kalerkantho


এক মন্ত্রণালয়ের টাকা অন্য মন্ত্রণালয়ে খরচ নয়

আরিফুর রহমান   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



এক মন্ত্রণালয়ের টাকা অন্য মন্ত্রণালয়ে খরচ নয়

অর্থবছরের শেষের দিকে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) টাকা খরচে ব্যাপক অপচয় ও দুর্নীতি হয়—দীর্ঘদিন ধরেই এমন অভিযোগ করে আসছেন দেশের অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের অভিযোগ, বছরের প্রথম কয়েক মাস মন্ত্রণালয়গুলো নানা অজুহাত দেখিয়ে টাকা খরচ করে না, বছরের শেষ দিকে গিয়ে টাকা খরচের হিড়িক পড়ে যায়।

ফলে ওই টাকার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি থাকে না। প্রকল্পের গুণগত মানও নিশ্চিত হয় না। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বিভিন্ন সময়ে এডিপির টাকা খরচ না হওয়ায় নিজের অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। বিভিন্ন মহল থেকে আসা ব্যাপক সমালোচনার পর অবশেষে সরকারি টাকা অপচয়ের একটি পথ বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করল অর্থ মন্ত্রণালয়। এডিপির আওতায় এখন থেকে এক মন্ত্রণালয়ের টাকা আরেক মন্ত্রণালয় খরচ করতে পারবে না—এমন সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, গত পাঁচ বছর মন্ত্রণালয়গুলোকে সুযোগটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু দেখা গেছে, সুযোগ দিয়ে কোনো লাভ হয়নি, বরং সরকারের অনেক টাকা অপচয় হয়েছে। অনেক মন্ত্রণালয় এর অপব্যবহারও করেছে। তাই এক মন্ত্রণালয়ের টাকা আরেক মন্ত্রণালয়ের খরচ করার যে অবারিত সুযোগ ছিল, সেটি চলতি বছর থেকেই রহিত করা হলো। গত ২২ মার্চ রাজধানীর শেরে বাংলানগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় পরিকল্পনামন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল সভাপতিত্ব করেন। এ সময় অন্যদের মধ্যে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান, অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সিনিয়র সচিব মোহাম্মদ মেজবাহউদ্দিন, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব তারিক উল ইসলাম, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. শামসুল আলমসহ অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি অর্থবছরের শুরুতে বড় আকারের এডিপি ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু বছরের মাঝামাঝি সময়ে গিয়ে খরচ করতে না পারার আশঙ্কায় মন্ত্রণালয়গুলো টাকা ফেরত দেওয়া শুরু করে। ফলে মার্চ-এপ্রিলে সরকারকে এডিপি সংশোধন করতে হয়। কর্মকর্তারা জানান, সংশোধিত এডিপি অনুমোদন দেওয়ার পরও অনেক মন্ত্রণালয় টাকা ফেরত দেয়। ফলে সেই টাকা অন্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া হয়, যার দরকার। এত দিন এই প্রথা চালু ছিল। যদিও এক মন্ত্রণালয়ের টাকা অন্য মন্ত্রণালয়ে দেওয়া ২০০৯ সালে প্রণীত ‘পাবলিক মানি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’-এর পরিপন্থী ছিল। আইনের পরিপন্থী হলেও মন্ত্রণালয়গুলো যাতে টাকা খরচ করতে পারে এবং মানুষ প্রকল্প থেকে সুফল পেতে পারে সে জন্য সুযোগটি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু গত পাঁচ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বছরের শেষের দিকে অর্থ খরচ করতে গিয়ে ব্যাপক অপচয় হয়।

গত ২২ মার্চের সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে, ‘পাবলিক মানি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’-এর ১৪(১) ধারা মোতাবেক এক মঞ্জুরি থেকে অন্য মঞ্জুরির বিপরীতে অর্থ স্থানান্তর বা পুনঃউপযোজন অনুমোদন দেওয়া যাবে না। অর্থাত্ সংশোধিত এডিপিতে কোনো মন্ত্রণালয় বা বিভাগের অনুকূলে যে টাকা বরাদ্দ দেওয়া হবে, ওই টাকা মন্ত্রণালয় বা বিভাগের জন্য চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হবে। এখন থেকে সংশোধিত এডিপি অনুমোদন হওয়ার পর থেকে এক মন্ত্রণালয়ের টাকা অন্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া যাবে না। তবে এক মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পে টাকা খরচ না হলে সেই টাকা একই মন্ত্রণালয়ের অন্য প্রকল্পে নেওয়া যাবে।

জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের উপপ্রধান সাঈদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পাবলিক মানি অ্যান্ড বাজেট ম্যানেজমেন্ট অ্যাক্ট’-এ বলা ছিল, বাজেট পাস হওয়ার পর এক মন্ত্রণালয়ের টাকা অন্য মন্ত্রণালয়কে দেওয়া যাবে না। কিন্তু গত কয়েক বছর ধরে সেটি দেওয়া হয়েছিল। ২২ মার্চের সভায় সেটি বাতিল করা হয়েছে। ’ তিনি বলেন, এখন থেকে যার যত টাকা লাগবে, তাকে ঠিক তত টাকাই দেওয়া হবে। বেশি কিংবা কম দেওয়া হবে না। আইনটি কার্যকর হলে মন্ত্রণালয়গুলোর অযৌক্তিক চাহিদা আর থাকবে না। কর্মকর্তারা বলছেন, এটি কার্যকর করা গেলে এখন যেভাবে বছরের শেষের দিকে এডিপির টাকা খরচের হিড়িক পড়ে, সেটি কিছুটা হলেও কমবে। পাশাপাশি মন্ত্রণালয়গুলোও অতি উত্সাহী হয়ে বাড়তি টাকা নিতে পারবে না।

এদিকে পরিকল্পনা কমিশনের বর্ধিত সভায় চলতি ২০১৫-১৬ অর্থবছরের সংশোধিত এডিপির আকার চূড়ান্ত করা হয়েছে। তাতে সংশোধিত এডিপির আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৮৮ হাজার কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের মূল এডিপির চেয়ে ৯ হাজার কোটি টাকা কম। মূল এডিপির আকার ছিল ৯৭ হাজার কোটি টাকা। আগামী ৫ এপ্রিল জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের সভায় সংশোধিত এডিপি অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে।

কমিশন সূত্রে জানা যায়, সংশোধিত এডিপিতে পরিবহন খাতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এই খাতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ১৯ হাজার ৬৪০ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ২২ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে বিদ্যুত্ খাতে ১৫ হাজার ২৯৫ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ১৭ শতাংশ। আর তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থ বরাদ্দ রাখা হয়েছে শিক্ষা ও ধর্ম খাতে ৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা।


মন্তব্য