kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


সম্ভাবনার ভোমরা ধুঁকছে

স্থলবন্দরের ভারত অংশে অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি

আরিফুর রহমান, সাতক্ষীরা থেকে ফিরে   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সম্ভাবনার ভোমরা ধুঁকছে

যশোরের বেনাপোল থেকে কলকাতার সড়কপথে দূরত্ব ৮৪ কিলোমিটার। আর সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর থেকে কলকাতার সড়কপথে দূরত্ব ৬২ কিলোমিটার। ২২ কিলোমিটারের দূরত্ব কম হওয়া সত্ত্বেও প্রয়োজনীয় কাজে যারা নিয়মিত পশ্চিমবঙ্গে যাতায়াত করে, তারা বেনাপোল দিয়ে যেতেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এমনকি সাতক্ষীরা, খুলনা, যশোরসহ ওই অঞ্চলের যাত্রীরা ভোমরা দিয়ে না গিয়ে বেনাপোল হয়ে কলকাতায় যাতায়াত করে। ব্যবসায়ীরা পণ্য আনা-নেওয়া করেন বেনাপোল দিয়ে। এর কারণ খুঁজতে সরেজমিনে গিয়ে বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ঢাকা থেকে সরাসরি সাতক্ষীরা শহর পর্যন্ত এসি, নন-এসি বাস থাকলেও শহর থেকে ভোমরা স্থলবন্দর পর্যন্ত ১৫ কিলোমিটার সড়কে কোনো ধরনের যানবাহন চলাচল করে না। এ ছাড়া বাংলাদেশের ওপারে ভারত অংশে ঘোজাডাঙ্গা থেকে বশিরপুর পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার সড়কের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।

সড়কের অবস্থা এতই ভাঙাচোরা যে সেখানে যানচলাচল করা কঠিন। বেনাপোলে যাওয়ার পর ওপারে পেট্রাপোলে যেমন বিভিন্ন কম্পানির বাস সুবিধা আছে, ভোমরাতে সেই সুযোগও নেই। ঢাকা থেকে কোনো যাত্রী বেনাপোলে গিয়ে বিশ্রাম নিতে চাইলে সেখানে আবাসিক হোটেলে থাকার সুবিধা আছে। যেটা পুরো ভোমরা স্থলবন্দর এলাকায় একটিও নেই। হঠাৎ কেউ অসুস্থ হলে গেলে তাকে ডাক্তার দেখানোর মতো একটি হাসপাতাল নেই ভোমরাতে। এসব কারণে সড়কপথে দূরত্ব কম থাকা সত্ত্বেও সাতক্ষীরার ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে যাত্রীরা যাতায়াত করতে আগ্রহী হয় না। ফলে রাজস্ব আদায় বাড়ানোর সম্ভাবনা থাকলেও সেটা কাজে লাগাতে পারছে না সরকার।

স্থানীয়রা বলছে, ভোমরাকে আরো গতিশীল ও কার্যকর করতে চাইলে সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে ভারত সরকারকে। শুধু বাংলাদেশ অংশের অবকাঠামো উন্নয়ন করলেই হবে না, ভারত অংশের অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি। দুই দেশের অবকাঠামো একসঙ্গে উন্নয়ন হলে লাভবান হতে পারে দুই দেশই। পূর্ণাঙ্গ বন্দরের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে দুই দেশেই রাজস্ব আদায়ের হার বাড়বে। বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ আশ্বাস দিয়েছিলেন, খুব দ্রুতই ভারতের অংশের সড়কসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন করা হবে। তবে এখনো অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হয়নি।

এদিকে ভোমরা দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার অবস্থা আরো করুণ। একজন ব্যবসায়ী ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে কোনো পণ্য বাংলাদেশে আনতে চাইলে এলসি খুলতে যে টাকা দিতে হয়, তা বন্দরে জমা দেওয়ার সুযোগ নেই। কারণ স্থলবন্দরে সোনালী, কৃষি এবং সাউথ বাংলা এই তিনটি ব্যাংক ছাড়া আর কোনো ব্যাংকের ব্রাঞ্চ নেই। ফলে ব্যবসায়ীদের এলসির টাকা জমা দিতে যেতে হয় সাতক্ষীরা শহরে। তা ছাড়া একজন ব্যবসায়ী চাইলেই ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে সব ধরনের পণ্য আনতে পারেন না। চাল, গম, পেঁয়াজ, ফলসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্য আনতে পারলেও শাড়ি, থ্রি পিস, মোটর পার্টস, পোশাক অ্যাকসেসরিজসহ এ ধরনের পণ্য ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আনার অনুমোদন নেই। ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের পণ্য আমদানির দাবি জানিয়ে এলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে এখনো সাড়া পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি পণ্য খালাসে দেরি হলে ব্যবসায়ী যদি ভোমরাতে এক রাত থাকতে চান, সেই ব্যবস্থা নেই।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভোমরা স্থলবন্দরকে প্রতিযোগিতামূলক করতে চাইলে আবাসিক হোটেল, হাসপাতাল, ব্যাংকসহ অন্যান্য অবকাঠামো নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে সাতক্ষীরা শহর থেকে স্থলবন্দর পর্যন্ত সড়কে যানবাহন চলাচলও নিশ্চিত করতে হবে। এগুলো নিশ্চিত করতে পারলে ভোমরা স্থলবন্দরে আমদানি-রপ্তানির হার বাড়বে।

স্থলবন্দরের কর্মকর্তারা অবশ্য ততটা হতাশ নন। তাঁরা বলছেন, ভোমরা স্থলবন্দরকে শুল্ক স্টেশন ঘোষণা করা হয় ১৯৯৬ সালে এবং বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৩ সালে। ভোমরাকে কেন সম্ভাবনাময় স্থলবন্দর হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে এমন প্রশ্নে ভোমরা স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) পার্থ ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, আগামী ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু উদ্বোধন হলে ভোমরা স্থলবন্দরের কার্যক্রম বহুগুণ বেড়ে যাবে। তখন সেখান দিয়ে যাত্রীর পাশাপাশি পণ্য আমদানির হারও বাড়বে। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে ভোমরা থেকে পণ্য নিয়ে খুলনা হয়ে সরাসরি মাওয়ায় সেতুতে ওঠা যাবে। এ ছাড়া বিকল্প কালনা সেতু হয়ে গেলে ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ আরো সহজ হবে।

অন্যদিকে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানি বাড়াতে সেখানকার অবকাঠামো উন্নয়নে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে একটি বড় প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা। প্রকল্পটির কাজ শেষ হলে ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে আমদানি-রপ্তানির হার বহুগুণে বাড়বে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন কর্মকর্তারা। স্থলবন্দরের উপসহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) মেহেদী হাসান জোয়ার্দার কালের কণ্ঠকে বলেন, একটা সময় আসবে যখন ভোমরা স্থলবন্দর হবে বাংলাদেশের অন্যতম একটি বন্দর। পদ্মা সেতু হয়ে গেলে এবং প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে খুব কম সময়ের মধ্যে ভোমরা থেকে সহজেই একটি ট্রাক ঢাকায় যেতে পারবে। কম খরচে ট্রাক ঢাকায় পৌঁছলে একজন ভোক্তাও কম দামে পণ্য কিনতে পারবে। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ‘রিজিওনাল কানেক্টিভিটি প্রজেক্ট’-এর আওতায় ভোমরায় নতুন করে আরো ৪৬ একর জমি অধিগ্রহণ করা হবে। এর পাশাপাশি ট্রাক টার্মিনাল প্রতিষ্ঠা করা হবে। এর পাশাপাশি নতুন ওয়্যারহাউস এবং ইয়ার্ড নির্মাণ করা হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে মোট ব্যয় হবে ২৭৬ কোটি টাকা। প্রকল্পটি এখন একনেক সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে বলে জানান মেহেদী হাসান।

ট্রাকচালক সুমন মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের চেয়ে ভারতের সড়ক ও স্থলবন্দরের অবস্থা আরো করুণ। আমরা কোনো পণ্য নিয়ে ভারতে গেলে সেখানে ট্রাক রাখার জায়গা নেই। বেশিক্ষণ ট্রাক রাখলে পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। ভারত অংশে এখনো স্থলবন্দর করা হয়নি। তা ছাড়া ভারত অংশে ঘোজাডাঙ্গা থেকে বশিরপুর পর্যন্ত সড়কের অবস্থা খুবই বেহাল। ’ সে দেশের সড়ক ও স্থলবন্দর নির্মাণ জরুরি বলে মত দেন ট্রাকচালক সুমন মিয়া।

এ প্রসঙ্গে ভোমরা স্থলবন্দরের সহকারী পরিচালক (ট্রাফিক) পার্থ ঘোষ কালের কণ্ঠকে বলেন, ব্যবসায়ীসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থা থেকে ভারত অংশের অবকাঠামো উন্নয়ন করতে তাদের বারবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। তারা জানিয়েছে, প্রথম দফায় পেট্রাপোল ও আগরতলা অংশের অবকাঠামো উন্নয়নের পর দ্বিতীয় দফায় ঘোজাডাঙ্গা এলাকার উন্নয়ন করা হবে। তিনি বলেন, স্থলবন্দরের কার্যক্রম বাড়াতে শুধু বাংলাদেশ অংশই নয়, ভারতের অংশেও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সারা দেশে এখন যে ২২টি স্থলবন্দরের অনুমোদন রয়েছে, এর মধ্যে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ভোমরা স্থলবন্দর। সেখান থেকে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায় হয়ে থাকে। প্রথম অবস্থানে আছে যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর। কর্মকর্তারা বলছেন, এখন প্রতিদিন ভারত থেকে ৩৫০ থেকে ৪০০ ট্রাক বাংলাদেশে পণ্য নিয়ে ঢুকে। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় ৫০ থেকে ৭০টি ট্রাক। এ ছাড়া ভোমরা স্থলবন্দর দিয়ে দৈনিক তিন শ থেকে চার শতাধিক মানুষ ভারতে আসা-যাওয়া করে। ভোমরা দিয়ে বাংলাদেশে চাল, ডাল, গম, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, ভুট্টা, জিরা জাতীয় পণ্য আসে। এ ছাড়া ফলের মধ্যে আপেল, কমলা, আনার, আঙুর জাতীয় ফল আসে। এর পাশাপাশি পাথর, তুলা, পানপাতা ও শুঁটকি মাছ আসে। আর বাংলাদেশ থেকে ভারতে যায় নাসির গ্লাসের পণ্য, প্রাণের পণ্য এবং ঝুট। কর্মকর্তারা বলছেন, ভোমরা দিয়ে সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন নেই। শুল্ক স্টেশনের জনবলসহ অবকাঠামো সংকটের কারণে সেখানে সব ধরনের পণ্য আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয় না বলে একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানিয়েছেন।


মন্তব্য