kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


পোস্টাল ব্যাংক চায় পোস্ট অফিস

আবুল কাশেম   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



পোস্টাল ব্যাংক চায় পোস্ট অফিস

চিঠির আবেদন না থাকলেও ডাকঘরে মানুষ এখন সঞ্চয়পত্র, ইলেকট্রনিক মানি অর্ডারসহ নানা সেবা নিচ্ছে। ফাইল ছবি

তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে চিঠিপত্র বিলির কাজ তেমন একটা নেই। রয়েছে বিশাল অবকাঠামো, বিপুল জনবল আর মানুষের আস্থা।

অন্য অনেক সেবার মধ্যে এখনো চালু রয়েছে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকও, যেখানে মাত্র দুই টাকায় হিসাব (অ্যাকাউন্ট) খোলার সুযোগ পায় মানুষ। ৪৭ লাখ মানুষের হিসাব রয়েছে এ ব্যাংকে। এবার পুরোদস্তুর ব্যাংক হিসেবে কার্যক্রম চালাতে চায় ডাক অধিদপ্তর। এ জন্য ‘পোস্টাল ব্যাংক’ নামে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাংক প্রতিষ্ঠার নীতিগত অনুমোদন চেয়েছে সরকারের কাছে। অনুমোদন পেলে এ ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সঞ্চয় গ্রহণ, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ, এসএমই খাতে ঋণ বিতরণ ও পল্লী এলাকার জনগণকে ব্যাংকিং সুবিধা দিতে চায় প্রতিষ্ঠানটি।

ডাক অধিদপ্তরের আওতায় পোস্টাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন চেয়ে গত ২৬ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠিয়েছেন ডাক অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) পি. সি. সাহা। ওই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়ে ডাক বিভাগ তা পাঠিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত অনুমোদন এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দেবে ডাক অধিদপ্তর।  

এ বিষয়ে পি. সি. সাহা জানান, ডাক অধিদপ্তরের সারা দেশে অফিস, জনবল—সবই রয়েছে। বর্তমানে পোস্ট অফিস সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম রয়েছে। ২০১০ সালের ২৬ মার্চ থেকে ডাক বিভাগ পোস্টাল ক্যাশ কার্ড এবং ইলেক্ট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস) চালু করেছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ডাকঘর ব্যাংক চালু রয়েছে। সেসব দেখেই বাংলাদেশ ডাক অধিদপ্তর পোস্টাল ব্যাংক স্থাপনে সরকারের কাছে প্রস্তাব দিয়েছে। এটি হলে স্বয়ংসম্পূর্ণ ব্যাংকিং সার্ভিস স্থাপনের মাধ্যমে ক্ষুদ্র সঞ্চয় গ্রহণ, ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ, এসএমই অর্থায়নসহ পল্লী জনগণকে ব্যাংকিং সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। জানতে চাইলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম কালের কণ্ঠকে বলেন, পোস্টাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তাদের অনুমোদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে এ ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হবে।

১৮৭৩ সালের ২৮ জানুয়ারি ‘দ্য গভর্নমেন্ট সেভিংস ব্যাংক অ্যাক্ট’ পাস হয়, যা ১৮৮১ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে বলবৎ হয়। পরের বছরের ১ এপ্রিল থেকে বর্তমান বাংলাদেশ ভূখণ্ডসহ ভারত উপমহাদেশের সব পোস্ট অফিসে সঞ্চয় ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়, যা বর্তমানে বাংলাদেশ ডাক বিভাগেও প্রচলিত আছে। ডাক বিভাগ এ সার্ভিসটি অভ্যন্তরীণ সম্পদের এজেন্সি সার্ভিস হিসেবে দিয়ে কমিশন পেয়ে থাকে। বর্তমানে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে ৪৭ লাখ হিসাব রয়েছে। মাত্র দুই টাকা দিয়ে ডাকঘর সঞ্চয় ব্যাংকে হিসাব খোলা যায়।  

ডাক অধিদপ্তর বলেছে, বিশ্বের সব ডাক প্রশাসনই আর্থিক সেবায় গুরুত্ব দিচ্ছে। ব্যাংকিং সুবিধার বাইরে থাকা বাংলাদেশের প্রায় ৭০ ভাগ জনগোষ্ঠীকে আর্থিক খাতে অন্তর্ভুক্তির সবচেয়ে সহজ সমাধান দিতে পারে ডাক বিভাগ। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ডাকঘর ও পোস্ট ই-সেন্টার রয়েছে। বাস্তবতা অনুধাবন করে ডাক বিভাগ ইতিমধ্যে ফিন্যানশিয়াল সার্ভিসের মানোন্নয়ন ও নতুন সার্ভিস প্রবর্তনের দিকে মনোযোগী হয়েছে। এ ক্ষেত্রে পোস্টাল ব্যাংকের প্রবর্তন সম্ভাবনার ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। নেদারল্যান্ডস, শ্রীলঙ্কা, জাপান, চীন, ফিলিপাইন, ব্রাজিল, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশের ডাক প্রশাসন পোস্টাল ব্যাংক প্রবর্তনের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছে নিজেদের উপযোগিতা সৃষ্টির পাশাপাশি অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছে। এ অবস্থায় পোস্টাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন চেয়ে ডাক অধিদপ্তর বলেছে, নীতিগত অনুমোদন পাওয়ার পর পরামর্শক নিয়োগের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব দেওয়া হবে।

গত ২৮ আগস্ট ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় থেকে পোস্টাল ব্যাংক স্থাপনের নীতিগত অনুমোদন চেয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, ২০১০ সালে পোস্ট অফিস আইন সংশোধন করা হয়েছে। এ আইনের ৩(২) (এফ) ধারায় বলা হয়েছে, ডাক বিভাগ রেমিট্যান্স ট্রান্সফার সার্ভিস, ব্যাংকিং সেবা, পোস্টাল লাইফ ইন্স্যুরেন্স সার্ভিস এককভাবে বা অন্য কোনো সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে দিতে পারবে। এর আওতায় ডাক বিভাগকে পোস্টাল ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।

বর্তমানে ডাক বিভাগ সাধারণ চিঠিপত্র, রেজিস্টার্ড চিঠিপত্র, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পার্সেল, বীমা সার্ভিস, ভ্যালু পেয়েবল সার্ভিসেস, মানি অর্ডার, গ্যারান্টিড এক্সপ্রেস পোস্ট (জিইপি), এক্সপ্রেস মেইল সার্ভিস ও ইন্টোল পোস্টের কাজ করছে। এ ছাড়া ডাক বিভাগের এজেন্সি কার্যাবলির মধ্যে রয়েছে পোস্ট অফিস সঞ্চয় ব্যাংক, সঞ্চয়পত্র, ডাক জীবন বীমা, প্রাইজবন্ড, রাজস্ব স্ট্যাম্পস বিক্রি, এক্সাইজ স্ট্যাম্পস, নন জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পস বিক্রি ও ব্যান্ডরোল বিক্রি।   

ব্যাংক পরিচালনার মতো ডাক অধিদপ্তরের বিপুল সম্পত্তি, অবকাঠামো ও জনবল রয়েছে উল্লেখ করে আবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে দেশে ডাকঘরের সংখ্যা রয়েছে ৯৮৮৬টি। এর মধ্যে ১৪২৬টি বিভাগীয় ডাকঘর এবং ৮৪৬০টি অবিভাগীয় ডাকঘর। ১৪২৬টি বিভাগীয় ডাকঘরের মধ্যে চারটি জিপিও, ২৩টি এ-গ্রেড প্রধান ডাকঘর, ৪৪টি বি-গ্রেড প্রধান ডাকঘর, ৪০০টি উপজেলা ডাকঘর, ৯৪৫টি বিভাগীয় উপ-ডাকঘর এবং ১০টি বিভাগীয় শাখা ডাকঘর রয়েছে।

ডাক বিভাগে কর্মীর সংখ্যা ৩৯ হাজার ৮৮৭ জন। এ ছাড়া ডাক অধিদপ্তরের পাঁচটি পোস্টাল সার্কেল, দুটি ডাক জীবন বীমা সার্কেল এবং একটি পোস্টাল একাডেমি রয়েছে। সারা দেশে ডাক বিভাগের ৩৭৫.২০ একর জমি ও ২৭১০টি ভবন রয়েছে।


মন্তব্য