kalerkantho


ব্যাংক ঋণে বিশেষ ছাড়ে গতি পাচ্ছে আবাসনশিল্প

রাশেদুল তুষার, চট্টগ্রাম   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ব্যাংক ঋণে বিশেষ ছাড়ে গতি পাচ্ছে আবাসনশিল্প

অনেক দিন ধরেই নিজের একটি স্থায়ী ঠিকানার স্বপ্ন দেখে আসছেন চট্টগ্রাম ইপিজেডে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সহকারী ব্যবস্থাপক মাসুদ আলম। কিন্তু ফ্ল্যাটের আকাশচুম্বী মূল্য আর নিজের স্বাধ্য দুটো এক বিন্দুতে মিলিত না হওয়ার কারণে ইচ্ছেটি স্বপ্নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল এত দিন।

কিন্তু সেই স্বপ্নকেই এবার বাস্তবায়নের সুযোগ এনে দিয়েছে আবাসন খাতে লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। বিশেষ করে চট্টগ্রামে সম্প্রতি শেষ হওয়া আবাসন মেলায় ফ্ল্যাট কিনতে ইচ্ছুকদের জন্য কিছু চমকপ্রদ অফার নিয়ে এসেছিল একাধিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান। লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর এই অফার দীর্ঘদিন ঝিমিয়ে থাকা আবাসনশিল্পেও গতি ফিরিয়ে এনেছে বলে মনে করছেন এই শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা। তবে এ ক্ষেত্রে প্লটের চেয়ে ফ্ল্যাটকেই বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো।

চট্টগ্রামের র‌্যাডিসন ব্লু বে ভিউ হোটেলে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি শেষ হওয়া চার দিনের রিহ্যাব আবাসন মেলায় প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বেশি ফ্ল্যাটের বুকিং পাওয়া গেছে বলে রিহ্যাব সূত্র জানায়। আগেরবার যেখানে ১৫০ কোটি টাকার ফ্ল্যাট বুকিং হয়েছিল, এবার তা বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ হওয়ার মূলেই রয়েছে ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ‘সিঙ্গেল ডিজিট’ ঋণ সুবিধা।

রিহ্যাব মেলায় সাতটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান অংশ নিয়েছিল। সেগুলো হলো ইস্টার্ন ব্যাংক, মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক, স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক, এফএএস ফিন্যান্স, ডিবিএইচ, লঙ্কাবাংলা ফিন্যান্স ও আইপিডিসি। প্রতিষ্ঠানগুলো ধরন ভেদে সুদের হার ৮.৯৯ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১১.৯০ শতাংশ পর্যন্ত সীমাবদ্ধ রেখেছে এবার।

কিন্তু ছয় মাস আগেও আবাসন ঋণে সুদের পরিমাণ ১০.৫০ থেকে সর্বোচ্চ ১৩.৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।

মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ফ্ল্যাট গ্রাহকদের জন্য দুই ভাগে আবাসন ঋণ দিচ্ছে। এর মধ্যে পরিবর্তনশীল (ভেরিয়েবল) ঋণ ৯.৭৫ শতাংশ হারে এবং ফিক্সড ঋণ ১১.৯০ শতাংশ হারে। এর সঙ্গে প্রসেসিং ফি ১.২৫ শতাংশ। ফ্ল্যাটের মোট দামের ৭০ শতাংশ ব্যাংক পরিশোধ করবে বলে জানিয়েছেন ব্যাংকটির এফএভিপি বিশ্বজ্যোতি সেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের ব্যাংক সর্বোচ্চ এক কোটি ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত হোম লোন দেবে। গ্রাহকরা এই ঋণ পরিশোধের জন্য সর্বোচ্চ ২৫ বছর সময় পাবে। ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে রিহ্যাব সদস্যদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। ’ স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংক (এসসিবি) ব্যাংকও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ এক কোটি ২০ লাখ টাকা ঋণ দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে এসসিবির ঋণ ৯.৫ শতাংশ। এর সঙ্গে চিকিৎসকদের জন্য এক শতাংশ এবং অন্য পেশার জন্য দেড় শতাংশ প্রসেসিং ফি কার্যকর হবে বলে জানালেন ব্যাংকটির রিলেশনশিপ ম্যানেজার দীপন কান্তি সুশীল। তবে টেকওভার লোনের ব্যাপারেই বেশি খোঁজখবর নিচ্ছে গ্রাহকরা। কারণ এই ঋণের ক্ষেত্রে সুদের হার মাত্র ৮.৯৯ শতাংশ। এর বাইরে প্রসেসিং কিংবা অন্য কোনো গোপন চার্জ নেই।

লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্যাংকে অনেক অলস টাকা পড়ে রয়েছে। তারা বিনিয়োগকারী খুঁজছে, কিন্তু বিনিয়োগকারী পাওয়া যাচ্ছে না। তাই আবাসন খাতকে তারা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ মনে করে এ খাতে সুদের হার কমিয়ে অলস টাকার বিনিয়োগ করতে চাচ্ছে। এতে গ্রাহকরা যেমন লাভবান হবে, তেমনি ব্যাংকগুলোও তাদের অলস টাকা কাজে লাগাতে পারবে। আর এই দুইয়ের কার্যকারিতায় গতি পাবে আবাসন খাত। এ বিষয়ে ইস্টার্ন ব্যাংকের সহযোগী রিলেশনশিপ ম্যানেজার হাজ্জাজ মাহমুদ বলেন, ‘আমরা বিনিয়োগের জন্য আবাসন খাতটিকে নিরাপদ ভাবছি। কারণ ঋণ দিলেও ফ্ল্যাটটি আমাদের কাছে বন্ধক থাকবে। তাই কোনো কারণে ঋণগ্রহীতা ডিফল্ট হলেও টাকা আদায়ে কোনো সমস্যা হবে না। এ জন্য আমরা প্লট কেনার পরিবর্তে ফ্ল্যাট কেনায় ঋণ দিতে উৎসাহী। আর আমাদের ঋণে সুদের হার ৯.৯৯ শতাংশ। ’ তবে ঋণের ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত বেশি সুবিধা দিচ্ছে ডেল্টা ব্র্যাক হাউজিং ফিন্যান্স করপোরেশন লিমিটেড (ডিবিএইচ)। ডিবিএইচের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাড়ি নির্মাণের ক্ষেত্রে তারা ৯.৫ শতাংশ হারে ও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়ে থাকে। এর সঙ্গে প্রসেসিং ফি বাবদ দিতে হবে মাত্র ০.৫ শতাংশ। রিহ্যাব সদস্যদের ক্ষেত্রে পাইলিং অবস্থায়ও ঋণ দেওয়া হবে বলে জানালেন ডিবিএইচের সিনিয়র মার্কেটিং অফিসার নির্মল চন্দ্র দাশ। তবে অন্যদের ক্ষেত্রে কেবল রেডি ফ্ল্যাটেই সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ ঋণ দেওয়া হবে। চাকরিজীবীর ক্ষেত্রে যাদের মোট বেতন ৩০ হাজার টাকা তারাই আবাসন ঋণের জন্য আবেদন করতে পারবে। অন্যদের তুলনায় ডিবিএইচের সুদের হার কম কেন এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমাদের যেহেতু একটাই পণ্য, তাই অন্যদের তুলনায় ডিবিএইচের কিছুটা বাড়তি সুবিধা রাখতেই হচ্ছে। এ ছাড়া আমাদের এফডিআর সুদের পরিমাণ কম, এ কারণে আমরা কম সুদেই ঋণ দিতে পারছি। ’

কম সুদে ব্যাংক ঋণের কারণে এবারের মেলায় ইতিবাচক সাড়া পাওয়া গেছে উল্লেখ করে রিহ্যাব চট্টগ্রামের চেয়ারম্যান প্রকৌশলী এস এম আবু সুফিয়ান বলেন, ‘আর্থিক লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান যখন সুদের হার কমিয়েছে এতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আবাসন খাতে প্রভাব পড়বেই। আর সেই প্রভাবের চিত্র আমরা ঢাকা রিহ্যাব ফেয়ার ও কাতার রিহ্যাব ফেয়ারে দেখেছি। এবারের চট্টগ্রাম রিহ্যাব ফেয়ারেও দর্শনার্থীদের ব্যাপক সাড়া প্রমাণ করে সুদের হার কমে যাওয়াই এর কারণ। এখন মানুষ ফ্ল্যাট কিনতে চায়। আর যেহেতু সহজ শর্তে এবং কম সুদে ফ্ল্যাটের মোট দামের ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ ব্যাংক থেকেই পাওয়া যাচ্ছে, তাই মধ্যবিত্ত এবং উচ্চ মধ্যবিত্তদের পক্ষে ফ্ল্যাট কেনা এখন আর বিলাসিতা নয়। ’


মন্তব্য