kalerkantho


কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল হবে নীলফামারীতে

আরিফুর রহমান   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল হবে নীলফামারীতে

বাংলাদেশে গত এক দশকে শিল্প ও সেবা খাতে ব্যাপক বিকাশ ঘটলেও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কাছে কৃষি খাত এখনো প্রধান পেশা। গ্রামীণ মানুষের জীবন-জীবিকা কিংবা কর্মসংস্থান বলতে যা বোঝায়, সব কিছুই কৃষির ওপর নির্ভরশীল। তবে এ খাতে আধুনিকতার ছোঁয়া না লাগায় অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে যায়। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফল এবং সবজি নষ্ট হয়ে যায় সঠিক প্রক্রিয়াজাত এবং সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে। শীতকালে দেশে নানা জাতের সবজি ও ফল উত্পাদিত হলেও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংরক্ষণ পদ্ধতি না থাকায় সেই পণ্য নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফলে কৃষক তাঁর ফসলের ন্যায্যমূল্য পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়। লোকসান গুনতে হয়। এ কারণে অনেকে কৃষির ওপর আস্থা হারিয়ে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছে।

এমন বাস্তবতায় সরকার দেশের উত্তরাঞ্চলে কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। নীলফামারী জেলা সদরে সুবর্ণখুলী ও কাদিখোলা মৌজায় ৩৫৭ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি। এরই মধ্যে সেখানে সমীক্ষার কাজ শুরু হয়েছে। এটি হবে দেশের প্রথম কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অর্থনৈতিক অঞ্চল। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কৃর্তপক্ষ (বেজা) পুরো বিষয়টি তদারকি করছে।

জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রাকৃতিক এবং ভৌগোলিকগত কারণে বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। মোট দেশজ উত্পাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের গুরুত্ব অপরিসীম। এখানে নানা জাতের সবজি ও ফল উত্পাদিত হলেও সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ করতে না পারায় অনেক ফসল নষ্ট হয়ে যায়। আমরা দেশে একটি ব্যতিক্রমধর্মী অর্থনৈতিক অঞ্চল করার পরিকল্পনা করেছি, যেখানে শুধু প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। সে জন্য আমরা উত্তরাঞ্চলের নীলফামারীকেই বেছে নিয়েছি। ’ তিনি বলেন, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে একদিকে অ্যাগ্রো শিল্প গড়ে উঠবে, অন্যদিকে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থাও থাকবে। বাংলাদেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে জানান পবন চৌধুরী।

বেজার কর্মকর্তারা বলছেন, নীলফামারীর জেলা সদরে সুবর্ণখুলী ও কাদিখোলার যে স্থানটিকে কৃষি এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে, সেখানে সরকারের খাস জমি আছে ১০৬ একর। বাকি ২৫১ একর জমি ব্যক্তি মালিকানাধীন। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি অধিগ্রহণে ৬৫ কোটি টাকা লাগবে। তা ছাড়া অর্থনৈতিক অঞ্চল এলাকার সংযোগ সড়ক নির্মাণ, জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সুবিধাসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে এরই মধ্যে ওএফআইডির (ওপেক ফান্ড ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলমেন্ট) কাছে আট কোটি ডলার ঋণ চাওয়া হয়েছে। বাংলদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৬৪০ কোটি টাকা। কর্মকর্তারা বলছেন, ওএফআইডি ফান্ডের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেই সেখানে ঋণের জন্য আবেদন করা হয়েছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল করার জন্য যে টাকা চাওয়া হয়েছে, সেটি পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী বেজার কর্মকর্তারা। চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে অর্থনৈতিক অঞ্চলের প্রাথমিক কাজ শুরু করা হবে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।

নীলফামারীতে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ অর্থনৈতিক অঞ্চলের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানা গেছে, সেখানে থাকবে পাওয়ার টিলার। পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা। থাকবে বীজ বপনের মেশিন। ধান মাড়াইয়ের যন্ত্রসহ কৃষিজাত অন্যান্য প্রক্রিয়াজাত যন্ত্র। আম, কলা, আনারস, লিচুসহ বিভিন্ন ফলের প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা থাকবে অর্থনৈতিক অঞ্চলে। শীতকালীন সবজি টমেটো, ফুলকপি, শিমসহ অন্যান্য পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থাও থাকছে। এসব কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়নে স্থানীয় যাঁরা কৃষক তাঁদেরও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করবে বেজা। বেজার কর্মকর্তারা বলছেন, নীলফামারীতে কৃষি ও খাদ্য প্রক্রিয়াজতকরণ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হলে একদিকে যেমন স্বাস্থ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে খাদ্য নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

২০১৩-১৪ অর্থবছরের এক হিসাবে দেখা গেছে, ওই অর্থবছর বাংলাদেশে ৫২ মিলিয়ন মেট্রিক টন ফল, বিশেষ করে কলা, আম, কাঁঠালসহ অন্যান্য ফল উত্পাদিত হয়েছে। এ ছাড়া সাড়ে ১২ মিলিয়ন মেট্রিন টন সবজি উত্পাদিত হয়েছে। যার মধ্যে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ ফল ও সবজি নষ্ট হয়ে গেছে সঠিক প্রক্রিয়াজাত এবং সংরক্ষণ সুবিধার অভাবে।


মন্তব্য