kalerkantho


১২ জেলা থেকে বিদেশ গমন এক শতাংশেরও কম

আরিফুর রহমান   

২৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



১২ জেলা থেকে বিদেশ গমন এক শতাংশেরও কম

উত্তরের জেলা লালমনিরহাটের মানুষের কাছে তিস্তা ব্যারেজ, তিন বিঘা করিডর, তুষভাণ্ডার জমিদার বাড়ি, বুড়িমারী স্থলবন্দরসহ আরো অনেক কিছুই আছে গর্ব করার মতো। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আছে তাদের গৌরবগাথা ইতিহাস। কিন্তু ১৩ লাখ মানুষের এ জেলায় এখনো দারিদ্র্যের হার ৩৫ শতাংশ। এর চেয়েও দুঃখজনক খবর হলো, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে লালমনিরহাট থেকে সবচেয়ে কম মানুষ বিদেশে গেছে। এমন তথ্য দিয়ে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, এখন পর্যন্ত দেশের সব জেলা থেকে যত সংখ্যক মানুষ বিদেশ গেছে, এর মধ্যে লালমনিরহাট থেকে গেছে মাত্র ০.২১ শতাংশ। জেলাওয়ারি হিসাবে যা সর্বনিম্ন। জেলাওয়ারি অভিবাসীর হার নিয়ে বিবিএসের করা প্রথম জরিপে দেখা গেছে, দ্বিতীয় সর্বনিম্ন মানুষ বিদেশ গেছে ঠাকুরগাঁও থেকে, ০.২৯ শতাংশ। আর তৃতীয় অবস্থানে দিনাজপুর ০.৪২ শতাংশ। বিবিএসের জরিপে আরো দেখা গেছে, দেশের ১২ জেলা থেকে বিদেশ যাওয়ার হার ১ শতাংশেরও কম। যার মধ্যে বেশির ভাগই উত্তরাঞ্চলের। আর কর্মসংস্থানের জন্য বিদেশ যাওয়ার হার সবচেয়ে বেশি ফেনী থেকে ২৭ শতাংশ। আর ২৪ শতাংশ নিয়ে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে কুমিল্লা। ২০ শতাংশ নিয়ে তৃতীয় অবস্থানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, উত্তরাঞ্চলে দারিদ্র্যের হার বেশি। তা ছাড়া সেখানকার মানুষ নিজ পরিবারের জীবনমান উন্নয়নে ততটা সচেতন নয়। মানুষগুলো খুবই সহজ-সরল। বিদেশে গিয়ে চাকরি করে নিজের পরিবারের আর্থিক অনটন কাটিয়ে সচ্ছলতা ফেরাবে, এমন স্বপ্নও দেখে না উত্তরাঞ্চলের মানুষ। কোনো মতে খেয়েপরে বেঁচে থাকতে চায় তারা। জনশক্তি নিয়ে কাজ করেন এমন বিশ্লেষকরা বলছেন, কুমিল্লা বা ফেনী অঞ্চলের একজন মানুষ বিদেশ গিয়ে থিতু হতে পারলেই সে তার আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-পড়শি থেকে আরো অনেককে নিয়ে যায়। কিন্তু উত্তরাঞ্চলে এ ধরনের বিষয় মানুষ চিন্তাও করে না। সেখানে সরকারের প্রচার-প্রচারণাও কম। এসব কারণে উত্তরাঞ্চল থেকে চাকরি নিয়ে বিদেশ যাওয়ার হার কম বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান বিভাগকে সঙ্গে নিয়ে গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে প্রথমবারের মতো দেশের বিভাগ, জেলা ও উপজেলাওয়ারি বিদেশে কর্মী যাওয়ার হার নিরূপণে জরিপের কাজ শুরু করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। ২০১১ সালের পঞ্চম আদমশুমারির তথ্য নিয়ে জরিপের কাজ শেষ হয় গত নভেম্বরে। বিভাগ, জেলা ও উপজেলাওয়ারি প্রথমবারের মতো করা ওই জরিপে দেখা গেছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন ৯৫ লাখ বাংলাদেশি অবস্থান করছে। সবচেয়ে বেশি বাংলাদেশি অবস্থান করছে সৌদি আরবে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে সংযুক্ত আরব আমিরাত, আর তৃতীয় মালয়েশিয়া। রেমিট্যান্স পাঠানোর দিক থেকে বাংলাদেশের স্থান এখন দশম।

বিবিএস বলছে, যে ৯৫ লাখ বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বসবাস করছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি বাসিন্দা হলো ফেনী, কুমিল্লা ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার। আর ১২ জেলা থেকে বিদেশ যাওয়ার হার ১ শতাংশেরও কম। জেলাগুলো হলো লালমনিরহাট ০.২১ শতাংশ, ঠাকুরগাঁও ০.২৯ শতাংশ, দিনাজপুর ০.৪২ শতাংশ, রংপুর ০.৫৪ শতাংশ, নেত্রকোনা ০.৭১ শতাংশ, নীলফামারী ০.৭১ শতাংশ, পঞ্চগড় ০.৭১ শতাংশ, রাঙামাটি ০.৭৫ শতাংশ, কুড়িগ্রাম ০.৭৯ শতাংশ, শেরপুর ০.৭৯ শতাংশ, সিরাজগঞ্জ ০.৮৪ শতাংশ ও গাইবান্ধা ১ শতাংশ।

দেশ থেকে বিদেশগামী কর্মীরা যাতে সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ পেতে পারে সে জন্য ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক। কিন্তু চার বছর পেরিয়ে গেলেও দেশের অনেক জেলায় এখনো এ ব্যাংকের ব্রাঞ্চ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ব্যাংকটি যে বিদেশগামী মানুষকে অর্থ সহযোগিতা করে, প্রচারণার অভাবে এ বিষয়টি এখনো অনেকে জানে না। তা ছাড়া উত্তরাঞ্চলের অনেক জেলায় এখনো প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ব্রাঞ্চ হয়নি। ব্যাংকের তহবিলও কম। ব্যাংকের ঋণসীমা অত্যন্ত সীমিত। ৪০ হাজার থেকে ক্ষেত্র ভেদে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত। এসব কারণে ব্যাংকটি এখনো বিদেশগামী মানুষের জন্য কল্যাণকর হয়ে ওঠেনি বলে বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের মহাব্যবস্থাপক মহব্বত উল্লাহ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উত্তরাঞ্চল থেকে বিদেশে যাওয়ার হার কম, বিষয়টি আমাদের নজরেও এসেছে। সে জন্য আমরা উত্তরাঞ্চলে ব্যাংকের ব্রাঞ্চ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছি। তবে কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। এখানে তহবিল খুব কম। তা ছাড়া ঋণসীমাও সীমিত। ’ তবে বিদেশে কেউ যেতে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকে আবেদন করলে তাকে খালি হাতে ফেরত দেওয়া হয় না বলে দাবি করেন মহব্বত উল্লাহ।  

জরিপে দেখা গেছে, ৯৫ লাখ অভিবাসীর মধ্যে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক কর্মী বিদেশ গেছে ফেনী থেকে ২৭ শতাংশ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ কর্মী গেছে কুমিল্লা থেকে ২৪ শতাংশ, তৃতীয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে ২০ শতাংশ। এর পরে আছে যথাক্রমে চাঁদপুর, মুন্সীগঞ্জ, নোয়াখালী, মৌলভীবাজার, নরসিংদী ও লক্ষ্মীপুর।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তাসনিম সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, কুমিল্লা, ফেনী ও নোয়াখালী অঞ্চল থেকে প্রথম বিদেশ যাওয়ার যাত্রা শুরু হয়। সেখান থেকে কোনো একজন বিদেশ গেলে সে আরো অনেককে বিদেশ নিয়ে যায়। বেশির ভাগ রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকের বাড়িও ওই অঞ্চলে। সে কারণে কুমিল্লা, ফেনী থেকে মানুষের বিদেশ যাওয়ার হার বেশি। তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বিদেশে কাজ করার জন্য যে ধরনের শক্তি ও মানসিকতা লাগে উত্তরাঞ্চলের মানুষের মাঝে তা নেই। দারিদ্র্যের কষাঘাতে থাকার কারণে তারা অনেকটা দুর্বল। সে জন্য তারা ঝুঁকি নিতে চায় না। তা ছাড়া উত্তরাঞ্চলে তথ্য আদান-প্রদানের চিত্র বেশ অপ্রতুল। সরকারের পক্ষ থেকে বিদেশ নেওয়ার ব্যাপারে সেখানে তেমন প্রচার-প্রচারণা নেই। উত্তরাঞ্চল থেকে অভিবাসনের হার বাড়াতে হলে সেখানে সরকারের পক্ষ থেকে প্রচারণা বাড়ানো, প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের কার্যক্রম জোরদার করা, ব্যাংক ঋণের সীমা বাড়ানো এবং কারিগরি প্রশিক্ষণকেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম আরো জোরদার করার পরামর্শ দেন তাসনিম সিদ্দিকী।

জরিপের সমন্বয়ক ও বিবিএস কর্মকর্তা মাসুদ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে চাকরির উদ্দেশে যারা বিদেশে গেছে, তাদের পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থা এবং কোন জেলা থেকে কত শতাংশ মানুষ বিদেশ গেছে, এসব তথ্য জানার জন্যই এ জরিপটি করা হয়েছে। মাসুদ আলম বলেন, ‘আমরা জরিপটি করতে গিয়ে দেখেছি, উত্তরাঞ্চল থেকে মানুষ বিদেশ যাওয়ার ব্যাপারে অনেক পিছিয়ে। সেখানে দেশের পূর্বাঞ্চল থেকে বিদেশ যাওয়ার হার বেশি। এ বিষয়টি আমরা নীতিনির্ধারকদের জানিয়েছি। যাতে করে পরবর্তী সময়ে কোনো পরিকল্পনা নেওয়ার ক্ষেত্রে উত্তরাঞ্চলকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ’


মন্তব্য