kalerkantho

বুধবার । ১৮ জানুয়ারি ২০১৭ । ৫ মাঘ ১৪২৩। ১৯ রবিউস সানি ১৪৩৮।


শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন ড. আতিউর

নিজস্ব প্রতিবেদক   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শিক্ষকতায় ফিরে যাবেন ড. আতিউর

রাজধানীর গুলশান গভর্নর হাউসে এক সংবাদ সম্মেলনে কথা বলছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সদ্য বিদায়ী গভর্নর ড. আতিউর রহমান। ছবি : কালের কণ্ঠ

ড. আতিউরের পদের মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা আগামী ২ আগস্ট। মেয়াদপূর্তির সাড়ে চার মাস আগেই বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ চুরির ঘটনা প্রতিহত করার ব্যর্থতার দায় নিয়ে গভর্নরের পদ থেকে সরে গেলেন তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র জমা দেন এবং দুপুরে গুলশানের বাসভবনে (গভর্নর হাউস) এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংককে আমি আমার সন্তানের মতো দেখেছি। আমি তিলে তিলে খনি শ্রমিকের মতো ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ গড়ে তুলেছি। সেই ডলার হারিয়ে যাবে আমার অবহেলায় তা বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হয়। ’

ড. আতিউর রহমান আরো বলেন, ‘আমি স্বেচ্ছায়, নৈতিক দায়িত্ববোধ নিয়ে পদত্যাগ করেছি। আমি চাই যারা এই ঘটনার (রিজার্ভ চুরির ঘটনা) সঙ্গে জড়িত, দেশে কিংবা বিদেশে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেওয়া হোক। ’

ড. আতিউর বলেন, ‘আমি যখন চলে যাচ্ছি তখন টাকা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে। প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ব্যাংকিং সেবা নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। যারা ব্যাংক সেবা থেকে বঞ্চিত, যাদের দিকে কেউ তাকায় না, তাদের কাছে অর্থ কী করে নেওয়া যায়, সেই চেষ্টা আমি করেছি। পুরোপুরি সফল হয়েছি আমি বলব না, কিন্তু নতুন ধারার একটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালু করার চেষ্টা করেছি। সারা পৃথিবী এখন বাংলাদেশ ব্যাংককে মডেল হিসেবে গ্রহণ করে। ’

ড. আতিউর বলেন, ‘সবচেয়ে বেশি সহযোগিতা পেয়েছি বেসরকারি ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে। এই খাতের ব্যাংকগুলো অনেকেই নতুন, তার পরও তারা যেভাবে কাজ করেছে, তাতে এ খাতের ব্যাংকগুলোর জন্য আমি আসলেও গর্বিত। ’ ড. আতিউর বলেন, ‘রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে সমস্যা আছে। আশা করব সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর দিকে বিশেষ নজর দেবে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো যেন ব্যক্তি খাতের ব্যাংকগুলোর মতো চলতে পারে সে রকম সুবিধা দেবে। প্রয়োজনে বাংলাদেশ ব্যাংকের হাতে আরো বেশি করে ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোকে পরিচালনার সুযোগ সরকার করে দেবে। ’

ড. আতিউর বলেন, ‘এটা এমন এক সাইবার আক্রমণ, যেটা কোথা থেকে এসেছে, কেমন করে এসেছে, তা আমরা এখনো পুরোপুরি জানি না। এটুকু বোঝা যাচ্ছে, এটা উচ্চ প্রযুক্তির একটি সাইবার আক্রমণ। এটা অনেকটা সন্ত্রাসী হামলার মতো একটি ঘটনা। আমরা প্রথমে বুঝে উঠতে পারিনি। আক্রমণের পরপরই আমরা ব্যাংকটাকে আগে নিরাপদ করার চেষ্টা করি এবং যে টাকা হাতছাড়া হয়ে গেছে সেটা ফেরত আনার চেষ্টা করি। পরিস্থিতি খানিকটা নিয়ন্ত্রণে আনার পর আমরা সরকারকে জানাই। অর্থমন্ত্রীকে আমি লিখিত দিয়েছি। প্রধানমন্ত্রীকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছি। ’

ড. আতিউর বলেন, ‘এখন আমি মনে করি, যে ধরনের ফায়ারওয়াল আমরা স্থাপন করতে পেরেছি বাংলাদেশ ব্যাংকে এবং ভবিষ্যতে যে কাজগুলো করব বলে পরিকল্পনা নিয়ে আসছিলাম, আমার উত্তরসূরি নিশ্চয়ই সেই কাজগুলো করবেন। পুরো ব্যাংকিং খাতটাকে নিরাপদ করবেন। ’

সদ্য বিদায়ী গভর্নর বলেন, “যেহেতু প্রধানমন্ত্রী আমাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন, সেই কারণে তাঁর হাতেই আমি আমার পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছি। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘আমাদের দেশে তো এ রকম সংস্কৃতি খুব বেশি নেই যে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করে। আপনি আরেকটি অনন্য দৃষ্টান্ত উপস্থাপন করলেন। আপনি একজন সাহসী মানুষ। আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। ’ এরপর আর কী চাইতে পারি। আমি এই মাটির সন্তান। আমি একজন ভূমিপুত্র। আমি সেখান থেকে এই জায়গায় এসেছি। আমি বিধাতার কাছে খুবই কৃতজ্ঞ। ”

রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা প্রকাশের পরপরই দিল্লি যাওয়ায় গভর্নরকে নিয়ে অনেক সমালোচনা হয়। এ বিষয়ে ড. আতিউর বলেন, ‘আমি দিল্লিতে গিয়েছিলাম ভারতের অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলির নিমন্ত্রণে, আইএমএফের ক্রিস্টেন লাগার্দের নিমন্ত্রণে। মাত্র দুই দিন বাইরে ছিলাম। আর দুই দিন ছুটি ছিল। সেখানে বসেও আমি অনলাইনে কাজ করেছি। সুতরাং এটাকে বড় একটা ঘটনা ঘটানোর মতো পটভূমি করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। যাই হোক, যেটা হয়ে গেছে হয়ে গেছে। আমি অর্থমন্ত্রীর কাছেও কৃতজ্ঞ, তিনি সহযোগিতা না করলে হয়তো আমাদের কাজ আরো কষ্টার্জিত হতো। আমি তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই। ’

গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগের পর আবার শিক্ষকতা পেশায় ফিরে যাওয়ার পরিকল্পনা ব্যক্ত করেছেন ড. আতিউর। গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে দীর্ঘ সাত বছরে বেশ কিছু ভালো উদ্যোগ নিয়েছিলেন ড. আতিউর। মাত্র ১০ টাকায় কৃষকদের ব্যাংক হিসাব খোলার সুযোগ করে দিয়েছেন। গ্রিন ব্যাংকিং চালু করে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নে ব্যাংকগুলোকে উদ্বুদ্ধ করেছেন। ব্যাংক খাতে তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য মোবাইল ব্যাংকিং, ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচ চালু, ইলেকট্রনিক পেমেন্ট গেটওয়ে চালু, আরটিজিএস বাস্তবায়নসহ অনেক ধরনের উদ্যোগ নিয়েছেন ড. আতিউর।

তবে এ কথাও সত্য যে ড. আতিউরের আমলেই ব্যাংক খাতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় আর্থিক কেলেঙ্কারিগুলো ঘটেছে। তাঁর সময়েই হলমার্ক, বিসমিল্লাহ টাওয়েলসের মতো আর্থিক কেলেঙ্কারি ঘটেছে। বেসিক ব্যাংকের আর্থিক অনিয়মও ঘটেছে। কয়েক দিন আগে ঘটে গেল এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস কেলেঙ্কারি। সর্বশেষ খোদ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভ থেকেই খোয়া গেল ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার। আর সেই দায় কাঁধে নিয়েই গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ালেন ড. আতিউর রহমান।

ড. আতিউর রহমান ২০০৯ সালের ১ মে দশম গভর্নর হিসেবে চার বছরের জন্য ব্যাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাল ধরেন। ২০১৩ সালের এপ্রিলে মেয়াদ শেষ হলে আরো তিন বছর মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৬ সালের ২ আগস্ট পর্যন্ত (৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত) তাঁকে গভর্নরের পদে বহাল রাখা হয়।

যত দূর জানা যায়, ড. আতিউরই প্রথম গভর্নর পদ থেকে পদত্যাগ করলেন। এ বিষয়ে সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এর আগে কোনো গভর্নর পদত্যাগ করেছেন কি না আমার জানা নেই। তবে আমি, ফরাসউদ্দিন সবাই মেয়াদ পূর্তি করেই বিদায় নিয়েছি। ’


মন্তব্য