kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আইনের কড়াকড়িতে কমছে বৈধ মানি চেঞ্জার

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



আইনের কড়াকড়িতে কমছে বৈধ মানি চেঞ্জার

ঢাকার বায়তুল মোকাররমের একটি মানি চেঞ্জারে বিদেশি মুদ্রা ভাঙাতে এসেছেন ক্রেতা। ছবি : লুৎফর রহমান

দেশে বিদেশি মুদ্রা বিনিময়ের জন্য অনুমোদিত মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা দিন দিন কমছে। ১৯৯৮ সালের পর থেকে দেশে যেমন নতুন মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন ইস্যু করা বন্ধ রয়েছে, তেমনি নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যবসা করায় নিবন্ধন বাতিলের ফলে গত ১৭ বছরে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৬৩৬ থেকে কমে ২৩৩-এ নেমে এসেছে।

হুন্ডি ব্যবসার অভিযোগ, নির্ধারিত কমিশনের অতিরিক্ত মাসুল আদায় ও নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগে গত ১৭ বছরে ৪০৩টি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন বাতিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এই সময়ে নতুন করে একটিও মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন দেয়নি সংস্থাটি।

গত প্রায় দুই দশকে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যেমন প্রসার ঘটেছে, জনশক্তি রপ্তানি ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বেড়েছে এবং দেশে বিদেশি মুদ্রার প্রবাহ বেড়েছে, সেই তুলনায় মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন না দেওয়ায় গজিয়ে উঠেছে বেশ কিছু অবৈধ মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান। এখতিয়ার না থাকায় এসব অবৈধ মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো ব্যবস্থা নিতে পারছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রশাসনের সহযোগিতায় দুই-একটি ভুয়া মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানকে উচ্ছেদ করা গেলেও এখনো অনেক ভুয়া মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান বাজারে রয়েছে বলে জানিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা।

তবে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের মালিকরা উল্টো বাংলাদেশ ব্যাংকের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ তুলেছে। তাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক ধরনের বিধিনিষেধ মেনে বৈধভাবে লেনদেন করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। তা ছাড়া লেনদেনের সীমা কম থাকায় ব্যবসা লাভজনক হচ্ছে না।

১৯৯৭ সাল থেকে দেশে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন প্রদান শুরু হয়। নিবন্ধন পেয়ে মানি এক্সচেঞ্জারগুলো ব্যাপক হারে বৈদেশিক মুদ্রার লেনদেন শুরু করলেও অভিযোগ ওঠে, এসব লেনদেনের বেশির ভাগই অবৈধ। এরপর থেকে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে মানি এক্সচেঞ্জারের নিবন্ধন বাতিল শুরু হয়।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য মতে, ১৯৯৯ থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬১ শতাংশ মানি এক্সচেঞ্জারের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। সব মিলিয়ে দেশে বর্তমানে অনুমোদিত মানি এক্সচেঞ্জারের সংখ্যা ২৩৩ এসে ঠেকেছে। সর্বশেষ গত এপ্রিলে বাতিল করা হয়েছে এজে মানি এক্সচেঞ্জের নিবন্ধন। বাতিল হওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই আবার হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ নিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তারা জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিদর্শনে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানগুলো লেনদেনের সঠিক হিসাব সংরক্ষণ করে না। যখন হিসাবের বিবরণ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়, তখন তারা প্রতিদিনের লেনদেন হিসেবে যৎসামান্য উল্লেখ করা শুরু করে। কিন্তু পরিদর্শনে গিয়ে দেখা গেছে ড্রয়ার ভর্তি ডলার। অনুমোদন ছাড়াই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে শাখা স্থাপন করেছে।

জানতে চাইলে মানি চেঞ্জার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি মোস্তফা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা প্রায় ধংসের মুখে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে একজন গ্রাহকের কাছে কোনো ভিসা ছাড়া মাত্র ২০০ ডলার বিক্রি করতে পারে। আর ভিসার বিপরীতে সর্বোচ্চ বিক্রি করা যায় এক হাজার ডলার। এই সামান্য পরিমাণ ডলার বিনিময় করে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলো কিভাবে চলে? কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে এ বিষয়ে আমরা অনেকবার সহযোগিতা চেয়েছি। তাঁরা আমাদের অনুরোধ আমলেই নেন না। ’

মোস্তফা খান আরো বলেন, ‘কিছু মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠান অবৈধ ব্যবসা করছে, তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থাও নিচ্ছে না কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অনেক মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের মূল মালিক এসব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছে না। তাদের নাম ভাঙিয়ে অন্য একটা গোষ্ঠী এসব প্রতিষ্ঠানকে কাজে লাগাচ্ছে। এ ধরনের অনিয়ম বন্ধে আমরা অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে অনেক ধরনের উদ্যোগ নিয়েও সফল হচ্ছি না। কেননা এদের অনেকেই সরকারের অনেক মন্ত্রী ও এমপিদের আত্মীয়স্বজন বলে দাবি করে। ’ 

গত বছর থেকে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের সব হিসাব অনলাইনে করার নির্দেশনা দিয়েছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তিতে সময় ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। একই সঙ্গে অর্থপাচার রোধে এসব প্রতিষ্ঠানকে রিপোর্ট প্রদানকারী সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করেছে বাংলাদেশ ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ)।

বাংলাদেশ বাংকের জারিকৃত সার্কুলারে বলা হয়েছে, মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোকে সব স্থানীয় মুদ্রা ও বিদেশি মুদ্রার স্থিতি দিন ভিত্তিতে নির্দিষ্ট রেজিস্টার খাতায় লিপিবদ্ধ করতে হবে। এই রেজিস্টারের হিসাবের বাইরে কোনো বিদেশি মুদ্রা ওই প্রতিষ্ঠানে সংরক্ষণ করা যাবে না। লেনদেনের উদ্দেশে আসা গ্রাহক ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তি মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বিদেশি মুদ্রাসহকারে অবস্থান করতে পারবে না। অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান ছাড়া কোথাও বিদেশি মুদ্রা ক্রয়-বিক্রয় করতে পারবে না। সিটি করপোরেশনে অবস্থিত প্রত্যেক প্রতিষ্ঠান তার ব্যবসাকেন্দ্রে ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা স্থাপন করবে এবং রেকর্ডকৃত ভিডিও ন্যূনতম সাত দিন সংরক্ষণ করতে হবে। যদি রাজনৈতিকভাবে পরিচিত (পলিটিক্যালি এক্সপোজড পারসনস-পেপস) কোনো ব্যক্তি লেনদেন করতে আসে, তবে তার লেনদেন অবশ্যই প্রধান নির্বাহীর অনুমোদন সাপেক্ষে করতে হবে। তাদের সঙ্গে সংঘটিত লেনদেন মনিটর করে কোনো অসংগতি পেলে তা বিএফআইইউকে জানাতে হবে। প্রভাবশালী কোনো ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই কাজ করতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা বলেন, ‘আমরা সব মানি এক্সচেঞ্জকে একটা নির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতর আনতে চেষ্টা করেছিলাম। যারা আসতে পারেনি ও নিয়ম লঙ্ঘন করেছে তাদের নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে। ভবিষ্যতেও যারা নিয়মবহির্ভূত কাজ করবে তাদেরও এই শাস্তির আওতায় আনা হবে। ’

যদিও অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির অভিমত, লাইসেন্স বাতিল করলেও মানি এক্সচেঞ্জারে অনিয়ম বন্ধ হয় না। বরং তা বেড়ে যায়। মোস্তফা খান বলেন, বিদেশি মুদ্রা অদলবদলে তুলনামূলক বেশি দাম দেওয়ার কারণে মানুষ মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানের কাছে আসে। অসাধু ব্যবসায়ীরা একে অপব্যবহার করছে। লাইসেন্স বাতিল কোনো সমাধান নয়। বরং মানি চেঞ্জার প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবসার পরিধি বাড়ানো এবং এগুলোকে সঠিকভাবে তদারকি বাড়ানোই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ব্যুরো অব ম্যানপাওয়ার, এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড ট্রেনিংয়ের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালে কর্মসংস্থানের উদ্দেশে বিদেশ গিয়েছিল দুই লাখ ৬৮ হাজারেরও বেশি লোক। ২০১৫ সালে এই হার বেড়ে দাঁড়ায় পাঁচ লাখ ৫৬ হাজার। বর্তমানে প্রায় এক কোটি জনশক্তি দেশের বাইরে রয়েছে।


মন্তব্য