kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পুঁজিবাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিতে শুভংকরের ফাঁকি!

রফিকুল ইসলাম   

২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পুঁজিবাজারে নতুন প্রতিষ্ঠানের অন্তর্ভুক্তিতে শুভংকরের ফাঁকি!

মার্চেন্ট ব্যাংকের চেষ্টায় প্রতিবছর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হচ্ছে ১০-১২টি কম্পানি। তালিকাভুক্তির আগে কম্পানির আর্থিক হিসাব ও সম্পদের চুলচেরা বিশ্লেষণ করা হলেও তালিকাভুক্তির পরই আয় কমতে শুরু করে।

ফলে কম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ভালো দেখে বিনিয়োগকারীরা শেয়ার কিনে প্রতারিত হয়। তালিকাভুক্তির আগে বছর বছর আয় বাড়লেও তালিকাভুক্তির পর কেন কমছে, সেই বিষয় খতিয়ে দেখছে না পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থাও।

এ কারণে মার্চেন্ট ব্যাংকের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। মূলত মার্চেন্ট ব্যাংকের তথ্যের ভিত্তিতেই কম্পানিগুলো প্রাথমিক গণপ্রস্তাব (আইপিও) প্রক্রিয়ায় অর্থ উত্তোলনের অনুমতি পায়। মার্চেন্ট ব্যাংকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন অডিটর থেকে উত্থাপনের পরই মার্চেন্ট ব্যাংক সেই তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে। এরপর কোনো ফাঁক-ফোকর পেলে সেটি সংশোধন কিংবা পুনর্মূল্যায়ন করে। সে ক্ষেত্রে অডিটরের তথ্যের ভিত্তিতেই মার্চেন্ট ব্যাংককে কাজ করতে হয়। তবে মার্চেন্ট ব্যাংক কম্পানির তথ্যের চুলচেরা বিশ্লেষণ করেই নতুন কম্পানি বাজারে আনে।

তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১২ সালে তালিকাভুক্ত প্রায় ৯০ শতাংশ কম্পানির শেয়ার ইস্যু মূল্যের নিচে। আর শতভাগ কম্পানির আয় তালিকাভুক্তির আগের চেয়ে পরবর্তীতে ধারাবাহিকভাবেই কমেছে। আয় যেহেতু কমেছে, কাজেই কম্পানির লভ্যাংশও কম দিয়েছে। শেয়ার দাম ইস্যু মূল্যের নিচে আসায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিনিয়োগকারী। যদিও কম্পানিগুলো পুঁজিবাজার থেকে অর্থ তুলে ব্যবসায়িক প্রসার করবে এমন আশা দিয়েই বাজারে আসে। বড় আওয়াজে বাজারে আসে কিন্তু তালিকাভুক্ত হলেই ঝিমিয়ে যায় কম্পানিগুলো।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) সূত্রে জানা যায়, ২০১২ সালে ৯টি কম্পানি, একটি ইনস্যুরেন্স ও চারটি মিউচ্যুয়াল ফান্ড পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়েছে। মাত্র একটি ছাড়া সব কম্পানির শেয়ার দাম ইস্যু মূল্যের নিচে। আর প্রতিটি কম্পানির আয় তালিকাভুক্তির পর ধারাবাহিকভাবেই কমেছে।

কম্পানিগুলো হলো এনভয় টেক্সটাইল, জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন, আমরা টেকনোলজি, ইউনিক হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টস, সায়হাম কটন, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল কম্পানি, জিবিবি পাওয়ার, জিপিএইচ ইস্পাত ও জিএসপি ফাইন্যান্স কম্পানি (বাংলাদেশ)। মিউচ্যুয়াল ফান্ডগুলো হলো ফার্স্ট বাংলাদেশ ফিক্সড ইনকাম ফান্ড, এনএলআই মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড ও এনসিসি মিউচ্যুয়াল ফান্ড। ইনস্যুরেন্স কম্পানি হলো পদ্মা ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স।

কম্পানিগুলোর তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, তালিকাভুক্তির আগে কোনো বছরই কম্পানির লোকসান হয়নি। বছর শেষে শেয়ারপ্রতি আয় ও সম্পদমূল্য বেড়েছে। কিন্তু বাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে অভিহিত মূল্য, প্রিমিয়ামসহ লেনদেন শুরু হওয়া কম্পানির শেয়ার দাম শুরুতে ঊর্ধ্বমুখী থাকলেও পরবর্তী সময়ে ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। যেমন—শতভাগ রপ্তানিমুখী জেনারেশন নেক্সট ফ্যাশন ২০১২ সালের ১৫ নভেম্বর পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়। কোনো প্রিমিয়ার ছাড়ায় অভিহিত মূল্য ১০ টাকায় শেয়ার লেনদেন শুরু হয়। ২০১১ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ২.০৯ ও সম্পদমূল্য ছিল ২২.৬৪ টাকা। বর্তমানে কম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৬.৮০ টাকায়। তালিকাভুক্তির পর ২০১২, ২০১৩ ও ২০১৪ সালে যথাক্রমে শেয়ারপ্রতি আয় ২.০১, ২.১৫ ও ১.৫৪ টাকা এবং সম্পদমূল্যও যথাক্রমে ১৮.১৮, ১৭.৩০ ও ১৪.০৪ টাকা।

২০১২ সালের ৩ ডিসেম্বর ডিসএসই তালিকাভুক্ত হয়ে ৯ ডিসেম্বর লেনদেন শুরু হয় এনভয় টেক্সটাইলের শেয়ারের। ১০ টাকা ফেসভ্যালু ও ২০ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে ৩০ কোটি শেয়ার বাজারে ছাড়ে। ২০১১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত, অর্থাৎ পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত শেয়ারপ্রতি আয় ছিল ৪.৪২ টাকা ও সম্পদ (রি-ইভালুয়েশন) ৩৭.৬২ টাকা। ২০১৫ সালে ইপিএস দাঁড়িয়েছে ৩.৯৪। ২০১৪ ২.২১, ২০১৩ ৩.১৩, ২০১২ ৪.২৪। বর্তমানে ৩৮.৬০ টাকায় শেয়ার লেনদেন হচ্ছে।

আমরা টেকনোলজি অভিহিত মূল্য ১০ ও ১৪ টাকা প্রিমিয়াম নিয়ে ২০১২, ১৪ জুলাই তালিকাভুক্ত হয়। ২০১২ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত শেয়ারপ্রাতি আয় ২.২৪ ও সম্পদমূল্য ২৭.৬৩ টাকা। বর্তমানের শেয়ার দাম ২৩.১০ টাকা। ২০১৫ সালে শেয়ারপ্রতি আয় ১.৬৫ ও সম্পদ ২১.৬২ টাকা। তালিকাভুক্তির পর থেকে ২০১৩ ও ২০১৪ সালে ইপিএসই যথাক্রমে ১.৪৬ ও ১.৫২ টাকা।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ছায়েদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রকৃতপক্ষে কিছু কম্পানি ইস্যু মূল্যের নিচে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা রয়েছে। কোন কম্পানির বর্তমান তথ্যের ভিত্তিতে ইস্যু ঠিক করা হয়। ভবিষ্যতে সেই কম্পানির ব্যবসার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটি অনুমান করা কঠিন। সেই অবস্থা থেকেই হয়তো কম্পানির আয় কমে। ’ তিনি বলেন, কম্পানি, ‘অডিটর ও মার্চেন্ট ব্যাংক প্রত্যেকেরই উচিত সঠিক তথ্য দিয়ে কম্পানিকে বাজারে নিয়ে আসা। যেন কোনো কম্পানির শেয়ার অতি মূল্যায়িত না হয়। সর্বোপরি বিনিয়োগকারীকে সচেতন হতে হবে। কারণ কোন কম্পানির শেয়ার কিনছি, সেই বিষয়টি মাথায় রাখতে হবে। আর মার্চেন্ট ব্যাংকের উচিত তথ্যগুলোকে সতর্কতার সঙ্গে বিশ্লেষণ করা। ‘

পুঁজিবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, আইপিওপূর্ব আর্থিক অবস্থা এক রকম ও তালিকাভুক্তির পর অন্য রকম হওয়ার পেছনে দায়ী মূলত পুঁজিবাজারে কম্পানিকে আনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে ইস্যু ম্যানেজার ও মার্চেন্ট ব্যাংকগুলো। যথাযথভাবে কম্পানির তথ্য যাচাই-বাছাই করে না। কম্পানিগুলো বিনিয়োগকারীদের ধোঁকা দিলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা কানে নেয় না। বিশেষ করে বছরের পর বছর কম্পানির আর্থিক অবস্থা খারাপ হলেও চুপ করে থাকে। এ ক্ষেত্রে এসইসি মার্চেন্ট ব্যাংকগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে। কেন এ ধরনের কম্পানি বাজারে আনছে আর অডিট প্রতিষ্ঠানকেও ব্ল্যাক লিস্টেড করতে পারে কিন্তু করে না। এ ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা আনা প্রয়োজন।


মন্তব্য