kalerkantho


মিয়ানমারে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মিয়ানমারে বাণিজ্য বাড়ানোর উদ্যোগ

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার দুই দেশের বাণিজ্য পরিধি ছিল ১০০ মিলিয়ন ডলারের। আবার ঢাকা চেম্বার অব কমার্স থেকে পাওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ মিয়ানমারে পণ্য রপ্তানি করেছে ১০৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার, পক্ষান্তরে আমদানি করেছে ৬৭০ কোটি ৩০ লাখ টাকার পণ্য।

দুটি পরিসংখ্যানেই দেখা যায়, প্রতিবেশী দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য পরিধি অত্যন্ত দুর্বল এবং বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বাণিজ্য ঘাটতিও অনেক বেশি। বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়াতে দুই দেশের পক্ষ থেকেই তাই একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স সূত্রে জানা গেছে।

এই পদক্ষেপের অংশ হিসেবেই নৌ প্রটোকল স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশে চট্টগ্রামের সদরঘাট, নারায়ণগঞ্জ, মংলাসহ পাঁচটি নৌ পয়েন্ট চিহ্নিত করার কাজ চলছে। এই নৌবন্দরগুলো থেকে দুই থেকে তিন হাজার টনের ছোট জাহাজ মিয়ানমারের আকিয়াব শহরের সিতওয়ে বন্দরে মালপত্র পরিবহন করবে। নতুন এই নৌ রুট চালু হলে আগামী দুই বছরের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ৫০০ মিলিয়ন ডলারে উন্নীত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যা আগামী ২০২০ সাল নাগাদ এক বিলিয়ন ডলারের উন্নীত করার প্রাথমিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ-মিয়ানমার চেম্বার অব কমার্স লিমিটেডের (বিএমসিসিএল) সভাপতি এস এম নূরুল হক এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দর থেকে সিতওয়ে বন্দরের নৌ দূরত্ব সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার। স্বাভাবিকভাবে এই নৌ রুটটি চালু হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ক অনেক বেশি জোরদার হবে। দুই দেশের মধ্যে পণ্য পরিবহনে সড়কপথের চেয়ে নৌপথ অনেক বেশি সহজ ও কার্যকর হবে। ’

দুই দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণে বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর বার্ষিক আন্তর্জাতিক মেলার ক্যালেন্ডারে এবারই প্রথমবারের মতো একক দেশের বাণিজ্য প্রদর্শনীর জন্য মিয়ানমারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ বছরের সুবিধাজনক সময়ে মিয়ানমারের রাজধানী ইয়াঙ্গুনে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে।

 

বিএমসিসিএল সূত্র জানায়, প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়ানোর অপার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রায় পাঁচ কোটি ১৫ লাখ জনবসতির এই রাষ্ট্রটি দীর্ঘ সময় সামরিক জান্তার শাসনে ছিল। সর্বশেষ নির্বাচনে অং সান সু চির রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিশাল বিজয়ের মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হয়েছে। এর ফলে দীর্ঘদিন ধরে বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন দেশটি আবারও নিজেদের ব্যবসা-বাণিজ্যের দ্বার উন্মুক্ত করতে যাচ্ছে। অপেক্ষা ছিল দেশটির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য।

গত মঙ্গলবার অং সান সু চির ঘনিষ্ঠ সহচর এইচ তিন কিয়াও প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এবার নতুন করে দুই দেশের আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক গতি পাবে বলে জানান বিএমসিসিএল সভাপতি এস এম নূরুল হক। কারণ নতুন গণতান্ত্রিক সরকার দেশে আমদানি-রপ্তানি ও বিনিয়োগে বাড়তি কিছু সুবিধা দেবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘আগামী মে মাস থেকেই আমরা দুই দেশের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাব জোরেশোরে। ইতিমধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এবং মিয়ানমারে দায়িত্বরত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আমাদের কথা হয়েছে। সরকারও চাইছে দুই প্রতিবেশী দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক আরো জোরদার করতে। বিশ্বাস ও আস্থা সৃষ্টির জন্য দুই দেশের প্রতিনিধিদলের সফরের আয়োজন করা হবে। ’

এস এম নূরুল হক বলেন, ‘চীন, জাপান, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড—এমনকি মালয়েশিয়া গণতান্ত্রিক মিয়ানমারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। সেখানে প্রতিবেশী হয়েও আমরা অনেকটা পিছিয়ে আছি। দীর্ঘদিনের পারস্পরিক অবিশ্বাস ও সেনাশাসিত সরকারের কারণে এই দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক স্বাভাবিক ছিল না। তবে ২০১০ সাল থেকে সেই বরফ অনেকটাই গলতে শুরু করেছে। ’

বিএমসিসিএল সূত্র জানায়, মিয়ানমারের ওষুধশিল্প মূলত আমদানিনির্ভর। সোয়া পাঁচ কোটি মানুষের দেশে প্রায় চার বিলিয়ন ডলারের ওষুধের মার্কেট রয়েছে। মূলত থাইল্যান্ড ও চীন থেকে তাদের এই ওষুধ আসে। বাংলাদেশ যেহেতু ওষুধে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকা মহাদেশের একাধিক দেশে বাংলাদেশের ওষুধ রপ্তানি হয়। সেখানে প্রতিবেশী দেশ হিসেবে মিয়ানমারে ওষুধ রপ্তানির ভালো সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ থেকে বর্তমানে মিয়ানমারে হিমায়িত খাদ্য, কৃষিপণ্য, ওষুধ, চামড়া, পাটজাত পণ্য, নিটওয়্যার এবং ওভেন পণ্য রপ্তানি হয়।

এ ছাড়া গার্মেন্টশিল্পে বিনিয়োগের জন্য তো বাংলাদেশের অনেক বড় গার্মেন্ট গ্রুপ তো দীর্ঘদিন ধরেই মিয়ানমারকে নজরে রেখেছে। তাদের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্যতা আর সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ভবিষ্যতের মিয়ানমারের চিন্তা মাথায় রেখে ইতিমধ্যে দেশের অন্যতম বৃহৎ পোশাক ব্যবসায়ী গ্রুপ প্যাসিফিক জিন্স, ফোর এইচ গ্রুপ, চট্টগ্রাম ইপিজেডের ইয়ানওয়ান গ্রুপ এবং কেনপার্ক লিমিটেড তাদের প্রতিনিধিদল মিয়ানমারে পাঠিয়ে জরিপ চালিয়েছে। এর বাইরেও ঢাকা ও চট্টগ্রামের আরো অনেক তৈরি পোশাক ব্যবসায়ী ব্যক্তিগত উদ্যোগে মিয়ানমারে গিয়েছে। এ ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে গেছে ফোর এইচ গ্রুপ। তারা ইতিমধ্যে মিয়ানমারে কারখানা স্থাপনের কাজ শুরু করেছে বলে দায়িত্বশীল সূত্র নিশ্চিত করেছে।

চট্টগ্রাম ইপিজেডের জাপানি প্রতিষ্ঠান অপ-সিড কম্পানি (বিডি) লিমিটেডও মিয়ানমারে একটি কারখানা স্থাপনের কথা নিশ্চিত করেছেন প্রতিষ্ঠানের পরিচালক আতাউল হক। যোগাযোগব্যবস্থার সুবিধার কারণেই মিয়ানমারে এই কারখানা স্থাপন করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।

তবে মিয়ানমারে গার্মেন্টশিল্পে বিনিয়োগের এখনো সময় আসেনি বলে মন্তব্য করেছেন বিজিএমইএ পরিচালক এবং প্যাসিফিক জিন্স লিমিটেডের পরিচালক সৈয়দ মোহাম্মদ তানভীর। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমারে এখনো গার্মেন্টশিল্পে বিনিয়োগ উপযোগী হয়ে ওঠেনি। কারণ সেখানে জমির মূল্য ইতিমধ্যেই বেড়ে গেছে। শ্রমিকরাও বাংলাদেশের তুলনায় কম দক্ষ। কিন্তু মজুরি বাংলাদেশের চেয়ে ক্ষেত্রবিশেষে বেশি। এ ছাড়া তাদের জীবনমানও বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। চীন কিংবা অন্য দেশগুলোর জন্য হয়তো এটা বিনিয়োগ উপযোগী। কারণ তাদের মজুরি কাঠামো ও উত্পাদন ব্যয় অনেক বেশি। ’

তবে সেখানকার নতুন গণতান্ত্রিক সরকার যদি বিদেশি বিনিয়োগে বাড়তি প্রণোদনা এবং ইপিজেডের মতো বিশেষ কোনো অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলে তাহলে হয়তো সেখানে বিনিয়োগের চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে বলে তিনি মত দেন।


মন্তব্য