kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নগদ টাকার চাপ নেই কলমানিতে

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



নগদ টাকার চাপ নেই কলমানিতে

বেশির ভাগ ব্যাংকেই এখন নগদ টাকার সংকট নেই। বরং কোনো কোনো ব্যাংকের রয়েছে উদ্বৃত্ত।

তাই গ্রাহকের চাহিদামাফিক আমানতের টাকা ফেরত দিতে ব্যাংকগুলোকে খুব একটা চাপে পড়তে হচ্ছে না। কোরবানির ঈদের মাত্র কয়েক দিন আগেও এই চাপ খুব একটা বাড়তে দেখা যাচ্ছে না। ২০ থেকে ২৫টি ব্যাংক তাত্ক্ষণিক প্রয়োজনে আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজার (কলমানি মার্কেট) থেকে নগদ টাকা ধার করছে। ঈদের ছুটির শেষ দিকে ব্যাংকগুলোর এই ধার নেওয়ার প্রবণতা কিছুটা বাড়লেও সুদহারে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত মঙ্গলবার কলমানি মার্কেট থেকে ৫৬টি ব্যাংকের মধ্যে ২৪টি ব্যাংক চার হাজার ১৯৮ কোটি টাকা ধার করেছে। ব্যাংকগুলোর মধ্যে ধার দেওয়া-নেওয়ার এই অর্থের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৪ শতাংশ। সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ২.৭৫ শতাংশ।

এদিন সবচেয়ে বেশি ধার করেছে ব্র্যাক ব্যাংক। ব্যাংকটির ধার ছিল ৫৯৭ কোটি টাকা। মার্কেন্টাইল ব্যাংক ধার করেছিল ৫০২ কোটি টাকা। দি সিটি ব্যাংক ধার করেছিল ৫০১ কোটি টাকা। প্রিমিয়ার ব্যাংক ধার করেছিল ৩১৮ কোটি টাকা। দ্য ফারমার্স ব্যাংকের ধার ছিল ২৯৪ কোটি টাকা। এনসিসি ব্যাংকের ধার ছিল ২৪৫ কোটি টাকা। সাউথ-বাংলা অ্যাগ্রিকালচারাল অ্যান্ড কমার্স ব্যাংকের ধার ছিল ২২৩ কোটি টাকা। ২০০ কোটি টাকার নিচে ধার ছিল অন্য ব্যাংকগুলোর।

তা ছাড়া ৩২টি আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও লিজিং কম্পানির মধ্যে ২২টি প্রতিষ্ঠানকেই ব্যাংক থেকে নগদ টাকা ধার করতে হয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানগুলো মোট ধার করেছে এক হাজার ৯১৭ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ধার করেছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। প্রতিষ্ঠানটির ধার ছিল ৪৯৫ কোটি টাকা। এই খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর নেওয়া ধারের সর্বোচ্চ সুদহার ছিল ৪.৫০ শতাংশ। সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ৩.৫০ শতাংশ।

সব মিলিয়ে গত মঙ্গলবার আন্তব্যাংক মুদ্রাবাজারে মোট ছয় হাজার ১১৫ কোটি টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া করে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, যা গত সাত কর্মদিবসের মধ্যে সর্বোচ্চ। গত ২৯ আগস্ট কলমানিতে মোট ধারের পরিমাণ ছিল পাঁচ হাজার ৬১ কোটি টাকা। ৩০ আগস্ট ধার ছিল চার হাজার ৯২০ কোটি টাকা। ৩১ আগস্ট ধার ছিল পাঁচ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। ১ সেপ্টেম্বর ধার ছিল পাঁচ হাজার ৯১৮ কোটি টাকা। এরপর গত ৪ সেপ্টেম্বর মোট পাঁচ হাজার ৭৮১ কোটি টাকা ধার দেওয়া-নেওয়া হয়। গত ৫ সেপ্টেম্বর ধার ছিল পাঁচ হাজার ৮৬১ কোটি টাকা।

এই সাত দিনে কলমানি মার্কেটের ভারিত গড় সুদহারে খুব সামান্য পার্থক্য দেখা যায়। তবে সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন সুদহারে তেমন কোনো পার্থক্য ছিল না।

গত বছরের কোরবানির ঈদের আগেও প্রতিদিন কলমানি মার্কেটে গড়ে ছয় হাজার কোটি টাকা হাতবদল হয়েছে। সুদের সর্বোচ্চ হার ছিল ৬ শতাংশ। আর সর্বনিম্ন হার ছিল ৫.৪০ শতাংশ।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেসরকারি বিনিয়োগ চাহিদা কম থাকায় ব্যাংক খাতে বেশ কিছু তারল্য (নগদ অর্থ) একরকম অলস পড়ে রয়েছে। যে কারণে ব্যাংক খাতে নগদ টাকা তুলে নেওয়ার চাপ বাড়লেও কলমানি মার্কেটে সেই চাপ খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারছে না। তা ছাড়া কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনার ফলে গত চার-পাঁচ বছরে কলমানি মার্কেটের সুদের হার ১৪ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৪ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

বর্তমানে কলমানি মার্কেটে নগদ টাকা ধারের এই সহজলভ্যতা খুব সহজেই হয়তো ছয় বছর আগের সেই বিপর্যয়ের ইতিহাস ভুলিয়ে দিয়েছে। ওই বছর (২০১০ সালের ১৯ ডিসেম্বর) কোরবানির ঈদের আগে কলমানির সুদের হার প্রায় ২০০ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছিল। ওই দিন বেসরকারি একটি ব্যাংক সর্বোচ্চ ১৯০ শতাংশ সুদে অন্য একটি ব্যাংকের কাছ থেকে কয়েক শ কোটি টাকা ধার নিয়েছিল। এরপর অবশ্য আর এমন ঘটনা ঘটেনি।

ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কোনো ব্যাংকের কাছে যখন গ্রাহকের চাহিদার তুলনায় নগদ টাকা কম থাকে তখন ওই ব্যাংক অন্য ব্যাংক থেকে কলমানির মাধ্যমে ধার করে অথবা রেপোর মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ধার করে গ্রাহকের চাহিদা মেটায়। সাধারণত এক রাতের জন্য এই  ধার দেওয়া-নেওয়া করে থাকে ব্যাংকগুলো।

বর্তমানে ব্যাংকগুলোতে নগদ অর্থের সংকট না থাকা এবং একই সঙ্গে পর্যাপ্ত তারল্য উদ্বৃত্ত থাকায় কলমানির সুদের হার কম রয়েছে। তা ছাড়া ঋণচাহিদাও কম থাকায় গত বছর এক দশকের রেকর্ড ভেঙে কলমানি লেনদেনের এই ব্যবস্থায় সুদহার কমতে কমতে ২ শতাংশের নিচে নেমে যায়।

ব্যাংকারদের দাবি, ব্যাংকগুলোতে বর্তমানে এক লাখ কোটি টাকার বেশি উদ্বৃত্ত তারল্য রয়েছে। এই হিসাব করার ক্ষেত্রে ব্যাংকাররা তাঁদের স্ট্যাটুটরি লিকুইডিটি রেশিও বা এসএলআর এবং সরকারের ট্রেজারি বিল-বন্ডের প্রয়োজনের অতিরিক্ত বিনিয়োগ হিসাব করছেন।

কলমানির সুদের হার কম থাকার বিষয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবদুস সালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রামের কৃষকরা এখন খুব সহজেই তাদের উৎপাদিত পণ্য শহরে পাঠাতে পারছে। তা ছাড়া যারা চাকরি করে না তারাও এখন অনেক ছোটখাটো ব্যবসা করছে। ফলে সামগ্রিকভাবেই মানুষের আয় এখন অনেকটা বেড়েছে। আর আয় বাড়লেই সঞ্চয় বাড়ে। যে কারণে ব্যাংকে টাকা জমার পরিমাণও বেড়েছে। ’ তিনি বলেন, এখন ব্যাংক খাতে নিয়ন্ত্রণও প্রতিষ্ঠা হয়েছে যথাযথ। তাই কেউ চাইলেও জাল-জালিয়াতি করে ব্যাংক থেকে টাকা বের করতে পারছে না। এসবের কারণেই ব্যাংকে নগদ টাকা উদ্বৃত্ত থাকছে। কলমানির প্রয়োজনও খুব একটা পড়ছে না। যে কারণে কলমানির সুদহারও কম রয়েছে।


মন্তব্য