kalerkantho

শনিবার । ৩ ডিসেম্বর ২০১৬। ১৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ২ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


নারীর পথচলা সহজ হলে বদলে যাবে অর্থনীতি

ফারজানা লাবনী   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নারীর পথচলা সহজ হলে বদলে যাবে অর্থনীতি

সামাজিক কুসংস্কার, লিঙ্গবৈষম্যসহ নানা প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও গত দুই দশকে এগিয়েছে এ দেশের নারীরা। ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে শুরু করে ব্যাংক-বীমা, করপোরেট হাউস—সব ক্ষেত্রেই নারীর সাফল্য চোখে পড়ার মতো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রায় পুরুষ যে মসৃণ পথটি পায়, নারী তা পায় না। সামাজিক নানা প্রতিবন্ধকতা তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখে। তাই নারীর চলার পথ যদি আরো সহজ করা যায় তাহলে এ দেশে পুরুষের চেয়ে নারী কোনো অংশেই পিছিয়ে থাকবে না; এগিয়ে যাবে সমান তালে, যার ইতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও আজ ৮ মার্চ পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। বিভিন্ন আয়োজনের মধ্য দিয়ে এদিন নারীর কৃতিত্ব তুলে ধরছে বিভিন্ন সংগঠন ও সংস্থা। তাদের মতে, নারীর অধিকার রক্ষায় একটি দিনের শপথ যথেষ্ট নয়; প্রতিদিনই নারীকে তার অধিকার রক্ষার সংগ্রামে যুদ্ধ করতে হয়। ছিনিয়ে নিতে হয় নিজের সম্মানের জায়গাটি। কাজকে ভয় পেয়ে দূরে না থেকে বরং কিভাবে জয় করা যায়, সেই প্রতিজ্ঞা নিচ্ছে তারা। সমাজ-সংসারের কুসংস্কার আর বাধা ভেঙে এগিয়ে যাচ্ছে।

সরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. নাজনীন আহমেদ বলেন, ‘নিজের ও পরিবারের প্রয়োজনে নারী শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে। এতে বাংলাদেশের সমগ্র অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। নারীর প্রতি অবহেলা আগের চেয়ে কমলেও তা এখনো যথেষ্ট হচ্ছে না। তাই নারীর চলার পথের বাধাগুলো কমলেও কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় দূর হচ্ছে না। ’

একই মত জানিয়ে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়েশা খানম বলেন, ‘পরিবার থেকে প্রতিষ্ঠান—সব ক্ষেত্রেই নারীকে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। আমাদের সমাজে এখনো পরিবারের পুত্রসন্তানকে যে সুবিধা দেওয়া হচ্ছে, একই ছাদের নিচে থেকেও কন্যাশিশুটিকে তা দেওয়া হচ্ছে না। অথচ পুত্রসন্তানটির পাশাপাশি কন্যাসন্তানটি স্বাবলম্বী হলে মা-বাবা, স্বামী, সন্তান অর্থনৈতিক বিভিন্ন সুবিধা পাবে। তাই সবার উচিত নারীর চলার পথ আরো মসৃণ করা। ’

বর্তমানে পরিবার-সমাজের বাধা পেরিয়ে কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। একসময় এ দেশে নারীর চাকরি মানেই ধরা হতো স্কুল-কলেজের শিক্ষিকা বা অল্প পরিশ্রমের কোনো কাজ। কিন্তু এখন নারীরা অনেক চ্যালেঞ্জিং কাজ করছে। সরকারি-বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রেই নারীর অংশগ্রহণ এখন অনেক বেশি।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সমীক্ষা অনুযায়ী, মূলধারার অর্থনীতি হিসেবে স্বীকৃত উত্পাদন খাতে প্রায় ৫০ লাখ কর্মরত মানুষের প্রায় অর্ধেক বা ২২ লাখ নারী। কৃষি, শিল্প ও সেবা—অর্থনীতির সবচেয়ে বড় এই তিন খাতে কাজ করছে এক কোটি ৬৮ লাখ নারী। ২০১০ সালে এই সংখ্যা ছিল এক কোটি ৬২ লাখ।

দ্য এনজিও হেলথ সার্ভিস ভেলিভারির তথ্য অনুসারে, গত তিন বছরে প্রায় সাত লাখ নারী কর্মক্ষেত্রে যোগ দিয়েছে। প্রতিবছর গড়ে দুই লাখ নারী কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতে যুক্ত হয়েছে। ব্যাংক-বীমা খাতে যোগ হচ্ছে ৭০ হাজার নারী। আর শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নিয়েছে সাড়ে ছয় লাখ নারী। সেবা ও শিল্প খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে প্রধান নির্বাহী ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা হিসেবে প্রায় পাঁচ হাজার নারী কাজ করছে।

এ দেশে রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের প্রধান কর্মী নারীরা। বাংলাদেশ রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি আব্দুস সালাম মুর্শেদী কালের কণ্ঠকে বলেন, একসময় তৈরি পোশাক শিল্পে কর্মরত নারীদের বেশির ভাগ শ্রমিক ছিল। কিন্তু এখন শুধু শ্রমিক হিসেবে নয়, কর্মকর্তা হিসেবেও তারা দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছে।

নেদারল্যান্ডসভিত্তিক এসএনভি নামের একটি উন্নয়ন সংস্থা পরিচালিত ‘ওয়ার্কিং উইথ উইমেন’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, তৈরি পোশাক শিল্পের চার লাখ ২০ হাজার শ্রমিকের মধ্যে তিন লাখ ৭৮ হাজার শ্রমিক নারী।

নারীর উপার্জনে পরিবারে সচ্ছলতা এলেও এখনো নারী বৈষম্যের শিকার। নানা সুবিধা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। ‘ওয়ার্কিং উইথ উইমেন’ গবেষণা প্রতিবেদন নিয়ে কর্মরত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. নাজনীন আক্তার বলেন, ‘স্বাস্থ্য জটিলতার কারণে বছরে ২০ শতাংশ নারী শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকে। এতে কারখানাগুলোতে যে পরিমাণ উত্পাদন কম হয়, তা বছরে মোট কর্মদিবসের ১০ শতাংশের সমান। এতে তৈরি পোশাক শিল্পে বছরে প্রায় ১৭২ কোটি টাকা কম আয় হচ্ছে। পোশাকশিল্পের নারী শ্রমিকদের স্বাস্থ্য সমস্যা নিরসনে যদি এক ডলার খরচ করা হয়, তাহলে এর বিনিময়ে তিন ডলার ফেরত আসবে। তাই একে খরচ না বলে বিনিয়োগ বলা যেতে পারে। এ বিষয়ে অবহেলা করা হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে একই কাজ করেও একজন পুরুষের তুলনায় নারী অনেক সময় কম মজুরি পায়।

বিআইডিএসের গবেষণায় পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, কর্মক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় নারীর কাজে মনোযোগ বেশি। অথচ একজন নারী শ্রমিক যেখানে ২৭৪ টাকা পায়, সেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক পায় ৩৬১ টাকা।

বার্জার পেইন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘করপোরেট হাউসে চাকরির মধ্য দিয়ে আমি কর্মজীবন শুরু করি। সে সময় আমার পরিচিতজনের মধ্যে করপোরেট হাউসে কর্মরতদের খুঁজে পেতাম না। এখন আর সেদিন নেই। করপোরেট হাউসে নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে। অবশ্য এখনো সমাজের অনেকে করপোরেট হাউসে নারীর কাজকে ভালো চোখে দেখে না। তবে নারীরা শিক্ষিত হচ্ছে। তারা এসব প্রতিবন্ধকতা জয় করতে শিখছে। ’

বিবিএসের তথ্য অনুসারে, বর্তমানে কৃষি খাতে প্রায় ৯১ লাখ নারী কাজ করছে। দেশের কলকারখানায় পুরুষের চেয়ে এক লাখ বেশি নারী শ্রমিক কাজ করে। বিভিন্ন কারখানায় বর্তমানে ২১ লাখ এক হাজার ৮৩০ জন নারী শ্রমিক কাজ করছে। কর্মজীবী নারীদের অর্ধেকের বেশি কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

তুলসী চা উত্পাদনকারী প্রতিষ্ঠান পল্লীবধূর চেয়ারম্যান মনোয়ারা তালুকদার বলেন, ‘একজন সাধারণ বধূ ছিলাম। জমানো কিছু টাকা নিয়ে ব্যবসা শুরু করি। আজকে আমার প্রতিষ্ঠানের চা অনেক দেশে রপ্তানি হচ্ছে। আমি যখন ব্যবসা শুরু করি তখন ব্যবসার লাইসেন্স জোগাড় থেকে ব্যাংকঋণ পেতে হয়রানি হতে হয়েছে। এখনো অনেক ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে নারীর কর্মদক্ষতার চেয়ে স্বামীর আয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয় বেশি। ’

ব্যবসায় নারীর অংশগ্রহণে পুঁজি সংকট সবচেয়ে বড় বাধা—এমন মত জানিয়ে মাইডাস ফিন্যান্সিংয়ের চেয়্যারম্যান ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রোকেয়া আফজাল রহমান বলেন, ‘এখনো এ দেশে নারীর যোগ্যতাকে ছোট করে দেখা হয়। ব্যবসায় নারীকে উৎসাহিত না করে নিরুৎসাহ করা হয়। অথচ ব্যবসায় ঋণ পাওয়া ৯৮-৯৯ শতাংশ নারী উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করছে। নারী উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্লট দেওয়া, সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া, সহজে প্রশিক্ষণ দেওয়া উচিত। এতে নারী ব্যবসায়ীর সংখ্যা বাড়বে। ’


মন্তব্য