kalerkantho


পুুঁজিবাজারে মূল্যপতন চলছেই

তারল্য কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা

রফিকুল ইসলাম   

২৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তারল্য কমেছে ১৪ হাজার কোটি টাকা

পুুঁজিবাজারে ব্যাংকের অতিরিক্ত বিনিয়োগসীমা ঘনিয়ে আসায় অব্যাহতভাবেই শেয়ার বিক্রি করেছে ব্যাংকগুলো। এতে অনেক ব্যাংক শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে নিরাপদে চলে এসেছে।

এতে বাজারে তারল্যপ্রবাহ কমেছে। কারণ আইনি বাধ্যবাধকতায় অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি করে অর্থ তুলে নিয়ে বসে আছে। আর অর্থ তুলে নেওয়ায় বাজারে শেয়ারের প্রবাহ বেড়েছে। কাজেই শেয়ারের আধিক্য ও মূলধনের জোগান না থাকায় ব্যাপক মূল্যপতন হচ্ছে। বাজারের এই নাজুক অবস্থার উত্তরণে আইনি বাধ্যবাধকতা শিথিল করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের সুযোগ দেওয়ার কথাও বলছে সংশ্লিষ্টরা। দেখা গেছে, গত তিন মাসের ব্যবধানে বাজার থেকে ১৪ হাজার কোটি টাকা তারল্য কমেছে। আর ৩০০ পয়েন্ট সূচকের পতনও হয়েছে।

গেল বছর পুুঁজিবাজারকে গতিশীল করতে নানামুখী উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সেই সময় সংশ্লিষ্টরা আশা প্রকাশ করে বলেছিল, চলতি বছর উদ্যোগের প্রতিফলন ঘটবে।

কিন্তু তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, বাজারে গতি ফেরা তো দূরের কথা, বাজার থেকে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়েছে। কমেছে বিনিয়োগ ও সূচক। অনুমোদন পাওয়া আরো নতুন নতুন কম্পানি বাজার থেকে টাকা তুলে নিয়েছে।

বাজারে ধারাবাহিক দরপতন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পুঁজিবাজারের অতিরিক্ত বিনিয়োগ সমন্বয়সীমা ঘনিয়ে আসা ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ফ্রান্ডে অবলোপন করা। ফাস্ট আইসিবি, এইমস বিডি ও আরো একটি ফান্ডের মেয়াদ শেষ হওয়ায় শেয়ার বিক্রি করে অর্থ তুলেছে। ব্যাংকগুলোও শেয়ার বিক্রি করে নিরাপদে যাচ্ছে।

জানা গেছে, ব্যাংক কম্পানি আইন ১৯৯১-এর সর্বশেষ সংশোধনী (২০১৩-এর সংশোধনী) অনুযায়ী বাংলাদেশ ব্যাংক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা বিবেচনা করে ২০১৩ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা নির্ধারণ করে। ওই নির্দেশনা অনুযায়ী সাবসিডিয়ারি কম্পানি না থাকলে কোনো ব্যাংক তার আদায়কৃত মূলধন, শেয়ার প্রিমিয়াম স্থিতি, সংবিধিবদ্ধ সঞ্চিতি ও রিটেইন্ড আর্নিংয়ের ২৫ শতাংশের বেশি পুঁজিবাজারে বিনিয়োগ করতে পারবে না। এই নির্দেশনার মেয়াদ আগামী ২১ জুলাই শেষ হবে।

তবে গত বছরের ডিসেম্বরে ধারাবাহিক দরপতনের সময় সময়সীমা বাড়িয়ে দেওয়া হবে এমন ঘোষণাও শোনা গিয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেই নির্দেশনা আসেনি। সেই সময় ২০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ব্যাংকের এক সার্কুলারে ব্যাংকের বিনিয়োগে নতুন আদেশ জারি করে। এতে বলা হয়, সাবসিডিয়ারি কম্পানির মূলধনকে এক্সপোজারের মধ্যে আনা হবে না। এতে ব্যাংকের আরো বিনিয়োগ সক্ষমতা বেড়েছে।

ব্যাংকের বিনিয়োগসীমা বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে আবেদন করেছে মার্চেন্ট ব্যাংকার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমবিএ)। এই চিঠিতে আরো দুই বছর সময় বাড়ানোর দাবি জানানো হয়েছে। এই চিঠি অর্থমন্ত্রীকেও দিয়েছে তারা।

বিএমবিএ সভাপতি সায়েদুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, বাজারে অর্থের জোগানের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইনের মাধ্যমেই এটিকে সঙ্কুচিত করা হয়েছে। ব্যাংকগুলো আইনের কারণে বেশি বিনিয়োগ করতে পারছে না। আইনের বাধ্যবাধকতা শিথিল করে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের মাধ্যমে অর্থের জোগান বৃদ্ধি করা যেতে পারে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, গত তিন মাসে প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বাজার থেকে চলে গেছে। চলতি বছরের শুরুতে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) তারল্য ছিল তিন লাখ ১৪ হাজার ৯০০ কোটি ৯৪ লাখ ৬৬ হাজার ৪২৪ টাকা। তবে গতকাল দাঁড়িয়েছে তিন লাখ ৮৮১ কোটি ৭১ লাখ ৬৯ হাজার ৭৩৬ টাকা। নতুন কম্পানিকে আইপিও প্রদানের মাধ্যমেও কম্পানি অর্থ তুলেছে। শুধু মূলধন নয়, একই সঙ্গে কমেছে সূচকও। তিন মাসে প্রায় ৩০০ পয়েন্ট সূচক কমে গেছে। বছরের শুরুর দিন সূচক ছিল চার হাজার ৬১৭ পয়েন্ট। তবে গতকাল পর্যন্ত সূচক দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৩০২ পয়েন্ট।

সূত্র জানায়, পুুঁজিবাজারে অর্থের তারল্যের সংকট রয়েছে। আর এ সংকট ক্রমাগতভাবেই বাড়ছে। ব্যাংকগুলো আইনের কারণে অতিরিক্ত শেয়ার বিক্রি করে সীমার মধ্যে চলে আসছে। এতে বাজারে শেয়ারের আধিক্য থাকলেও নেই তারল্য। যার দরুন বাজারের পতন ঘটছে। পুুঁজিবাজার বিনিয়োগকারী ঐক্য পরিষদের সভাপতি আ ন ম আতাউল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাজারকে গতিশীল করতে নানা আইন-কানুন করা হচ্ছে। কিন্তু বাজারে তারল্য প্রবাহ বাড়ছে না। বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে ভয় পাচ্ছে। বাজারে অর্থের তারল্য সংকট ও বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সাম্প্রতিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাজারে আস্থা হারিয়েছে।

 

আতাউল্লাহ আরো বলেন, বাজারকে গতিশীল করতে সমন্বিত কোনো উদ্যোগ নেই। অনেকের মুখে কথার ফুলঝুরি শোনা গেলেও বাস্তবে প্রতিফলন নেই। মূল্যপতন ও সূচক কমে যাওয়ার পেছনে ব্যাংকের বিনিয়োগের সময়সীমা বড় প্রভাব ফেলছে। সংশ্লিষ্টরা বিষয়টি এখনো স্পষ্ট করছে না। সময় বাড়বে কি বাড়বে না এটি নিয়ে বিনিয়োগকারীরা দ্বিধায় রয়েছে। বাজারে তারল্য কম থাকলেও নতুন নতুন কম্পানিকে আইপিও দিয়ে মূলধন সংগ্রহের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাজারে তারল্য বাড়াতে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ বৃদ্ধি করতে হবে।

বাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বাজারের কিছু কম্পানি মার্জারের মাধ্যমে নন-লিস্টেড কম্পানির স্পন্সরদের শেয়ার কিনে বিক্রি করছে। এতে শেয়ারের বিপরীতে অর্থ তুলে নিচ্ছে। এই টাকা বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজার ক্রমেই তারল্য সংকটে পড়ছে। শেয়ার সাপ্লাই বাড়িয়ে অর্থ তুলে নেওয়া হচ্ছে। এ জন্যই শেয়ার থাকলেও ক্রেতা কম। এ ক্ষেত্রে স্পন্সরদের শেয়ার ক্রয় করে বিক্রির অর্থ তুলে নিতে লক-ইন দেওয়া প্রয়োজন।

গতকালের বাজার : ডিএসইতে লেনদেন হয়েছে ২৯৭ কোটি ৯১ লাখ টাকার শেয়ার। আর সূচক কমেছে ৫৩ পয়েন্ট। লেনদেন বেড়েছে ১৯ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ২৭৮ কোটি ১১ লাখ টাকা। আর সূচক কমেছিল ১৪ পয়েন্ট।

বাজার পর্যালোচনায় দেখা যায়, লেনদেন শুরুর পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে সূচকের পতন ঘটেছে। ৫৩ পয়েন্ট পতনের পর সূচক দাঁড়িয়েছে চার হাজার ৩০২ পয়েন্ট, ডিএস-৩০ মূল্যসূচক ২০ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৬৩০ পয়েন্ট ও ডিএসইএস শরিয়াহ সূচক ১২ পয়েন্ট কমে এক হাজার ৪৪ পয়েন্টে দাঁড়িয়েছে। লেনদেন হওয়া ৩২০টি কম্পানির মধ্যে বেড়েছে ৭০টি, কমেছে ২১০টি ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৪১টি কম্পানির শেয়ারের দাম।

লেনদেনের ভিত্তিতে শীর্ষে রয়েছে এমারেল্ড অয়েল, ড্রাগন সোয়েটার, কেয়া কসমেটিকস, এএফসি অ্যাগ্রো, বিএসআরএম লিমিটেড।

সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৯ কোটি ৬০ লাখ টাকা। আর সূচক কমেছে ৮০ পয়েন্ট। আগের দিন লেনদেন হয়েছিল ১৭ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। আর সূচক কমেছিল ৪৩ পয়েন্ট। দিনশেষে সূচক দাঁড়িয়েছে আট হাজার ৫৭ পয়েন্ট। লেনদেন হওয়া ২৩৪টি কম্পানির মধ্যে বেড়েছে ৪১টি, কমেছে ১৫৯টি ও অপরিবর্তিত রয়েছে ৩৪টি কম্পানির শেয়ারের দাম।


মন্তব্য