kalerkantho

শুক্রবার । ৯ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৮ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দেউলিয়া হ্যানজিন শিপিং

মাসুল গুনছে দেশি রপ্তানিকারকরা

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

২২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



মাসুল গুনছে দেশি রপ্তানিকারকরা

বিদেশি শিপিং কম্পানি হ্যানজিন দেউলিয়া হয়ে যাওয়ার মাসুল গুনছেন বাংলাদেশি আমদানি ও রপ্তানিকারকরা। বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে বিভিন্ন দেশে এই কম্পানির জাহাজ ও কনটেইনারে পণ্য পরিবহন করতে গিয়ে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তাঁরা।

একই সঙ্গে নির্দিষ্ট গন্তব্যে নির্ধারিত সময়ে পণ্য পৌঁছাতে না পেরে অর্ডার বাতিলের ঝুঁকিও রয়েছে তাঁদের।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুব আনাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এসব কনটেইনারে থাকা পণ্যের বিদেশি ক্রেতারা এখন পর্যন্ত অর্ডার বাতিল করেছে বলে আমার জানা নেই। তবে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে যদি সেগুলো চট্টগ্রাম থেকে জাহাজীকরণ সম্ভব না হয় তাহলে বাতিলের যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ গত ২০ দিনেও জাহাজীকরণ সম্ভব হয়নি। অথচ এ সময়ের মধ্যে পণ্যগুলো বিদেশি ক্রেতার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল। ’ তিনি বলেন, ‘আমাদের উচিত, পণ্যগুলো জাহাজীকরণে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া। ’

জানা গেছে, গত ৩১ আগস্ট চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অন্য একটি কম্পানির জাহাজে ৭৩ একক রপ্তানি পণ্যভর্তি কনটেইনার শ্রীলঙ্কার কলম্বো বন্দরে পৌঁছে। পোশাকশিল্পের পণ্যভর্তি কনটেইনারগুলো জাহাজ থেকে নামিয়ে বড় জাহাজে (মাদার ভেসেল) করে ইউরোপ ও আমেরিকার নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছানোর কথা ছিল। এরই মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়ার শিপিং কম্পানি হ্যানজিন দেউলিয়া হওয়ার খবরে কনটেইনারগুলো শ্রীলঙ্কায় নামাতে না দিয়ে ফের চট্টগ্রামে ফেরত পাঠায় শ্রীলঙ্কা বন্দর কর্তৃপক্ষ। এরপর গত ১২ সেপ্টেম্বর জাহাজ থেকে কনটেইনারগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে নামিয়ে বন্দর কর্তৃপক্ষের জিম্মায় রাখা হয়। ৩১ আগস্ট থেকে গতকাল ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কনটেইনারগুলো নির্ধারিত গন্তব্যে যাত্রাই শুরু করতে পারেনি।

তবে সুখের বিষয়, কাস্টম কর্তৃপক্ষ গত ১৯ সেপ্টেম্বর কনটেইনারগুলো আবার রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। এর পরও কনটেইনারগুলো ফের জাহাজীকরণ করতে আরো অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। এ অবস্থায় এক মাস ধরে এত পণ্য রপ্তানির জন্য ঘুরপাক খাওয়ার সব মাসুল রপ্তানিকারকদের পরিশোধ করতে হবে।

শিপিং লাইনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, হ্যানজিন শিপিং কম্পানি চট্টগ্রাম থেকে কলম্বো বন্দরে আসা-যাওয়া বাবদ প্রতি ২০ ফুট কনটেইনার পণ্য পরিবহন মাসুল আদায় করেছে ৪১৪ ইউএস ডলার। অর্থাৎ বাংলাদেশি ৩৩ হাজার টাকা। সে হিসাবে ৭৩ একক কনটেইনার পরিবহনে মাসুল আসে প্রায় ২৫ লাখ টাকা। এই মাসুল জোর করে আদায় করেই কনটেইনারগুলো রপ্তানিকারকদের ফেরত দিচ্ছে হ্যানজিন কম্পানির দেশীয় প্রতিনিধি।

রপ্তানিকারকদের অভিযোগ, হ্যানজিন দেউলিয়া হওয়ার জন্য দোষী আমরা নই, তাহলে কেন আমাদের ওপর দায় চাপানো হবে? চট্টগ্রাম-কলম্বো রুটের আসা এবং যাওয়ার দুটোর মাসুল আদায় করা হচ্ছে জোর করে নির্ধারিত সময়ে পণ্য তো পৌঁছেনি, উল্টো ফেরত আসার মাসুল আদায় অনৈতিক।

এ বিষয়ে হ্যানজিন শিপিংয়ের দেশীয় প্রতিনিধি এইচ আর সি শিপিং বাংলাদেশের ম্যানেজার (অপারেশন) জয়নাল আবেদিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কনটেইনারগুলো ফেরত আনার মাসুল আমাদের অ্যাকাউন্টে জমার পর আমরা ছাড়পত্র দিচ্ছি। কারণ হ্যানজিন দেউলিয়া হয়েছে কিন্তু আমার এজেন্ট তো আর দেউলিয়া হয়নি। আমরা দেশের স্বার্থে নিজেদের জিম্মায় নিয়ে কনটেইনারগুলো কলম্বো থেকে ফেরত এনেছি। ফলে পরিবহনের এই মাসুল তো আমি নিজের পকেট থেকে দেব না। ’ তিনি স্বীকার করে বলেন, কিছু সিঅ্যান্ডএফ না বুঝে এসব অভিযোগ করছে।

জানা গেছে, কনটেইনার থেকে পণ্যগুলো অন্য কম্পানির কনটেইনারে স্থানান্তর, জাহাজীকরণ এবং পণ্য পরিবহন করে আবারও কলম্বো বা সিঙ্গাপুরে নিতে আরো প্রচুর টাকা গুনতে হবে। এর পুরোটাই পরিশোধ করতে হবে রপ্তানিকারকদের। আর কনটেইনারগুলো ফের জাহাজীকরণ করতে গত সোমবার কাস্টম কর্তৃপক্ষ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডারদের সঙ্গে বসে অনুমোদন দিয়েছে।

চট্টগ্রাম কাস্টমসের অতিরিক্ত কমিশনার শওকত আলী সাদিকে ফোন করলেও তিনি সাড়া না দেওয়ায় বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। তবে বৈঠকে উপস্থিত থাকা বাংলাদেশ ফ্রেইট ফরোয়ার্ডার অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক (বন্দর ও কাস্টমস) খায়রুল আলম সুজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘কাস্টম কর্তৃপক্ষ এই কনটেইনারগুলো অন্য কোনো শিপিং লাইনের মাধ্যমে বিদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে পণ্যগুলো ফের রপ্তানিতে আর কোনো জটিলতা থাকল না। ইতিমধ্যে বেশ কজন আবেদন করেছেন। ’

জানা গেছে, এর আগে গত ২ সেপ্টেম্বর হ্যানজিন শিপিং কম্পানির দুটি জাহাজ পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে আসার পর সেগুলো আটক করে রাখে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরে আমদানিকারকদের স্বার্থে জাহাজ থেকে পণ্যগুলো নামিয়ে রাখলেও সেই দুই জাহাজ ‘হ্যানজিন হোচিমিন’ ও ‘এফএসএল ইউরোপা’কে আর যেতে দেওয়া হয়নি। এখন জাহাজ দুটি বহির্নোঙরে আটক রয়েছে। সেই দুটি জাহাজে বিপুল পরিমাণ পোশাকশিল্পের কাঁচামাল ছাড়াও অন্যান্য পণ্য ছিল। নির্দিষ্ট সময়ে পণ্য না পাওয়ার তারা সবাই বিপাকে পড়েছে।

জানতে চাইলে ইস্টার্ন অ্যাপারেলসের কর্ণধার ও বিজিএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ওখানে আমার একটি কনটেইনার পণ্য ছিল। ৩০ দিন দেরিতে আমি শেষ পর্যন্ত পণ্যগুলো পেয়েছি। যখন পেয়েছি তখন সেগুলোর প্রয়োজন আমার ফুরিয়ে গেছে। যথাসময়ে না আসায় আমার উৎপাদনে ক্ষতি হয়েছে। ’

উল্লেখ্য, দক্ষিণ কোরিয়ার শিপিং কম্পানি হ্যানজিন সেপ্টেম্বরের শুরুতে আদালতে দেউলিয়াত্বের আবেদন করার পর বিশ্বজুড়ে প্রায় ৫০ হাজার একক পণ্যবাহী কনটেইনার এবং কয়েক ডজন জাহাজ সমুদ্রে ভাসছে। জাহাজ নোঙর করার মাসুল, কনটেইনার পরিবহনের খরচ ও পণ্য খালাসের ব্যয়ভার কে বহন করবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তাই এর প্রধান কারণ। ধারণা করা হচ্ছে, আটকে থাকা এসব কনটেইনারে এক হাজার ৪০০ কোটি ডলার মূল্যমানের পণ্য রয়েছে।


মন্তব্য