kalerkantho


৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা

ফারজানা লাবনী   

২৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



৭ শতাংশ ভ্যাট দিতে আগ্রহী ব্যবসায়ীরা

আগামী ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশের এখনো আড়াই মাসের বেশি সময় বাকি। কিন্তু এরই মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) জোরেশোরে রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুতিতে কাজ করছে।

ওদিকে এফবিসিসিআই থেকে কিছু শর্ত দিয়ে এনবিআরে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, আগামী ১ জুলাই থেকে অনলাইনে ভ্যাট আদায় শুরু হলে ভ্যাট আইন অনুসারে ব্যবসায়ীরা ১৫ শতাংশ ভ্যাট পরিশোধ করবেন না। তাঁরা ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৭ শতাংশ হারে ভ্যাট পরিশোধ করবেন। তাই ভ্যাট আইনের এ ধারাটি পরিবর্তন প্রয়োজন। বর্ধিত হারে প্যাকেজ ভ্যাট পরিশোধে ব্যবসায়ীরা রাজি হলেও স্ল্যাবভিত্তিক ভ্যাটের আওতায় আসতে সম্মত নন। রাজস্ব আদায়ের নামে বিনা নোটিশে এনবিআর কর্মকর্তারা ব্যবসায়ীদের হয়রানি করতে পারবেন না। বকেয়া আদায়ে জেল-জরিমানা, দোকানের মালপত্র ও হিসাব জব্দ করা যাবে না। এ বিষয়ে আসছে বাজেটে সুস্পষ্ট প্রস্তাব অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আগামী অর্থবছরের বাজেট অন্তর্ভুক্তিতে এমনি একগুচ্ছ শর্ত জুড়ে দিয়ে এফবিসিসিআই থেকে দাবি জানিয়ে এনবিআরে চিঠি পাঠানো হয়েছে।  

তবে বাজেট উপলক্ষে ইতিমধ্যে এনবিআরের মূল দপ্তর থেকে বিভিন্ন কর অঞ্চল, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট এবং কাস্টম হাউস থেকে বাজেট প্রস্তাব জমা নেওয়া হয়েছে।

আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক শাখা থেকেও এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে বাজেট প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে। আগামী বাজেটে রাজস্ব প্রস্তাব তৈরিতে এনবিআর কর্মকর্তাদের নিয়ে একাধিক কমিটি গঠন করা হয়েছে। এনবিআর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এসব কমিটি এ পর্যন্ত সংগৃহীত বাজেট প্রস্তাব যাচাই-বাছাইয়ে কাজ করছে। এবারের রাজস্ব বাজেট প্রস্তুতিতে প্রধান বাজেট সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন এনবিআরের প্রথম সচিব (শুল্ক গোয়েন্দা ও নিরীক্ষা) মোহাম্মদ আকবর হোসেন। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

ব্যবসায়ী সংগঠন, পেশাজীবীসহ খাতভিত্তিক বাজেট প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। প্রতিদিনই এসব প্রস্তাব ডাকযোগে বা হাতে হাতে পাঠানো হচ্ছে। দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই থেকে এখনো রাজস্ব প্রস্তাব এনবিআরে পাঠানো না হলেও আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্তিতে কিছু শর্ত জানিয়ে চিঠি পাঠিয়েছে। চিঠিতে স্পষ্ট করে বলা হয়েছে, এসব শর্ত মানা না হলে ব্যবসায়ীরা কঠোর অবস্থানে যাবেন।

এনবিআর চেয়ারম্যান মো. নজিবুর রহমানকে প্রধান করে আয়কর, মূসক ও শুল্ক শাখার কর্মকর্তাদের নিয়ে রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুতিতে প্রধান কমিটি গঠন করা হয়েছে। এ কমিটির বাইরে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক শাখার সদস্যকে প্রধান করে পৃথকভাবে আরো তিনটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

এনবিআর কর্মকর্তারা জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহ থেকে রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুতির কাজ শুরু করেন। গত ৬ জানুয়ারি এনবিআরের মূল দপ্তর থেকে বিভিন্ন কর অঞ্চল, কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট এবং কাস্টম হাউসে চিঠি পাঠিয়ে আগামী বাজেট প্রস্তাব চাওয়া হয়। একই দিনে আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক শাখার কাছে রাজস্ব প্রস্তাব চাওয়া হয়। সব প্রস্তাবই এনবিআর চেয়ারম্যানের দপ্তরে জমা দিতে বলা হয়। এরই মধ্যে এসব প্রস্তাব জমা দেওয়া হয়েছে।

বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুতিতে শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাট শাখার তিন সদস্যকে আহ্বায়ক করে গঠিত তিন কমিটি সংশ্লিষ্ট শাখার রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব তৈরি করবে। এই তিন কমিটির তৈরি প্রস্তাব এনবিআর চেয়ারম্যানের নেতৃত্বাধীন কমিটি যাচাই-বাছাই করে অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠাবে। মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর তা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে পাঠানো হবে। প্রধানমন্ত্রীর চূড়ান্ত অনুমোদনের পর মূল বাজেট প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এরপর তা জাতীয় সংসদে অনুমোদনের পর বাস্তবায়নে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া শুরু হবে। বাজেট প্রস্তাব প্রস্তুতির শেষ সময়ের ব্যবস্থা এড়াতে এবারে অর্থমন্ত্রীর নির্দেশে গত বছরের চেয়ে দুই মাস আগেই কাজ শুরু করেছে এনবিআর।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ছকে প্রণীত ভ্যাট আইনের যেসব ধারা এখনো বাস্তবায়ন হয়নি তা চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে কার্যকর করতে গত জানুয়ারিতে অর্থমন্ত্রী এনবিআরে চিঠি পাঠিয়ে নির্দেশ দিয়েছেন।

অর্থমন্ত্রীর পাঠানো চিঠিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আসছে বাজেটে কোনো ধরনের বিতর্ক যেন না থাকে। বিশেষ করে ভ্যাট আইন নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দূরত্ব কমিয়ে ফেলতে হবে। আগামী জুলাই থেকে ভ্যাট আইন সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে। বিভিন্ন সভা-সমিতিতে ব্যবসায়ী নেতারা ভ্যাট আইনের কিছু ধারা, উপধারায় তাঁদের আপত্তির কথা জানিয়েছেন। এ বিষয়ে সব বিতর্ক শেষ করতে এনবিআর ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসবে।  

এফবিসিসিআই থেকে এনবিআরে পাঠানো আবেদনপত্রে আরো উল্লেখ আছে, ব্যবসায়ীরা নিয়মিত রাজস্ব পরিশোধ করে বলেই এনবিআরের আদায় বাড়ছে। ফলে দেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দেশ পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠছে। তবে রাজস্ব আদায়ের নামে ব্যবসায়ীদের হয়রানি করে, বিভিন্ন নিয়ম-কানুন চাপিয়ে দিয়ে ব্যবসা করার পরিবেশ নষ্ট করলে রাজস্ব পরিশোধে ব্যর্থ হবেন তাঁরা। তাই ব্যবসায়ীদের ব্যবসা গতিশীলের স্বার্থে এফবিসিসিআই দেওয়া প্রস্তাবগুলো এনবিআরের বিবেচনা করা উচিত।

এফবিসিসিআই শিল্পের বিভিন্ন খাত থেকে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রস্তাব সংগ্রহ করে সামগ্রিকভাবে একটি প্রস্তাব জমা দেবে এনবিআরে। যা হবে এফসিসিসিআইয়ের মূল রাজস্ব বাজেট প্রস্তাব।

এফবিসিসিআই সভাপতি আবদুল মাতলুব আহমাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, বর্তমানে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে ভ্যাট আদায় করা হয়। অনলাইনে ভ্যাট আদায় শুরু হলে ভ্যাট ফাঁকি দেওয়া সম্ভব হবে না। তাই ভ্যাটের হার কমানো হলেও আদায় কমবে না বরং কয়েক গুণ বেড়ে যাবে। আবদুল মাতলুব আহমাদ আরো বলেন, বাংলাদেশে ভ্যাটের সর্বোচ্চ হার ১৫ শতাংশ নির্ধারিত আছে। অনলাইনে ভ্যাট আদায় শুরু হলে ভ্যাটের হার অবশ্যই ১৫ শতাংশের পরিবর্তে ৭ শতাংশ নির্ধারণ করতে হবে। না হলে ব্যবসায়ীরা কঠোর অবস্থানে যাবেন।

সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদে প্রতি কর্মদিবসেই শুল্ক, আয়কর ও ভ্যাট শাখার কর্মকর্তারা আসন্ন বাজেটের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে বৈঠক করছেন। কোন খাতে কী পদক্ষেপ গ্রহণ করলে কী পরিমাণ রাজস্ব সংযোজন-বিয়োজন হবে তার হিসাব কষছেন। ২৭ মার্চ থেকে বিভিন্ন খাতভিত্তিক প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনের সঙ্গে ১২ মে পর্যন্ত আলোচনায় বসবে এনবিআর রাজস্ব বাজেট প্রস্তুতির কর্মকর্তারা। এফবিসিসিআই এবং এনবিআরের যৌথভাবে আয়োজিত দিনব্যাপী বাজেটসম্পর্কিত কর্মশালার মধ্য দিয়ে এ আলোচনা শেষ হবে।

২৭ মার্চের প্রথম দিনের আলোচনায় এনবিআর কর্মকর্তারা অর্থনীতিবিদ ও পেশাজীবীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। এরপর পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈঠক হবে। নজিবুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, সবার সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তারা দীর্ঘ বৈঠক করে রাজস্ব বাজেট তৈরি করবেন। এবার শিল্প ও বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে এনবিআর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবে।


মন্তব্য