kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।

পাহাড়ে হতাশার গল্প

ফজলে এলাহী, রাঙামাটি   

২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পাহাড়ে হতাশার গল্প

রাঙামাটির অন্যতম আকর্ষণ ঝুলন্ত ব্রিজ পর্যটকদের চোখে এখন ডুবন্ত ব্রিজ। ছবি : কালের কণ্ঠ

প্রকৃতি উজাড় হাতেই সাজিয়েছে যে জেলাকে, তারই নাম রাঙামাটি। প্রায় ৭০০ বর্গকিলোমিটারের সুবিশাল কাপ্তাই হ্রদের নীল জলরাশি আর হ্রদের পাড়ের সবুজ পাহাড়ি উপত্যকা যে জেলাকে সারা দেশের চেয়ে একেবারেই ভিন্নতর করে সাজিয়েছে, সেই জেলাটিই হতে পারত দেশের পর্যটনের আইকন।

কিন্তু বাস্তবে অরণ্যসুন্দরী এই জেলায় পর্যটক আগে যেমন আসত, এখন আর তাও আসে না। পর্যটকদের জন্য নতুন কোনো স্পট বা সুবিধা গড়ে না ওঠায় রাঙামাটি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে মানুষ।

নিয়মিতই ডুবছে ঝুলন্ত সেতু : রাঙামাটি পর্যটন কমপ্লেক্সের ভেতরে অবস্থিত ৭০ মিটার আয়তনের ঝুলন্ত সেতুটি নির্মাণ করা হয় সেই আশির দশকে। কিন্তু গত এক দশক ধরে নিয়ম করেই পানিতে ডুবছে সেতুটি। বর্ষায় অন্তত মাসখানেক পানির নিচে পড়ে থাকা সেতুটি দেখে হতাশ হয়ে ফিরে যায় পর্যটকরা। কিন্তু এর সংস্কার কিংবা কিছুটা উপরে তোলার কোনো চেষ্টাই নেই।

বিড়ম্বনার নাম হ্রদ ভ্রমণ : রাঙামাটিতে আসা পর্যটকের বেড়ানো প্রধানতম আকর্ষণ কাপ্তাই হ্রদে নৌভ্রমণ। পর্যটকরা তবলছড়ি ও রিজার্ভবাজার থেকে ইঞ্জিনবোট ভাড়া করে সুভলং পর্যন্ত যায়। যাওয়া আর আসায় প্রায় তিন ঘণ্টা সময় লাগে। বছর কয়েক আগেও সুভলং ঝরনায় সারা বছর পানিপ্রবাহ থাকলেও ঝরনার উৎসমুখে সেচের পানির জন্য বাঁধ নির্মাণ, ঝরনার আশপাশের এলাকার গাছ উজাড় এবং কথিত উন্নয়নের কারণে প্রাকৃতিক অবয়ব নষ্ট হওয়ায় এখন শুধু বর্ষাকালেই পানি থাকে সুভলংয়ের দুটি ঝরনাতেই।

বেসরকারি উদ্যোগ আছে, পৃষ্ঠপোষকতা নেই : সরকারি উদ্যোগে একমাত্র পর্যটন কমপ্লেক্স ছাড়া আর যাই আছে সবই বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত। হ্রদের পাড়ের পেদাতিং তিং, টুকটুক ইকো ভিলেজ, গর্বা রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট সবই গড়ে উঠেছে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টাতেই। কিন্তু এসব স্থাপনার উদ্যোক্তারা আর্থিকভাবে কষ্ট পেলেও তাদের জন্য নেই কোনো ঋণের সুব্যবস্থা কিংবা পৃষ্ঠপোষকতা। বরং আছে নানান নির্দেশনা আর খবরদারি।

বনবিহার কর্তৃপক্ষের বাগড়া : পর্যটকদের কাছে একসময় সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থান ছিল রাজবনবিহার। আকর্ষণীয় ও নয়নাভিরাম নির্মাণশৌলীর কারণে বিখ্যাত এই বিহারেই মমি করে রাখা হয়েছে পার্বত্যাঞ্চলের বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় সাধুপুরুষ বনভন্তেকে। দেশে এটাই প্রথম কোনো মমি। গ্লাসের বক্সে রাখা এই ধর্মীয় গুরু মমি দেখতে প্রতিদিনই অসংখ্য পর্যটক সমবেত হতো বৌদ্ধ বিহারে। ভান্তেদের বিশ্রামের সময় বাদে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা এবং বিকেল ৩টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত উন্মুক্তই ছিল বিহার প্রাঙ্গণ। কিন্তু মাসকয়েক আগে হঠাৎ করেই বিহারে পর্যটক ও দর্শনার্থী প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করে বিহার কর্তৃপক্ষ।

সন্ধ্যা হলেই প্রাণহীন শহর : সারা দিন ইতিউতি ঘুরে বেড়ালেও সন্ধ্যা হতেই অস্বস্তি ঘিরে ধরে পর্যটকদের। সন্ধ্যার পর টেক্সটাইল মার্কেটে কিছু কেনাকাটা ছাড়া কিছুই করার নেই তাদের। নেই কোনো সান্ধ্যকালীন সাংস্কৃতিক আয়োজন। চাইলেই রাতে খেতে পারবেন না ভালো কোনো রেস্টুরেন্টে।

তবু আশাবাদ : সম্প্রতি বাঘাইছড়ি সবুজ উপত্যকা পার্বত্য মন্ত্রণালয় এবং পার্বত্য জেলা পরিষদগুলো পর্যটন নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে। কিছুদিন আগেই পার্বত্য মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে পাহাড়ের পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে সেমিনার হয়েছে, সেই সেমিনারের সুপারিশগুলো নিয়ে শুরু হয়েছে একটি মাস্টারপ্ল্যান এবং পাহাড়ের জন্য পৃথক পর্যটন নীতিমালা প্রণয়নের কাজ। রাঙামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের বৃষ কেতু চাকমা জানান, ‘আমরা ইতিমধ্যে প্রাথমিকভাবে ১০০ কোটি টাকার কাজ শুরুর পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। চলছে একটি মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নের কাজও। আশা করছি আমাদের কাজ শেষ হওয়ার পর রাঙামাটির পর্যটন শিল্প নিয়ে যে হতাশা সেটা কেটে যাবে।


মন্তব্য