kalerkantho


ঢাকা-চট্টগ্রামে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প নয়

ফারজানা লাবনী   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ঢাকা-চট্টগ্রামে পরিবেশ দূষণকারী শিল্প নয়

দেশে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও অর্থনৈতিক সাফল্য নিশ্চিত করতে শিল্পায়ন নীতি ২০১৬ চূড়ান্ত করেছে সরকার। সেই সঙ্গে রাজধানী ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরকে দূষণমুক্ত নগরী হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টিও অগ্রাধিকারে রাখা হয়েছে। তাই দূষণ তৈরি করে এমন শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে দুই গুরুত্বপূর্ণ শহর ছাড়ার কথা বলা হয়েছে নতুন শিল্পনীতিতে। গতকাল সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে যা চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।  

শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু বলেন, সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে শিল্প খাতের গতিশীলতায় একটি গাইডলাইন হিসেবে শিল্পনীতি ২০১৬ প্রণয়ন করা হয়েছে। এ শিল্পনীতি অনুসারেই শিল্প খাত পরিচালিত হবে। এ নীতি ঠিকমতো অনুসরণ হচ্ছে কি না শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে তা কঠোর নজরদারি করা হবে।

শিল্পনীতিতে রাষ্ট্রীয় কলকারখানা সংস্কার এবং পশ্চাত্পদ এলাকাকে অগ্রাধিকার দিয়ে শ্রমঘন শিল্প স্থাপনে অধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এলাকাভিত্তিক কৃষিজ, বনজ, প্রাণিজ, প্রাকৃতিক, সামুদ্রিক সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে। শিল্প খাতে নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করা হয়েছে।   

শিল্পনীতিতে উল্লেখ আছে, ‘একটি সমৃদ্ধ শিল্প খাত গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার জাতীয় শিল্পনীতি ২০১৬ বাস্তবায়নে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এ শিল্পনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতকে শিল্প উন্নয়নের প্রধান মাধ্যম হিসেবে গণ্য করে ম্যানুফ্যাকচারিং এবং শ্রমঘন শিল্পের পরিকল্পিত উন্নয়নকে গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হিসেবে বিবেচনা করেছে। এর পাশাপাশি সরকার বৃহৎ শিল্প ও চিহ্নিত সেবা খাতের উন্নয়নেও কৌশল নির্ধারণ করেছে। ’

শিল্পনীতিতে বলা হয়েছে, দেশের শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় ব্যক্তি ও সরকারি খাতের অংশীদারত্বের ক্ষেত্রগুলো চিহ্নিত এবং সুষমকরণে জোর দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে প্রতিবন্ধকতা, দীর্ঘসূত্রতা দূর করতেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হবে।

শিল্পনীতিতে উচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত শিল্প খাতকে অর্থনীতির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব শিল্পে প্রণোদনা, অব্যাহতি, রাজস্ব সুবিধা, ব্যাংক ঋণসহ সব ধরনের রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা সর্বোচ্চ গুরুত্বসহকারে দেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বিনিয়োগ বোর্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। উচ্চ অগ্রাধিকার খাত হিসেবে কৃষি বা খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প, প্লাস্টিক শিল্প, তৈরি পোশাকশিল্প, জাহাজ নির্মাণশিল্প, পর্যটনশিল্প, হিমায়িত মত্স্যশিল্প, হোম টেক্সটাইল শিল্প, আইসিটি বা সফটওয়্যার শিল্প, পাট ও পাটজাতশিল্প, ওষুধশিল্প, চামড়া ও চামড়াজাতশিল্প এবং বাইসাইকেলশিল্প উল্লেখযোগ্য। উচ্চ অগ্রাধিকার খাতের তালিকায় থাকা শিল্পের পরেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে অগ্রাধিকার শিল্প খাতের আওতায় থাকা শিল্পগুলোকে। জনশক্তি রপ্তানি, পরিবেশসম্মত জাহাজ পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ, নবায়নযোগ্য শক্তি, বেসিক কেমিক্যাল রং রাসায়নিক দ্রব্য, অ্যাকটিভ ফার্মাসিউটিক্যাল ইনগ্রেডিয়েন্ট শিল্প ও রেডিং ফার্মাসিউটিক্যাল শিল্প, ভেষজ ওষুধশিল্প, তেজস্ক্রিয় রশ্মি ও প্রয়োগ শিল্প, পলিমার উত্পাদন শিল্প, হাসপাতাল ও ক্লিনিক, অটোমোবাইল, হস্ত ও কারুশিল্প, চা-শিল্প, সিরামিকস, টিস্যু গ্রাফটিং ও বায়োপ্রযুক্তি, জুয়েলারি, খেলনা, কনটেইনার সার্ভিস, ওয়্যারহাউস, নব উদ্ভাবিত ও আমদানি বিকল্প শিল্প, প্রসাধনী ও টয়লেট্রিজ, লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প অগ্রাধিকার খাতের তালিকায় রয়েছে।

শিল্পনীতিতে লোকসানি সরকারি কলকারখানা ব্যক্তি খাতের মতো লাভজনক এবং প্রতিযোগী হিসেবে গড়ে তুলতে ব্যাপক সংস্কারের কথা বলা হয়েছে। এ নীতিতে উল্লেখ আছে, বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া বন্ধ কারখানা আবারও সরকারি নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে এনে চালু করা হবে। নতুন করে আর কোনো সরকারি শিল্প বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হবে না। জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনীতি বা সংস্কৃতির জন্য হুমকি হতে পারে এমন শিল্প খাত চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব শিল্পসংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সর্বোচ্চ নজরদারি করবে। প্রাকৃতিক গ্যাস, তেল, বিদ্যুৎ, কয়লা অনুসন্ধান উত্তোলন, সঞ্চালন, স্যাটেলাইট চ্যানেল স্থাপন এ শিল্প খাতগুলো এর অন্যতম।  

বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে শিল্পনীতিতে বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর এলাকার জন্য মূলধনী বিনিয়োগের ওপর নির্দিষ্ট পরিমাণ ভতুকি, উত্পাদিত পণ্যের ওপর থেকে কর ও শুল্ক অব্যাহতি, অ্যাক্রিডিটেশন সনদের ফি এবং প্রিমিয়ামের খরচের পুনর্ভরণের ব্যবস্থা এবং চলতি মূলধনের সুদের ওপর ভর্তুকি দেওয়া হবে বলে শিল্পনীতিতে উল্লেখ আছে। গ্রামীণ ক্ষুদ্র শিল্প, কৃষি ও মত্স্য খাত, হাঁস-মুরগি, গবাদি পশুর খামার এবং ডেইরি শিল্পের জন্য ন্যূনতম মূল্য সংযোজন কর এবং ক্ষেত্র বিশেষে অব্যাহতি প্রদান করা হবে। স্থানীয় শিল্পে ব্যবহারে কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ও কর রেয়াত সুবিধা দেওয়া হবে। স্থানীয় মোটরসাইকেল, রেফ্রিজারেটর, হার্ডবোর্ডশিল্পে প্রথম পাঁচ বছর শুল্ক রেয়াতি সুবিধা দেওয়া হবে বলেও এখানে উল্লেখ আছে।

শিল্পনীতিতে বেসরকারি বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান উত্পাদন শুরুর তারিখ থেকে কর অব্যাহতি এবং বিশেষ প্রণোদনা পাবে বলে উল্লেখ আছে।

বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন সুবিধার কথা উল্লেখ করে শিল্পনীতিতে বলা হয়েছে, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনাবাসি বাংলাদেশিদের বিদেশি উদ্যোক্তাদের সমান সুবিধা দেওয়া হবে। অনাবাসি বাংলাদেশিদের বিনিয়োগকৃত মূলধনের পূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং লাভ ও ডিভিডেন্ড সম্পূর্ণ স্থানান্তরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবে। এর সুবিধা অব্যাহত থাকবে। প্রত্যেক বিভাগীয় শহরে ন্যূনতম একটি অর্থনৈতিক জোন গঠন করা হবে। ঢাকা ও চট্টগ্রামে শহর এলাকায় অবস্থিত পরিবেশ দূষণের দায়ে অভিযুক্ত কারখানা শহরের বাইরে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে ফেলা হবে। হস্ত ও কারুশিল্পজাত পণ্য রপ্তানি থেকে প্রাপ্ত আয় করমুক্ত থাকবে। রপ্তানি পণ্যের আমদানিনির্ভর কাঁচামাল আমদানির ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যারহাউস সুবিধা প্রদান অব্যাহত থাকবে।

শিল্পনীতিতে জ্ঞান ও পুঁজিনির্ভর উচ্চ প্রযুক্তির পরিবেশবান্ধব, আইটি, গবেষণা এবং উন্নয়ননির্ভর প্রতিষ্ঠানকে হাইটেক শিল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এসব খাতে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে। শিল্পসচিব মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া বলেন, সরকার শিল্প খাতের অগ্রসরতায় গুরুত্ব দিচ্ছে। জাতীয় শিল্পনীতিতে তা প্রতিফলিত হয়েছে। এই নীতি শিল্প খাতের জন্য একটি মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে।


মন্তব্য