সুযোগের অভাবে চালাতে পারছেন না জাহাজ-333347 | শিল্প বাণিজ্য | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


সুযোগের অভাবে চালাতে পারছেন না জাহাজ

শিমুল নজরুল ও আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সুযোগের অভাবে চালাতে পারছেন না জাহাজ

জাহাজ চালানোর জন্য সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ডিগ্রি, সফলভাবে প্রশিক্ষণ—সবই নিয়েছেন দেশের নারী মেরিন ক্যাডেটরা। পরীক্ষামূলকভাবে সমুদ্রগামী জাহাজ চালানোর সক্ষমতাও অর্জন করেছেন এই অদম্য নারীরা। পারদর্শী হওয়ার পরও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় এই নারীরা জাহাজ চালিয়ে দেখানোর সুযোগ পাচ্ছেন না। এ ধরনের নারী ক্যাডেটের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ জন। এক বছরে এই সংখ্যা বেড়ে ৫৪-তে দাঁড়াবে।

একই সক্ষমতা অর্জন করলেও পুরুষরা দেশি-বিদেশি জাহাজে চাকরির সুযোগ পাচ্ছেন, বঞ্চিত হচ্ছেন নারীরা। দেশি-বিদেশি জাহাজ কম্পানি বিভিন্ন অজুহাতে কেউ তাঁদের চাকরিতে নিতে চাইছে না।

ক্ষুব্ধ ও হতাশ কণ্ঠে মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা প্রথম ব্যাচের নারী ক্যাডেট সালমা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারের নিশ্চয়ই পরিকল্পনা ছিল না আমরা পাস করলে কোথায় চাকরি করব। থাকলে আমাদের এই করুণ অবস্থা হতো না। ভর্তি করানোর আগে এটি বললেই হতো।’

শিপিংসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, সমুদ্রগামী জাহাজে মেরিন অফিসার ও ইঞ্জিনিয়ার তৈরির সর্বোচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হচ্ছে বাংলাদেশ মেরিন একাডেমি। প্রতিবছর সেখান থেকে ৩০০ জন ডিগ্রি অর্জন করলেও এত দিন নারী ক্যাডেট ভর্তির সুযোগ ছিল না। ২০১২ সাল থেকে বাংলাদেশে প্রথম ব্যাচে ১৬ জন নারী ক্যাডেট ভর্তি করা হয় মেরিন একাডেমিতে। এরপর দ্বিতীয় ব্যাচে ১৯ জন, তৃতীয় ব্যাচে ১৩ জন ভর্তি হয়। এরপর চতুর্থ ব্যাচে ছয়জন ভর্তি হওয়ার পর গত বছর থেকে আর কোনো নারী ক্যাডেট ভর্তি হয়নি। চারটি ব্যাচে মোট ৫৪ জন নারী ক্যাডেট ভর্তি হলেও চাকরির সুবিধা নিশ্চিত না হওয়ায় চতুর্থ ব্যাচ থেকে আর কোনো নারী ক্যাডেট ভর্তি হয়নি। এর কারণ জানতে চাইলে মেরিন একাডেমির কমান্ড্যান্ট সাজিদ হোসাইন বলেন, ‘অনেক নারী প্রার্থী ভর্তি পরীক্ষা দিলেও বিভিন্ন ধাপে তিন নারী কর্মী উত্তীর্ণ হয়। কিন্তু শেষ ধাপে মানদণ্ডে উন্নীত না হওয়ায় তারাও বাদ পড়ে। ফলে ভর্তি হয়নি সেটি বলা যাবে না।’

 

ক্যাডেটরা জানান, মেরিন একাডেমি থেকে দুই বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রি নেওয়ার পর সমুদ্রগামী জাহাজে এক বছরের প্রশিক্ষণ (সি টাইম) নিতে হয়। এরপর সরকারি সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরে পরীক্ষা দিয়ে জুনিয়র অফিসার হিসেবে সনদ অর্জন করতে হয়। এর পরই তাঁরা জাহাজ চালানোর মূল পেশায় যোগ দেন। এই সময়ে তাঁর প্রতি মাসে বেতন দুই হাজার থেকে দুই হাজার ৫০০ ইউএস ডলার। এরপর বিভিন্ন পেশাগত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ এবং দক্ষতার সঙ্গে জাহাজ চালানোর পর ৮-১০ বছরের মধ্যে জাহাজের ক্যাপ্টেন বা চিফ ইঞ্জিনিয়ার হন। তখন তাঁর বেতন হয় সাত হাজার থেকে ১০ হাজার ডলার।

জানা গেছে, মেরিন একাডেমি থেকে পাস করা ক্যাডেটরা এক বছরের জন্য যেকোনো সমুদ্রগামী জাহাজে হাতে-কলমে জাহাজ চালানোর প্রশিক্ষণের (সি টাইম) নিয়ম রয়েছে। বাংলাদেশে বেসরকারি জাহাজ কম্পানিগুলো পুরুষদের সেই সুবিধা দিলেও দিচ্ছে না নারী ক্যাডেটদের। এ ক্ষেত্রে জাহাজ কম্পানিগুলো নারীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) এগিয়ে এসে সেই কাজটি করার সুযোগ দিচ্ছে। যদিও বিএসসির বহরে এখন জাহাজের সংখ্যা কমে মাত্র পাঁচটিতে ঠেকেছে। এর পরও বিএসসি গত দুই বছরে ৩০ নারী ক্যাডেটকে জাহাজ চালানোর এক বছরের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তবে বিএসসির বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, প্রশিক্ষণের সময় তারা নারী ক্যাডেটদের ভাতা দিচ্ছে না। এ বিষয়ে বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর হাবিবুর রহমান ভূইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতি জাহাজে দুজন করে নারী ক্যাডেট প্রশিক্ষণের সুযোগ থাকলেও এখন বিএসসির জাহাজের সংখ্যা কমে পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে। প্রতি জাহাজে সর্বোচ্চ আমরা দুজন নিতে পারি, কিন্তু প্রথম নারী ক্যাডেটদের এই পেশায় উৎসাহিত করা এবং কর্মক্ষেত্রের বিষয়টি মাথায় রেখে প্রতি জাহাজে ছয় থেকে আটজনকে প্রশিক্ষণের সুযোগ দিচ্ছি। আমাদের জাহাজ বেশি থাকলে আরো বেশি প্রশিক্ষণের সুযোগ পেতেন নারীরা।’

জানা গেছে, বাংলাদেশি মালিকানাধীন সমুদ্রগামী জাহাজের সংখ্যা বর্তমানে ৪৭টি। এগুলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য পরিবহনের কাজ করছে। সেখানে বাংলাদেশি পুরুষ ক্যাডেটরা কাজ করলেও কোনো নারী ক্যাডেটের স্থান হয়নি। এর কারণ জানতে চাইলে সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর জাকির রহমান ভূইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তাদের চাকরি দিতে সমুদ্রগামী জাহাজ মালিকদের সঙ্গে আমরা দুবার মিটিং করেছি; কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। যদিও সেই মিটিংয়ে সব জাহাজ মালিকরা উপস্থিত ছিলেন না।’ নারীদের চাকরির বিষয়টি পরিকল্পনায় না নিয়ে কেন ভর্তি করা হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, সেই সময় আমি ছিলাম না। আগে পরিকল্পনা নিলে হয়তো এই অবস্থা হতো না। তবে মেরিন একাডেমিই সেটি ভালো বলতে পারবে।

এ বিষয়ে মেরিন একাডেমির সাজিদ হোসাইনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে জানতে চাইলে আমি অফিশিয়ালি কোনো মন্তব্য করবে না। আপনি অফিসে আসেন, লিখিত প্রশ্ন দেন। তার উত্তর দেব। এরপর তিনি ফোন বিচ্ছিন্ন করে দেন।

জানা গেছে, সমুদ্র পেশায় নারীদের আগ্রহী ও উৎসাহিত করার জন্য ভারত সরকার ৫০ শতাংশ হ্রাসকৃত ফি এবং ন্যূনতম বয়সের ক্ষেত্রে দুই বছর শিথিল করেছে। ফলে ভারতে নৌ প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নারী ক্যাডেটদের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে।

সরকারি ন্যাশনাল মেরিটাইম ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ও শিপিং মাস্টার ক্যাপ্টেন ফয়সাল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্লু ইকোনমিতে প্রবেশের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নারীদের সমানভাবে অগ্রণী ভূমিকা রাখার পরিকল্পনা নিতে হবে এখনই।

মন্তব্য