kalerkantho


সাগরে ছোট জাহাজ সংকট

পণ্য নামাতে লাগছে চার গুণ বেশি সময়

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



পণ্য নামাতে লাগছে চার গুণ বেশি সময়

পণ্য নামাতে বেশি সময় লাগায় বন্দরে বড় জাহাজগুলোকে বাড়তি সময় অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এই বাড়তি ভাড়া যুক্ত হয়ে পণ্যের দাম বাড়ছে। -ছবি : কালের কণ্ঠ

বহির্নোঙরে সাগরে ৩৬ হাজার টন ইউরিয়া সারবাহী ‘মেনালন জাহাজ’ থেকে ছোট জাহাজে পণ্য স্থানান্তর (লাইটারিং) করতে সর্বোচ্চ সময় লাগে ১৫ দিন। কিন্তু সেই জাহাজের সাড়ে ১৯ হাজার টন সার স্থানান্তর করতেই সময় লেগেছে ৪৮ দিন।

এই গতিতে চললে বাকি সার খালাস করতে সময় লাগবে আরো ২০ থেকে ২৫ দিন। অর্থাৎ ১৫ দিনের স্থলে একটি জাহাজের সময় লাগবে ৭৩ দিন।

ইউরিয়া ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সার, গম, চিনি, ছোলা, মটর ডাল, সিমেন্ট ক্লিংকার, কয়লা, জিপসাম, এইচ আর কয়েলসহ খোলা পণ্যের জাহাজের ক্ষেত্রেও একইভাবে চার গুণ বেশি সময় লাগছে।

বহির্নোঙরে বড় জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তরের কাজ করে অপেক্ষাকৃত ছোট জাহাজ (লাইটার জাহাজ)। এই ধরনের ছোট জাহাজ চাহিদা মতো সরবরাহ না পাওয়ায় জাহাজগুলো থেকে পণ্য স্থানান্তরে বাড়তি সময় লাগছে। এতে করে বড় জাহাজগুলোকে বাড়তি সময় অলস বসে থাকতে হচ্ছে। এই বাড়তি ভাড়া যুক্ত হয়ে পণ্যের দাম বাড়ছে, আর জাহাজ ভাড়া বাবদ বাড়তি টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। এতে সাগরে পণ্য স্থানান্তরের কাজে নিয়োজিত শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটরদের দক্ষতাও কমে যাচ্ছে।

এর কারণ হিসেবে শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের ভাইস চেয়ারম্যান এ কে এম সামশুজ্জামান রাসেল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গম, চিনি ও সারবাহী জাহাজ একসঙ্গে এত বেশি আসায় ছোট জাহাজের সংকট তৈরি হয়েছে।

প্রতিদিন একটি জাহাজের বিপরীতে চার-পাঁচটি ছোট জাহাজের চাহিদা থাকলেও তিন দিনে মিলছে মাত্র একটি। এতে করে একই পণ্য স্থানান্তরে আগের চেয়ে চার গুণ বেশি সময় লাগছে। এর ফলে সাগরে পণ্য স্থানান্তর কাজের (লাইটারিং) দক্ষতা অর্ধেকের নিচে নেমেছে। কারণ পর্যাপ্ত শ্রমিক, সব যন্ত্রপাতি তৈরি থাকলেও ছোট জাহাজ না পাওয়ায় বেশির ভাগ সময় আমাদের অলস বসে থাকতে হচ্ছে। ’

আমদানিকারক ও শিপ হ্যান্ডলিং ব্যবসায়ীরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দামে ধস নামায় একসঙ্গে বেশি পণ্য আমদানি করেছে দেশের কয়েকটি বড় আমদানিকারক। তারা এত বেশি পণ্য এনেছে সেগুলো রাখার ধারণক্ষমতা গুদামে নেই, বন্দরের আশপাশে বেসরকারি গুদামেও নেই। ফলে ছোট জাহাজগুলো ভাড়া করে সেগুলোকেই পণ্য রাখার গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছে। এতে করে ছোট জাহাজের সংকট সৃষ্টি হয়েছে।

বহির্নোঙরে শিপ হ্যান্ডলিং অপারেটর এনসিয়েন্ট ট্রেডার্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জসিম উদ্দিন ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একটি বড় জাহাজ নির্দিষ্ট সময় বুকিং নিয়ে বন্দরে আসে। এর বেশি থাকতে হলে দিনে অতিরিক্ত তিন হাজার মার্কিন ডলার পরিশোধ করতে হয়। আর এই অর্থ বৈদেশিক মুদ্রায় দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে। বেশি সময় জাহাজ আটকে থাকায় দেশের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হচ্ছে। ’

ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল জানায়, ‘এ’ এবং ‘বি’ দুই শ্রেণিতে ব্যক্তি মালিকানাধীন এক হাজার ২০০ লাইটার জাহাজ রয়েছে। এর মধ্যে ‘এ’ শ্রেণিতে এক হাজার এবং ‘বি’ শ্রেণিতে ২০০ জাহাজ রয়েছে। প্রতিটি জাহাজে পণ্য ধারণক্ষমতা ৭০০ টন থেকে তিন হাজার টন পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি চাহিদা রয়েছে ‘এ’ শ্রেণির জাহাজের। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের মাধ্যমে এই জাহাজগুলো বরাদ্দ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে সেলের কর্মকর্তা আতাউল করিম রঞ্জু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গতকালও ৩৯টি জাহাজ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। তবে আরো ১০টি জাহাজের চাহিদা ছিল, কিন্তু খালি না থাকায় বরাদ্দ দেওয়া সম্ভব হয়নি। ’

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর লাইটার জাহাজ ঠিকাদার সমিতির সভাপতি হাজি শফিক আহমদ কালের কণ্ঠকে বলেন, “কিছু কিছু আমদানিকারক ছোট জাহাজগুলোকে ‘পণ্যভর্তি ভাসমান গুদাম’ বানিয়ে রাখায় সংকট চলছে। অবস্থা এমন যে অশোধিত চিনিবাহী একটি জাহাজ ৮০ দিন পর্যন্ত সাগরে বসে থাকার রেকর্ড হয়েছে। সংকট বেশি হয়েছে ইউরিয়া সারবাহী জাহাজের ক্ষেত্রে। ”

শফিক আহমদ আরো বলেন, ‘অলস বসে থাকলে ব্যাংক দেনা শোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে জাহাজ মালিকদের। কারণ জাহাজ যত চলাচল করবে, ততই ব্যবসা গতিশীল হবে। দ্রুত পণ্য নামিয়ে জাহাজ খালি করার অনুরোধ করলেও আমদানিকারকদের পক্ষ থেকে খুব বেশি সাড়া মেলেনি। ’

জানা গেছে, বর্তমানে বহির্নোঙরে সাগরে ৫৭টি পণ্যভর্তি জাহাজ রয়েছে। সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ রয়েছে ১৭টি, খাদ্যপণ্য রয়েছে পাঁচটি, সারবাহী জাহাজ রয়েছে সাতটি, সিমেন্ট ক্লিংকার রয়েছে ১৫টি এবং চিনিবাহী জাহাজ রয়েছে চারটি। এর মধ্যে ২৯টি জাহাজ থেকে পণ্য স্থানান্তরের কাজ চলছে, আরো ২৮টি জাহাজ পণ্য স্থানান্তরের অপেক্ষায় বসে আছে। এর মধ্যে কিছু জাহাজ পণ্য স্থানান্তর করে বন্দর চ্যানেলে প্রবেশের উপযোগী হয়ে জেটিতে ভিড়বে। আর কিছু জাহাজ থেকে সরাসরি পণ্য স্থানান্তর হয়ে চট্টগ্রাম উপকূল কিংবা দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাবে।


মন্তব্য