kalerkantho

বুধবার । ২৫ জানুয়ারি ২০১৭ । ১২ মাঘ ১৪২৩। ২৬ রবিউস সানি ১৪৩৮।


ফেসভ্যালুর নিচে সরকারি দুই কম্পানির শেয়ার

রফিকুল ইসলাম   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ফেসভ্যালুর নিচে সরকারি দুই কম্পানির শেয়ার

চলতি বছরের শুরু থেকেই মন্দাবস্থা বিরাজ করছে দেশের পুঁজিবাজারে। তবে এই মন্দাবস্থার মধ্যেও তালিকাভুক্ত কিছু কম্পানি ভালো অবস্থানে রয়েছে।

কিন্তু বছরজুড়েই অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে সরকারি দুই প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো—জিলবাংলা সুগার মিলস ও শ্যামপুর সুগার মিলস। তবে অন্য সরকারি কম্পানিগুলোও ভালো অবস্থানে নেই। ক্রমান্বয়ে কমছে শেয়ারের দাম।

নিয়মানুযায়ী কোনো কম্পানিকে বাজারে আসতে ১০ টাকা ফেসভ্যালু ও কম্পানির সম্পদ পরিমাণ অর্থে প্রিমিয়াম ধরে লেনদেনে অনুমোদন দেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। কিন্তু তালিকাভুক্ত এই কম্পানির শেয়ার ফেসভ্যালুর দুই থেকে তিন টাকা কমে লেনদেন হচ্ছে। জিলবাংলার শেয়ার লেনদেন হচ্ছে ৬.৪ টাকায় ও শ্যামপুর সুগার মিলসের লেনদেন হচ্ছে ৬ টাকায়।

জানতে চাইলে পুঁজািবাজার বিশ্লেষক অধ্যাপক আবু আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত কম্পানির প্রতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা ক্রমান্বয়ে কমছে। যার জন্যই সরকারি কম্পানি হওয়া সত্ত্বেও অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। যদিও সরকার বিভিন্ন সময়ে কম্পানিগুলোকে গতিশীল করার আশ্বাস দিয়েছিল। ’

১৯৮৮ সালে খাদ্য ও বিবিধ খাতে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় জিলবাংলা। কিন্তু ২০১৪ সালের এপ্রিল মাস থেকেই অভিহিত মূল্যের নিচে জিলবাংলা। এপ্রিল মাসের শুরুতে জিলবাংলার শেয়ারের দাম উঠেছিল ১১.৪ টাকা। কিন্তু এই সময়ের পর থেকেই দাম কমেছে। বর্তমানে পাঁচ টাকার ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। গত ছয় মাসের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, গত সেপ্টেম্বরে জিলবাংলার শেয়ারের দাম ছিল ৭.৪ টাকা। তবে নভেম্বরে দাম কিছুটা বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৩ টাকায়। এরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবেই কমছে শেয়ারের দাম। ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর (অক্টোবর-ডিসেম্বর) পর্যন্ত সমাপ্ত বছরে অনিরীক্ষিত দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক প্রতিবেদনে ইপিএস দাঁড়ায় নেতিবাচক। শেয়ারপ্রতি লোকসান হয় ১৬.৩০ টাকা। যা আগের বছরের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। আগের বছর এই সময়ে ইপিএস লোকসান ছিল ১১.৪৬ টাকা। গত ১৬ মার্চ সর্বশেষ লেনদেনে দেখা গেছে, কম্পানিটির শেয়ার মূল্য ৬ টাকা ৪০ পয়সা।

তালিকাভুক্ত কম্পানিগুলো নিয়ে সরকার কিছুই ভাবছে না উল্লেখ করে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, সরকারি কম্পানিগুলোর শেয়ারের দাম কমলেও এ নিয়ে নীতিনির্ধারণী মহল কোনো চিন্তা-ভাবনা করছে না। সরকারি মালিকানাধীন শেয়ারের অংশ বিক্রি করলেও কম্পানি অনেক গতিশীল হবে। আয়ও বাড়বে, কিন্তু সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না। কাজেই কম্পানিগুলোকে গতিশীল করতে শীর্ষ পর্যায় থেকে পরিকল্পনা ও চিন্তা করতে হবে।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সাবেক সভাপতি ও ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল ইসলাম টিটু কালের কণ্ঠকে বলেন, সরকারি কম্পানিগুলোর প্রফিট অ্যাবিলিটি কম। ডিভিডেন্ড রেকর্ডও ভালো নয়। নিয়মিতভাবে ডিভিডেন্ড দেয় না। এ ছাড়া কম্পানিতে করপোরেট গভর্ন্যান্স বা জবাবদিহিও নেই।

শ্যামপুর সুগার মিলস : শ্যামপুর সুগার মিলস এক বছর ধরে অভিহিত মূল্যের নিচেই রয়েছে। অভিহিত মূল্য ১০ টাকা হলেও লেনদেন হচ্ছে ৬ টাকায়। গত বুধবার ১৬ মার্চ কম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয় ৬ টাকায়। খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের কম্পানিটি ১৯৯৬ সালে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৪ সালের এপ্রিল থেকে কম্পানিটি অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে। ২০১৪ সালের শেষ ও ২০১৫ সালের শুরুতে শেয়ারের দাম অভিহিত মূল্য অতিক্রম করে। সেই সময় শেয়ারের দাম উঠেছিল ১২.৩ টাকা। কিন্তু এরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে শেয়ারের দাম। ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কম্পানিটি।

বাংলাদেশ সার্ভিস : ১৯৮৪ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত বাংলাদেশ সার্ভিস লিমিটেডের শেয়ারও অভিহিত মূল্যের নিচে। কম্পানিটির শেয়ারের দাম ৫.৫ টাকা। তবে জানা যায়, কম্পানিটির শেয়ারের ৯৯.৬৮ শতাংশ সরকারের। ডিএসই সূত্র জানায়, বর্তমানে কম্পানিটির কোনো লেনদেন হয় না।

ভালো নেই অন্যগুলোও : বিবিধ খাতের ওসমানিয়া গ্লাস কম্পানির শেয়ারের দামও ক্রমান্বয়ে কমছে। গত ছয় মাসের পরিসংখ্যানে দেখা যায় ধারাবাহিকভাবে কমেছে দাম। গত সেপ্টেম্বরে কম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ১২৪ টাকা। কিন্তু বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ৮৬ টাকায়। ২০১৫ সালে ১০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কম্পানিটি। ১৯৮৭ সালে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত।

তিতাস গ্যাস : গত নভেম্বর মাস থেকে অব্যাহতভাবেই কমছে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড কম্পানির শেয়ারের দাম। এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন কর্তৃক ট্যারিফ কমানোয় দামে প্রভাব পড়ে। গত ফেব্রুয়ারি মাসে ডিএসই ব্রোকার্স অ্যাসোসিয়েশনের এক সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়েছিল, গত ৩০ আগস্ট সরকারি সাতটি কম্পানির বাজার মূলধন ছিল ১৮ হাজার ৯৫১ কোটি টাকা, কিন্তু ৩ ফেব্রুয়ারি মূলধন কমে দাঁড়িয়েছে ১৩ হাজার ৫৩৮ কোটি টাকা। ৩০ আগস্টের পর থেকে শুধু তিতাস বাজার মূলধন হারিয়েছে তিন হাজার ১০৬ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে তিতাসের শেয়ারের দাম ছিল ৬৯ টাকা। তবে বর্তমানে শেয়ারের দাম দাঁড়িয়েছে ৪৪ টাকায়। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এই কম্পানি ২০০৮ সালে তালিকাভুক্ত হয়। ২০১৫ সালের জুন শেষে কম্পানিটি ১৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করে।

যমুনা অয়েল : জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের যমুনা অয়েল লিমিটেড কম্পানিও ভালো অবস্থানে নেই। গত ছয় মাস ধরেই কমছে শেয়ারের দাম। গত সেপ্টেম্বরে শেয়ারের দাম ছিল ২০২ টাকার ঘরে, কিন্তু এখন শেয়ারের দাম ১৫৪.১০ টাকা। ২০০৭ সালে বাজারে তালিকাভুক্ত হয় যমুনা অয়েল। ২০১৫ সালের জুন শেষে ১০০ শতাংশ লভ্যাংশ ঘোষণা করে কম্পানিটি।

পদ্মা অয়েল কম্পানি : গত ছয় মাস ধরেই দাম কমছে পদ্মা অয়েল কম্পানি লিমিটেডের শেয়ারের দাম। সেপ্টেম্বরের শুরুতে কম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ২৪৬ টাকা। বর্তমানে কম্পানিটির শেয়ারের দাম ১৭৮.৯ টাকা। তবে সেপ্টেম্বর মাসে দাম কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছিল। এরপর থেকেই ধারাবাহিকভাবে কমছে শেয়ারের দাম। ১৯৭৬ সালে এ ক্যাটাগরিতে তালিকাভুক্ত হয় কম্পানিটি। ২০১৫ সালের অক্টোবর-ডিসেম্বর অনিরীক্ষিত দ্বিতীয় প্রান্তিকের ইপিএসে দেখা যায়, গত বছরের তুলনায় ইপিএস কমেছে। আগের বছর এই সময়ে ইপিএস ছিল ৪.৩০ টাকা। কিন্তু এবার তা দাঁড়িয়েছে ৩.১৪ টাকা। ২০১৫ সালের ৩০ জুন শেষে ১০০ শতাংশ লভ্যাংশও ঘোষণা করে পদ্মা অয়েল।

রূপালী ব্যাংক : ১৯৮৬ সালে তালিকাভুক্ত রূপালী ব্যাংকের শেয়ারের দাম ক্রমান্বয়ে কমছে। এই কম্পানিটির শেয়ারের ৯০.১৯ শতাংশ সরকারি মালিকানা। ‘এ’ ক্যাটাগরির কম্পানিটি সর্বশেষ লেনদেন হয়েছে ৩০.৮ টাকা। এতে আগের দিনের চেয়ে দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে গত এক মাসের তথ্য বিশ্লেষণে জানা যায়, কম্পানিটির শেয়ারের দাম কমছে। কারণ গত ফেব্রুয়ারি মাসের দুই তারিখে কম্পানিটির শেয়ারের দাম ছিল ৩৩.৯ টাকা।

পাওয়ার গ্রিড কম্পানি : ২০০৬ সালে তালিকাভুক্ত হয় পাওয়ার গ্রিড কম্পানি। জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতের এ ক্যাটাগরির কম্পানিটির শেয়ারের দাম কমছে। বর্তমানে কম্পানিটির শেয়ার লেনদেন হয় ৫১.৪ টাকায়।

এটলাস বাংলাদেশ : প্রকৌশল খাতের এটলাস বাংলাদেশ কম্পানি পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয় ১৯৮৮ সালে। বর্তমানে ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। গত এক মাসের তথ্যে দেখা যায়, কম্পানিটির শেয়ারের দাম কমছে। ২ ফেব্রুয়ারি শেয়ারের দাম ছিল ১২৪.৬ টাকা। তবে বর্তমানে তা দাঁড়িয়েছে ১১৬.৪ টাকায়।

ইস্টার্ন ক্যাবল : ১৯৮৬ সালে তালিকাভুক্ত ইস্টার্ন ক্যাবল। ‘এ’ ক্যাটাগরিতে রয়েছে। গতকাল লেনদেন হয়েছে ১০৭.২০ টাকায়। তবে ২ ফেব্রুয়ারি শেয়ারের দাম ছিল ১১৮ টাকা। তবে ৮, ৯ ও ১০ ফেব্রুয়ারি দাম বেড়ে দাঁড়ায় ১২৫ টাকার ঘরে।


মন্তব্য