বাউসিয়ায় গার্মেন্টপল্লী বহুদূর!-331023 | শিল্প বাণিজ্য | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


বাউসিয়ায় গার্মেন্টপল্লী বহুদূর!

আবুল কাশেম   

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাউসিয়ায় গার্মেন্টপল্লী বহুদূর!

ঢাকা থেকে গজারিয়ার বাউসিয়া যত দূর, এক দশক আগে থেকে আলোচিত বাউসিয়ার গার্মেন্টপল্লী বাস্তবায়ন তার থেকেও যোজন যোজন দূর। পল্লীটি বাস্তবায়নে সরকারের পক্ষ থেকে জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শুরুর পর আবার তা বাতিল করতে হয়েছে। কারণ, জমির মূল্য পরিশোধ করার মতো পয়সা খরচ করতে রাজি নয় পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। পোশাক মালিকদের গড়িমসিতে হতাশা থেকে পিছু হটেছে চীনা প্রতিষ্ঠান ওরিয়েন্টাল ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিং করপোরেশন লিমিটেডও (ওআইএইচ)। তাদের সন্দেহ, বিনিয়োগ করে পার্ক গড়ে তোলার পর পোশাক মালিকরা প্লট নাও কিনতে পারেন। ফলে ঢাকা থেকে ২৮ কিলোমিটার দূরে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউসিয়ায় গার্মেন্টপল্লী স্থাপন পুরোপুরি অনিশ্চিত বলে মনে করছেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা।

গার্মেন্টপল্লী বাস্তবায়ন সম্পর্কে জানতে চাইলে বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘চীনা প্রতিষ্ঠানটি অর্থায়ন সম্পর্কে আমাদের জানানোর কথা। কিন্তু তারা কিছুই জানাচ্ছে না।’

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা জানান, বিজিএমইএর ঢিলেমি আর গড়িমসির কারণে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। ২০১৩ সালে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়েছিল। কিন্তু বিজিএমইএ কিংবা চীনা প্রতিষ্ঠান—কেউই জমির মূল্য পরিশোধ না করায় জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাতিল হয়ে গেছে। ব্যক্তি মালিকানাধীন ৫৩০ একর জমির তখনকার অধিগ্রহণ মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৭৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা। তারপর প্রায় তিন বছর পেরিয়ে গেছে, ইতিমধ্যে জমির দামও দ্বিগুণ হয়েছে। ফলে বিজিএমইএর সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠান ওআইএইচের যে সমঝোতা চুক্তি হয়েছিল, সে অনুযায়ী চীনা অর্থায়ন এলেও এখন প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকল্পটি নিয়ে বিজিএমইএ নেতাদের আগ্রহ কম। কারণ, ভাড়াটে কিংবা অংশীদারি ভবনে কারখানা রয়েছে—এমন পোশাক মালিকদের জন্য এই গার্মেন্টপল্লী নির্মাণ করা হবে। বিজিএমইএর নেতৃত্বে থাকা বড় শিল্প মালিকদের এখানে কোনো স্বার্থ না থাকায়, তাঁদের আগ্রহ নেই। পল্লী স্থাপনে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে দফায় দফায় নানা উদ্যোগ নিতে বিজিএমইএকে অনুরোধ করা হলেও তাতে সাড়া দেয় না সংগঠনটি। এ অবস্থার মধ্যেই গত বছরের জুলাইয়ে ওআইএইচের ১০ সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল এ প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করে গেছে। তাদের মনে হয়েছে, প্রকল্পটি বাস্তবায়নের পর পোশাকশিল্প মালিকরা এখানে প্লট নাও কিনতে পারেন। এ কারণে চীনা প্রতিষ্ঠানটিও বিনিয়োগে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।

গত ১৭ জানুয়ারি বিজিএমইএ নেতারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সেখানে পোশাক খাতের অন্যান্য বিষয়ের পাশাপাশি গার্মেন্টপল্লী স্থাপনে বিজিএমইএর কৃপণতায় হতাশা প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। পোশাক মালিকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আসলে আপনারা একুট বেশি কৃপণতা করেন। নিজেরা পয়সা খরচ করতে চান না। এখানেই হচ্ছে সমস্যা। জায়গাটাকে পুরোপুরি তৈরি করে দেওয়া হয়েছে। আমি মনে করি, আপনাদের পক্ষ থেকে একটু উদ্যোগ যদি নেন বা কিছু পয়সা খরচ করেন, তাহলে পোশাকপল্লীটা করে ফেলতে পারেন।’

প্রায় এক দশক আগে থেকে আলোচিত এ প্রকল্পটি ২০১৩ সালে নতুন মাত্রা পায়। ওই বছরের ফেব্রুয়ারি ও মার্চে ৫৩০ দশমিক ৭৮ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য প্রশাসনিক অনুমোদন দেয় সরকার। এর মধ্যে বাউসিয়া, মধ্যম বাউসিয়া, পোরারচক, কাইচখালী ও চৌদ্দকাহনিয়া মৌজায় ৪৯২ একর জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করে মুন্সীগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়। ওই সময় জমির দাম ও ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭৭৭ কোটি ৮৩ লাখ টাকা নির্ধারণ করে তা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দিতে বিজিএমইএকে ২০১৩ সালের ১৩ নভেম্বর, ২৫ নভেম্বর, ১৯ ডিসেম্বর এবং সর্বশেষ ২০১৪ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সময়সীমা দেওয়া হয়। বিজিএমইএ টাকা না দেওয়ায় তখনই অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া বাতিল করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, জমির মূল্য পরিশোধের অর্থ জোগাড়ের জন্য পোশাক মালিকরা নিজেরা কোনো অর্থ খরচ না করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে তখন থেকেই বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থের সংস্থান করার চেষ্টা করেন। দেশের ভেতর থেকে অর্থ না পাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চীন সফরকালে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান ওআইএইচের সঙ্গে ২০১৪ সালের ১০ জুন সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে বিজিএমইএ। ওই বছরের ৫ আগস্ট শিল্প পার্কের উন্নয়নের জন্য বিজিএমইএর আবেদনে ওআইএইচকে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাবে অনাপত্তি দেয় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। ২০১৪ সালের ১৩ ডিসেম্বর বিজিএমইএর সঙ্গে চীনা প্রতিষ্ঠানটির একটি কাঠামোগত চুক্তি স্বাক্ষর হয়। তাতে শিল্প পার্কটি স্থাপনে ব্যয় ধরা হয় ২৩০ কোটি ডলার, যার পুরোটাই বিনিয়োগ করার কথা চীনা কম্পানির। শিল্প পার্ক প্রতিষ্ঠার পর গার্মেন্ট মালিকদের কাছে প্লট বিক্রি করে এবং বিভিন্ন সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করে বিনিয়োগের সঙ্গে মুনাফার পরিকল্পনা ছিল চীনা প্রতিষ্ঠানটির।

বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, ‘অর্থ বিনিয়োগের আগে চীনা প্রতিষ্ঠানটি সমীক্ষা চালিয়েছে। তাতে তাদের হয়তো মনে হয়েছে, বাংলাদেশের গার্মেন্ট মালিকরা ঢাকার বাইরে যেতে আগ্রহী নন। ফলে বিনিয়োগের পর সেখানকার প্লট যে গার্মেন্ট মালিকরা কিনবেন, সেই নিশ্চয়তার অভাববোধ করছে চীনা প্রতিষ্ঠানটি। সে কারণে তাদেরও আগ্রহে ভাটা পড়েছে।’

কর্মকর্তারা বলেন, প্রস্তাবিত এই শিল্পপার্কটিতে ২৫৩টি কারখানা স্থাপিত হওয়ার কথা। এতে কারখানাগুলোতে প্রায় তিন লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হতো। পার্কটিতে যেসব কারখানা গড়ে ওঠার কথা, তাতে বছরে ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করা সম্ভব।

কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে নিবন্ধন হওয়া চালু গার্মেন্ট কারখানার সংখ্যা পাঁচ হাজার ১৯০টি। এর মধ্যে ঢাকায় দুই হাজার ৫০০, গাজীপুরে ৮৭২, চট্টগ্রামে ৫২৮, নারায়ণগঞ্জে এক হাজার ২১৮টি কারখানা রয়েছে। অন্য জেলাগুলোর মধ্যে ময়মনসিংহে ২৭টি, যশোরে চারটি, মৌলভীবাজারে তিনটি, টাঙ্গাইলে ১১টি, মুন্সীগঞ্জে তিনটি, সিরাজগঞ্জ ও রংপুরে একটি করে, কুমিল্লায় ছয়টি, বগুড়ায় ১২টি ও খুলনায় তিনটি কারখানা রয়েছে।

মন্তব্য