kalerkantho


অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা

দরকষাকষিতে বসছে বাংলাদেশ-ভারত

আরিফুর রহমান   

১৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



দরকষাকষিতে বসছে বাংলাদেশ-ভারত

বাংলাদেশে পণ্য উত্পাদন করে সেই পণ্য সেভেন সিস্টার্স খ্যাত সাতটি অঙ্গরাজ্যে (আসাম, মিজোরাম, ত্রিপুরা, মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মণিপুর ও অরুণাচল) কম খরচে নিয়ে যেতে দীর্ঘদিন ধরে এ দেশে দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার আগ্রহ জানিয়ে আসছিল ভারত। গত বছর জুনে দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ঢাকা সফরে বাগেরহাটের মংলায় এবং কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে দুই দেশের মধ্যে চুক্তি সই হয়।

কিন্তু অর্থনৈতিক অঞ্চল দুটি কিভাবে বাস্তবায়িত হবে; কিংবা সেখানে দুই দেশের কার কী পরিমাণ শেয়ার থাকবে সে বিষয়ে মোদির সফরে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।

চুক্তির ৯ মাস পর আগামী ২২ মার্চ অর্থনৈতিক অঞ্চল বাস্তবায়নের কৌশল ঠিক করতে দুই দেশের উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় বৈঠকে বসতে যাচ্ছে। বৈঠকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন। অন্যদিকে ভারতের পক্ষে দেশটির বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও এক্সিম ব্যাংকের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) সূত্রে জানা গেছে, ভারতের বিনিয়োগকারীদের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করতে সরকার এরই মধ্যে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পদ্মা নদীর পাশে ৪০৭ একর এবং বাগেরহাটের মংলায় ১১০ একর জমি ঠিক করেছে। ওই দুই অর্থনৈতিক অঞ্চলের ভূমি উন্নয়ন, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন, সংযোগ সড়ক, ছোট সেতু ও কালভার্টসহ অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে বাংলাদেশ সরকারকে ৯ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে ভারত। বাংলাদেশি মুদ্রায় যার পরিমাণ প্রায় ৭০০ কোটি টাকা। ভারত সরকার জানিয়েছে, দ্বিতীয় দফায় তারা বাংলাদেশকে যে ২০০ কোটি ডলার ঋণ দিচ্ছে, সেই ঋণের আওতায় এই টাকা দেওয়া হবে। এই ঋণের সুদের হার হবে ১ শতাংশ।

পাঁচ বছর গ্রেস পিরিয়ডসহ ২০ বছরে বাংলাদেশ এই ঋণ পরিশোধ করতে পারবে। গ্রেস পিরিয়ডের সময় সুদ গুনতে হবে না। এরপর থেকে মূল টাকার পাশাপাশি সুদ পরিশোধ শুরু করতে হবে। এ ঋণে কমিটমেন্ট ফি ধরা হয়েছে .৫০ শতাংশ। আর নির্ধারিত সময়ে ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে বাড়তি ২ শতাংশ দণ্ড হিসাবে সুদ পরিশোধ করতে হবে বাংলাদেশকে।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২২ মার্চ দুই দেশের যৌথ ওয়ার্কিং বৈঠকে অর্থনৈতিক অঞ্চল কিভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং ঋণের অর্থ কিভাবে খরচ করা হবে সেসব বিষয়ে আলোচনা হবে। এর পাশাপাশি দুই অর্থনৈতিক অঞ্চলে দুই দেশের কী পরিমাণ শেয়ার থাকবে, সেসব বিষয় নিয়েও আলোচনা হবে। ’

সূত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চীন যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি করতে যাচ্ছে, সেখানকার অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটি বাংলাদেশকে ১০ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। কিন্তু ভারত সরকার জানিয়েছে, তারা অনুদান নয়, অবকাঠামো উন্নয়নে ৯ কোটি ডলার ঋণ দেবে। সরকারের প্রত্যাশা ছিল, ভারত সরকারও অনুদান দেবে। কর্মকর্তারা বলছেন, অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটি যেহেতু অনুদান দেবে না, তাই ঋণ নিয়েই এখন অবকাঠামো উন্নয়ন করতে হবে। ফলে এ দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য বাংলাদেশ সরকারকে সুদ গুনতে হবে।

জানা গেছে, ২২ মার্চের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে মূলত ঋণের অর্থ বাংলাদেশ কিভাবে খরচ করবে এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল কিভাবে গড়ে উঠবে তার একটি গাইডলাইন চূড়ান্ত হবে।

ভারতের দেওয়া ৯ কোটি ডলার ঋণ কোথায় কোথায় খরচ করা হবে তার একটি ধারণাপত্র তৈরি করেছে বেজা। সেখানে কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধানাগার নির্মাণেই খরচ হবে ২৬০ কোটি টাকা। এ ছাড়া সংযোগ সড়ক নির্মাণ করতে খরচ হবে ১০০ কোটি টাকা। এ ছাড়া ভূমি উন্নয়নে ১৫০ কোটি, প্রশাসনিক ভবন নির্মাণে ২৩ কোটি, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণে ১৫ কোটি এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ দিতে ৫০ কোটি টাকা খরচ হবে।

বেজার এক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যে পণ্য নিয়ে যেতে অনেক সময় লেগে যায়। অন্যদিকে পরিবহন খরচও বেশি লাগে। সময় এবং খরচ কমাতে দেশটি বাংলাদেশে দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করবে। সেখানে ভারতীয় উদ্যোক্তারা পণ্য উত্পাদন করে সেই পণ্য তাদের দেশে নিয়ে যাবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে বলে জানান তিনি।

গত বৃহস্প্রতিবার ভারতের এক্সিম ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ সরকারের ২০০ কোটি ডলারের ঋণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। এ ২০০ কোটি ডলার ঋণের আওতায় মোট ১৪টি প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, যার মধ্যে দুই অর্থনৈতিক অঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পটি রয়েছে। ঋণ চুক্তি হওয়ায় প্রকল্পটি দ্রুত একনেক সভায় অনুমোদন পাবে। এরপর শুরু হবে অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ।


মন্তব্য