kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সিঙ্গুরের কৃষকরা জমি ফিরে পেল

টাটাকে গাড়ি কারখানা করার প্রস্তাব মমতার

সুব্রত আচার্য্য, কলকাতা   

১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



টাটাকে গাড়ি কারখানা করার প্রস্তাব মমতার

টাটা কর্তৃপক্ষকে এবার গাড়ি কারখানা গড়ার প্রস্তাব দিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী তৃণমূল সভানেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার সিঙ্গুরে এক অনুষ্ঠানে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘রাজ্য সরকারের কাছে এক হাজার একর জমি আছে।

আমি এক মাস সময় দিচ্ছি, টাটাবাবু হোক কিংবা বিএমডাব্লিউ হোক, ইচ্ছা থাকলে আপনারা অটোমোবাইল কারখানাও গড়তে পারেন। ’

বুধবার বিকেলে টাটাদের কাছে দেওয়া সিঙ্গুরের অধিগৃহীত ৯৯৭ একর জমির মধ্যে অনিচ্ছুক কৃষকদের হাতে জমি ফিরিয়ে দেওয়ার সরকারি অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে মমতার এই ঘোষণায় নতুন করে শিল্পমহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

২০০৬ সালের মে মাস থেকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আন্দোলনের কারণে সিঙ্গুর থেকে ভারতের অন্যতম বৃহত্তম শিল্প গোষ্ঠী টাটা বিশ্বের সবচেয়ে কমদামি গাড়ি ন্যানোর কারখানা বন্ধ করে গুজরাটে যেতে বাধ্য হয়।

ঠিক ১০ বছর পর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় গাড়ি কারখানার জন্য তাড়িয়ে দেওয়া টাটা গোষ্ঠীকেই আবার রাজ্যে এক হাজার একর জমি দেওয়ার প্রস্তাব শুধু করেননি, বরং তৃণমূলের রাজ্য সরকার তাদের সব ধরনের সহযোগিতা করবে বলে মমতা এদিন আশ্বাস দিয়েছেন।

কলকাতার অদূরে হুগলি জেলার সিঙ্গুর এলাকা থেকে বামফ্রন্ট সরকার দুই থেকে চার ফসলি ৯৯৭ একর জমি অধিগ্রহণ করে টাটাদের ন্যানো কারখানা গড়ার জন্য দিয়েছিল। ২০০৪ সালে শিল্পবন্ধু হিসেবে তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সরকার ক্ষমতায় বসার পরই টাটাদের জমি দেওয়ার ঘোষণা করেছিলেন।

২০০৬ সাল থেকেই তৃণমূল সেখানে জোর করে জমি নেওয়ার আন্দোলন শুরু করে এবং ২০০৮ সালের ৩ অক্টোবর টাটার তত্কালীন কর্ণধার রতন টাটা ঘোষণা দিয়ে ওই কারখানা ছেড়ে গুজরাটে ন্যানো কারখানা গড়েন। ওই সময় রতন টাটা বলেছিলেন, ‘পুলিশ পাহারায় কারখানা চালানো সম্ভব নয়। ’

সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের জেরে দেশ-বিদেশে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ২০০৮ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচন এবং সেই বছর লোকসভা নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য হারে তৃণমূল প্রার্থীরা জয় পেতে শুরু করেন। সেই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালে ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট সরকারকেই নির্বাচনে হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গের শাসনভার গ্রহণ করে তৃণমূল কংগ্রেস।

২০১১ সালে মমতা ক্ষমতায় আসার পর টাটাদের দেওয়া জমি রাজ্য সরকার নতুন করে অধিগ্রহণ করে এবং সেই জমি অনিচ্ছুক কৃষকদের মধ্যে ফিরিয়ে দেওয়ার আইন পাস করে। তৃণমূল সরকারের গড়া সেই আইন ‘অবৈধ’ বলে দাবি করে হাইকোর্টে বামপন্থী কয়েকজন আইনজীবী মামলা করেন। হাইকোর্ট থেকে মামলা গড়ায় সুপ্রিম কোর্টে।

এ বছরের ৩১ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট বামফ্রন্ট সরকারের সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহণকে অবৈধ হিসেবে আখ্যা দিয়ে ১০ সপ্তাহের মধ্যে অনিচ্ছুক কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন। সেই নির্দেশ শুনেই গত দুই সপ্তাহে সিঙ্গুরের জমির মাপঝোক করে ৯ হাজার ১১৭ জন কৃষককে সেই জমি ফিরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বুধবার বিকেলে সিঙ্গুরের টাটা গেটের সামনেই বিরাট মঞ্চে দাঁড়িয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কৃষকদের জমি ফেরতের কাগজ হস্তান্তর করেন এবং ক্ষতিপূরণের চেকই শুধু দেননি, তিনি ঘোষণা করেছেন যত দিন পর্যন্ত ওই জমি থেকে ফসল ঘরে না উঠবে তত দিন পর্যন্ত প্রতি মাসে কৃষকরা দুই হাজার টাকা করে যেমন পেত তাই পাবে এবং দুই টাকা কেজিতে চাল-গম পাবে। আর কৃষিকাজ করতে যত ধরনের সাহায্য প্রয়োজন, রাজ্য সরকার সব রকম সাহায্য করবে।

ওই অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, ‘কৃষি ও শিল্প ভাইবোন। কৃষি যেমন প্রয়োজন, তেমনি শিল্পও প্রয়োজন। কেননা নতুন প্রজন্মকে চাকরি দিতে হবে। তেমন সবুজও বাঁচাতে হবে আমাদের বাঁচাতে হলে। ’

২০০৬ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর থেকে সিঙ্গুরের জমি আন্দোলনের সূচনা হয়েছিল বলে দাবি করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, ‘একজনের জমির ক্ষতিপূরণের চেক অন্যজনের কাছে দেওয়া হচ্ছিল, এ কথা শুনে সিঙ্গুরের বিডিও অফিস ঘেরাও করেছিলাম। কিন্তু সেখানে পুলিশ গিয়ে লাইট নিভিয়ে আমাকে গাড়িতে তুলে অত্যাচার করেছিল। সেদিন গভীর রাতে ডাক্তার সুদর্শন ঘোষ দস্তিতারের চেম্বারে গিয়ে চিকিৎসা করিয়ে বেঁচেছিলাম। সেদিন আমার ব্লাডপ্রেশার হয়ে গিয়েছিল ৪৪-এ। সেদিনের পুলিশি অত্যাচারের পরই আমি দৃঢ়ভাবে সিঙ্গুর নিয়ে আন্দোলনে প্রয়োজনে জীবন দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলাম। ’

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, সেটা আমরা রাখতে পেরে ধন্য মনে করছি। ’ সিঙ্গুরের কৃষকদের জন্য সব ধরনের সরকারি সাহায্য দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে তিনি বলেন, কারখানার যোগ্য করা জমিকে আবারও চাষযোগ্য জমি হিসেবে তৈরি করার সব ব্যবস্থা করবে রাজ্য সরকার।


মন্তব্য