kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চামড়াপাচারে জড়িত ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট

ফারজানা লাবনী   

২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



চামড়াপাচারে জড়িত ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট

কিছু ট্যানারি মালিক সিন্ডিকেট করে বিভিন্ন এলাকা থেকে চামড়া কিনে ট্যানারিতে না এনে স্থলবন্দর ও এর আশপাশের এলাকা দিয়ে ভারতে পাচার করে দিচ্ছে। লোকসান এড়িয়ে মুনাফা করতে মৌসুমি চামড়া সংগ্রহকারীদের অনেকে এসব চামড়া পাচারকারীর সঙ্গে যোগ দিয়েছে।

ভারতে দীর্ঘদিন গরু জবাই বন্ধ থাকায় সেখানকার ট্যানারিতে কাঁচামালের ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়েছে। ভারতের ট্যানারির মালিকরা কারখানা সচল রাখতে পাচারকৃত চামড়া উচ্চমূল্যে কিনছে। দেশ থেকে অবৈধ পথে কোরবানির পশুর চামড়া পাচার করে কিছু ব্যক্তি বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিলেও দেশের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন স্থলবন্দরের কাছের এলাকা দিয়ে পাচারকালে ঈদের দিন থেকে গত ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫১টি ট্রাক কোরবানির পশুর চামড়াসহ আটক করা সম্ভব হয়েছে।

গত বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো প্রতিবেদনে সদ্য শেষ হওয়া ঈদে কোরবানি হওয়া পশুর চামড়া পাচার সম্পর্কে এসব কথা উল্লেখ আছে। শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকে এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে পাঠানো তথ্য নিয়ে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর গরু জবাই নিষিদ্ধ করে। এতে ভারতের ট্যানারিগুলোতে কাঁচা চামড়ার ভয়াবহ সংকট তৈরি হয়। ভারতে কাঁচা চামড়ার চাহিদা সামনে রেখে পরিকল্পনা করে এবারে কোরবানির পশুর চামড়ার দাম কমিয়ে দেয় বাংলাদেশের ট্যানারির মালিকদের সিন্ডিকেট।

তাদের সদস্য হাজারীবাগের কিছু ট্যানারির মালিকের চামড়া পাচারে জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। শাস্তির আওতায় আরো তথ্য-প্রমাণ জোগাতে শুল্ক গোয়েন্দা ও সরকারের অন্যান্য সংস্থা কাজ করছে। প্রাথমিক অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে কিছু ট্যানারির মালিকের গত ছয় মাসের লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য খতিয়ে দেখছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি)।

বাংলাদেশ থেকে চামড়া পাচারে ট্যানারির মালিকদের জড়িত থাকার বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ট্যানারস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্যানারির মালিকদের বিভিন্ন অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে আমরা খবর পেয়েছি এবারে কিছু অসাধু ট্যানারির মালিক বেশি লাভের আশায় বাংলাদেশ থেকে ভারতের ব্যবসায়ীদের কাছে চোরাই পথে কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা করছে। চামড়া পাচারকারী ট্যানারির মালিকদের কারণে প্রকৃত ব্যবসায়ীদের সুনাম ক্ষুণ হচ্ছে। এই পাচারকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন এই ব্যবসায়ী নেতা। ’

শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মইনুল খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারতে উচ্চ মূল্যে বাংলাদেশের কোরবানির পশুর চামড়া বিক্রি হচ্ছে। এ দেশের কিছু ট্যানারি মালিক এবার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে দেশের বাজারে কোরবানির পশুর দাম কমানো এবং ভারতে চামড়া পাচারে জড়িত। স্থলবন্দরের আশপাশের এলাকা থেকে চামড়া পাচারকালে ১৩ থেকে ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫১টি ট্রাক কোরবানির পশুর চামড়াসহ আটক করা সম্ভব হয়েছে। এর বাইরেও চামড়া পাচার হচ্ছে। শুল্ক গোয়েন্দাদের নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি চামড়া পাচারকারী ট্যানারির মালিকদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে। চামড়া পাচারে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জড়িত কি না তাও তদন্ত করা হচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেনাপোল, সোনামসজিদ, আখাউড়া, হিলি স্থলবন্দরের আশপাশের এলাকা দিয়ে বেশি চামড়া পাচার হচ্ছে। কোরবানির পশুর চামড়া কেনাবেচার লেনদেন ব্যাংকিং চ্যানেল এড়িয়ে হুন্ডিতে হচ্ছে। ঈদের দিন থেকেই বাংলাদেশ থেকে কোরবানির পশুর চামড়া পাচার হচ্ছে। ভারতের ট্যানারির মালিকরা প্রতিনিধি পাঠিয়ে বাংলাদেশের ট্যানারির মালিকদের সঙ্গে দামের বিষয়ে সমঝোতায় আসছে। আলোচনায় চোরাই চামড়ার দাম, কিভাবে পণ্য পৌঁছাবে, একটি চালানে কী পরিমাণ পণ্য যাবে, কে বা কারা তা গ্রহণ করবে তা নির্ধারণ করছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে স্থলবন্দর ও আশপাশের এলাকা পর্যন্ত কাঁচা চামড়া পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব থাকছে চামড়া পাচারকারী বাংলাদেশের ট্যানারি মালিকদের। যে এলাকা থেকে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করা হয় সেই এলাকার মৌসুমি চামড়া ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা নেওয়া হয় চামড়া পৌঁছে দেওয়ার কাজে। লাভের অর্থ ট্যানারির মালিক ও মৌসুমি চামড়া সংগ্রহকারী উভয় পক্ষ সমঝোতায় ভাগ করে নেয়। তবে ক্ষেত্রবিশেষে সীমান্ত এলাকার কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার পর ভারতের ট্যানারির মালিকরা নিজস্ব এজেন্টের মাধ্যমে চোরাই পথে চামড়া নিয়ে যাচ্ছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্যবারের মতো এবারও সীমান্ত এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি ছিল। ঈদ সামনে রেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর থেকেও নজরদারি বাড়ানো হয়। ঈদের দিন থেকে আগামী ২৯ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভারত- বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকার বিভিন্ন বন্দর ও এর আশপাশে শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত গোয়েন্দা কর্মকর্তা মোতায়েন করা হয়।


মন্তব্য