঁজির সহজলভ্যতা নেই। ব্যাংকে অলস টাকার পাহাড় জমা হলেও এখনো সুদের হার সেভাবে কমেনি। সংস্থাটির বিবেচনায় অন্যান্য সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে—নীতিনির্ধারণে অস্থিতিশীলতা, প্রশিক্ষিত জনশক্তির অভাব, উচ্চ কর হার, করের বিভিন্ন আইনে জটিলতা, বৈদেশিক মুদ্রার পরিচালনায় কার্যকর নীতির অভাব, মূল্যস্ফীতি, নৈতিকতার অভাব, উদ্ভাবনী ক্ষমতার অভাব, শ্রম আইনের সীমাবদ্ধতা এবং জনস্বাস্থ্য।

প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যবসায়ীরা প্রথম প্রতিবন্ধকতা হিসেবে অবকাঠামো দুর্বলতাকে উল্লেখ করেছেন। এবারও দুর্নীতিকে দ্বিতীয় বড় বাধা আকারে দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তিনি বলেন, মানসম্পন্ন শিক্ষার মাধ্যমে দক্ষ জনবল গড়ে তোলার বিষয়ে তেমন অগ্রগতি হয়নি, সুশাসন পরিস্থিতিও সবচেয়ে দুর্বল। মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, গণমাধ্যমের সম্পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদানের ক্ষেত্রে বেশি পরিবর্তন আসেনি, এ ক্ষেত্রে দুর্বলতা রয়ে গেছে। তবে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং পরিবেশের মান বজায় রাখতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক খাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। দেশের ৬০ শতাংশ ব্যবসায়ী মনে করে, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠিত হলে এ খাতে বিনিয়োগ বাড়বে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী ব্যবসায়ীরা বলেছে, বেশ কিছু কারণে বাংলাদেশ থেকে দেশের বাইরে টাকা পাচার হচ্ছে। এর মধ্যে প্রথম কারণ হলো রাজনৈতিক অস্থিরতা। এ ছাড়া রয়েছে ব্যবসায়িক পরিবেশের অভাব, দুর্নীতি, কালো টাকা, উচ্চ কর, দুর্বল শেয়ারবাজার, সহিংসতা এবং সরকারের নজরদারির অভাব। ব্যবসায়ীদের মতে, আগামী ১০ বছরে বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে উচ্চ জ্বালানি মূল্য। এ ছাড়া সুশাসন, অবকাঠামো, জলবায়ু পরিবর্তন, পরিকল্পিত নগরায়ণের অভাব এবং অভ্যন্তরীণ সহিংসতাকেও দায়ী করেছেন ব্যবসায়ীরা।

এবারের প্রতিবেদনে শীর্ষ ১০টি দেশের মধ্যে যথাক্রমে রয়েছে সুইজারল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, যুক্তরাষ্ট্র, নেদারল্যান্ডস, জার্মানি, সুইডেন, যুক্তরাজ্য, জাপান এবং ফিনল্যান্ড। এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তাইওয়ান ১৪তম অবস্থানে আছে। এ ছাড়া মালয়েশিয়া রয়েছে ২৫তম স্থানে। এরপর চীন ২৮, সৌদি আরব ২৯, থাইল্যান্ড ৩৪ এবং কুয়েত ৩৮তম। তবে এবার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে ভারতের। গত বছর দেশটির অবস্থান ছিল ৫৫। এবার ১৬ ধাপ এগিয়ে ৩৯তম স্থানে উঠে এসেছে। এ ছাড়া ইন্দোনেশিয়ার অবস্থান ৪১, রাশিয়া ৪২, ভিয়েতনাম ৬০, শ্রীলঙ্কা ৭১, ভুটান ৯৭, নেপাল ৯৮ এবং পাকিস্তান ১২৬ থেকে ১২২তম অবস্থানে উন্নীত হয়েছে।

প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে বেশ কিছু সুপারিশ করেছে সিপিডি। এর মধ্যে রয়েছে বিনিয়োগের জন্য ব্যবসায়ীদের আস্থা বাড়ানোর উদ্যোগ, সংবাদপত্রকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া, দুর্নীতি প্রতিরোধে সর্বোচ্চ রাজনৈতিক অঙ্গীকার এবং আর্থিক খাতসহ বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

জানা যায়, ১৯৭৯ সাল থেকে এ প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম। ২০০১ সালে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ হিসাবে বাংলাদেশের জন্য বুধবারের প্রতিবেদনটি ছিল ১৬তম। ২০১৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে সদস্য দেশগুলোর মোট ১৪ হাজার শীর্ষ উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মতামতের ভিত্তিতে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। তবে ব্যবসায়ীরা ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ের মধ্যে মতামত দিয়েছেন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের মোট ৮৯ জন ব্যবসায়ীর মতামত নেওয়া হয়েছে। আগের বছর এই সংখ্যা ছিল ৫৬ জন। এসব ব্যবসায়ীর মালিকানাধীন ব্যবসায়ীদের অবস্থান ঢাকা ও চট্টগ্রামে। প্রতিটি কম্পানির পরিশোধিত মূলধন ১০ কোটি টাকার ওপরে। ব্যবসায়ীদের সুনির্দিষ্ট একটি ফরমেটে ১২টি বিষয়ে প্রশ্ন করা হয়েছিল।


মন্তব্য