kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্যাংকার ও গবেষকদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে বক্তারা

পরিবর্তনশীল ব্যাংক খাতে গবেষণা বাড়াতে হবে

নিজস্ব প্রতিবেদক   

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পরিবর্তনশীল ব্যাংক খাতে গবেষণা বাড়াতে হবে

দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা এখন অতিমাত্রায় জ্ঞানভিত্তিক। এর কার্যক্রমেও বেশ গতি এসেছে।

ব্যাংকগুলোও এখন গ্রাহকের চাহিদামাফিক বৈচিত্র্যময় আর্থিক সেবা দিচ্ছে। ফলে ব্যাংকিং ঝুঁকির প্রকৃতি ও মাত্রা প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে। সদা পরিবর্তনশীল এই পরিস্থিতির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হলে ব্যাংকগুলোকে অবশ্যই গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। গবেষণার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির।

গতকাল রবিবার রাজধানীর মিরপুরে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্ট (বিআইবিএম) মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকার ও গবেষকদের জন্য আন্তর্জাতিক সম্মেলন ২০১৬’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানের উদ্বোধনী অধিবেশনে গভর্নর এসব কথা বলেন।

অস্ট্রেলিয়ান একাডেমি অব বিজনেস অ্যান্ড সোশ্যাল সায়েন্সের সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে এবং যুক্তরাষ্ট্রের টেনিসি স্টেট ইউনিভার্সিটি, অস্ট্রেলিয়ান ইউনিভার্সিটি অব সাউথ অস্ট্রেলিয়া এবং সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় বিআইবিএম দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলনের আয়োজন করেছে।

অনুষ্ঠানে গভর্নর বলেন, এই সম্মেলনে অংশ নেওয়া গবেষক ও শিক্ষাবিদদের দেওয়া মতামত ও পরামর্শ এবং এখান থেকে পাওয়া গবেষণালব্ধ ফলাফল ব্যাংক খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কার্যকর নীতিনির্ধারণের খোরাক জোগাবে।

ফজলে কবির আরো বলেন, দেশের ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে উচ্চতর নজরদারির পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ায় আনতে বেশ কিছু সুদূরপ্রসারী সংস্কার এনেছে। খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির ঘটনা কমিয়ে আনার জন্য ব্যাংকের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার কাজটি নিবিড় তদারকির মধ্যে রেখেছে। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন বলেন, খেলাপি হওয়ার সংস্কৃতি, পর্যাপ্ত জবাবদিহি না থাকা ও কাঙ্ক্ষিত স্বচ্ছতার অভাব স্বত্ত্বেও সম্প্রসারণশীল ব্যাংক খাত এ দেশের অর্থনীতির উন্নয়নে ভালোই অবদান রেখে চলেছে।

মূল প্রবন্ধে ড. ফরাসউদ্দিন ২০০৭ থেকে ২০০৯ সালে ঘটে যাওয়া বিশ্বমন্দার সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিবাচক দিকগুলো তুলে ধরেন এবং এর কারণগুলো নিয়ে আলোচনা করেন। তিনি জানান, ওই দুটি অর্থবছরে বাংলাদেশের জনশক্তি ও তৈরি পোশাক রপ্তানি বেশ খানিকটা বেড়েছিল, যা পরবর্তী সময়ে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স ও বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ বাড়াতে সহায়তা করেছে। তা ছাড়া আমদানি ব্যয় কমে আসায় রপ্তানিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব ছিল। কৃষির উৎপাদন বৃদ্ধির ফলে দেশে কর্মসংস্থানও তখন বেড়েছিল। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার উদ্যোগও তখন নেওয়া হয়েছিল। ফলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্য কমে আসে এবং দাপ্তরিক কাজে গতি বৃদ্ধি পায়। যা সামগ্রিক উৎপাদনশীলতা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তরান্বিত করতে সহায়তা করে।

বিআইবিএমের মহাপরিচালক ড. তৌফিক আহমদ চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে ব্যাংকিং খাতের সবচেয়ে সমালোচিত ইস্যুগুলো হলো খেলাপি ঋণ ব্যবস্থাপনা, সুশাসন ও অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতা, অলস তারল্য ও বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবাহের ধীরগতি। এ সমস্যাগুলো সমাধান করতে হলে এমনভাবে গবেষণা করতে হবে, যার ফল একচুলও এদিক-ওদিক হবে না।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন বিআইবিএমের পরিচালক অধ্যাপক ড. প্রশান্ত কুমার ব্যানার্জী। গতকাল রবিবার ও আজ সোমবার প্রথম দিনে মোট ৬৫টি গবেষণাপত্র সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে উপস্থাপন করার কথা রয়েছে। আলোচনায় খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, সবাই বলে শেয়ারবাজারের ওপর মানুষের আস্থা নেই, এটা ঠিক বলা যেতে পারে। তবে আস্থার জন্য শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ন্ত্রক সংস্থার ভাবমূর্তি কেমন এটাও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কিছু সদস্য নিজেরাই শেয়ারবাজারে ব্যবসা করেছেন। এ ধরনের লোকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। তাঁর মতে, বিএসইসি পুনর্গঠন ও পূর্ণাঙ্গ ডিমিউচুয়ালাইজেশনই পারে শেয়ারবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে।  ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘শেয়ারবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা পুনর্গঠন করে ভালো লোকদের দায়িত্ব দিলে আস্থা ফিরতে পারে। সেটা এখনো হয়ে ওঠেনি। এ ছাড়া ডিমিউচুয়ালাইজেশন যা করা হয়েছে তা সঠিকভাবে হয়নি। ৬০ শতাংশ হয়েছে, ৪০ শতাংশ হয়নি। তবে ভারত সঠিকভাবে ডিমিউচুয়ালাইজেশন করতে পেরেছে। কিভাবে করেছে এ গল্প আমি অর্থমন্ত্রীকে একাধিকবার শুনিয়েছি। তাও কিছু হয়নি। ভারত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েছে, বাংলাদেশ পারেনি। ’

মুক্ত আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ও বিএসইসির সাবেক সদস্য ইয়াসিন আলী বলেন, শেয়ারবাজার থেকে টাকা তুলতে গিয়ে না পাওয়ার নজির অন্য দেশে থাকলেও বাংলাদেশে নেই। এর পরও এখানকার উদ্যোক্তারা পুঁজিবাজারের তুলনায় ব্যাংক থেকে টাকা নিতে বেশি আগ্রহ দেখায়। আইডিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরিফ খান বলেন, মিউচুয়াল ফান্ডের উন্নতি করতে হলে তহবিল ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা বাড়তে হবে। বিনিয়োগকারীর টাকা কোন খাতে ব্যয় হচ্ছে তার তথ্য প্রকাশ করতে হবে।

ব্যাংকিং বিষয়ক অন্য এক অধিবেশনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর এস কে সুর চৌধুরী বলেন, খেলাপি ঋণের উচ্চ হারের ফলে বেশি করে প্রভিশন রাখা, সঞ্চয়পত্রের উচ্চ মুনাফা, ব্যাংকগুলোর আমানতের একটি অংশ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে জমা রাখা (সিআরআর) এবং ব্যাংক কর্মকর্তাদের অতি মুনাফার মনোভাবের কারণে আশানুরূপ হারে ব্যাংকঋণের সুদের হার কমানো যাচ্ছে না।


মন্তব্য