লেনদেন তলানিতে ঠেকেছে, একই কারণে মার্কেট শেয়ারে নিজেদের হিস্যা ৩ শতাংশে নেমেছে। নির্ধারিত সময়ের বছর পেরিয়ে গেলেও কৌশলগত অংশীদারের (স্ট্র্যাটেজিক পার্টনার) খোঁজ মেলেনি এখনো। এই ক্রান্তিকালে সম্প্রতি নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) চেয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়েছে চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই)। বর্তমান এমডির আরেক মেয়াদে কাজের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুন নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে পুঁজিবাজারসংশ্লিষ্টদের মনে যেমন কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে তেমনি সিএসইর অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার বিষয়টি সামনে চলে এসেছে। সিএসই সূত্র জানায়, বর্তমান এমডির মেয়াদ আগামী ৩০ মে শেষ হবে। তবে এর আগেই গত ১০ এপ্রিল একাধিক পত্রিকায় ‘ব্যবস্থাপনা পরিচালক’ চেয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। বিজ্ঞাপন প্রকাশের দিন থেকে পরবর্তী ১০ দিনের মধ্যে আগ্রহীদের আবেদন করতে বলা হয়। যোগ্য প্রার্থীকে কাজের অসাধারণ পরিবেশের পাশাপাশি আকর্ষণীয় বেতন-ভাতা ও সুবিধা প্রদান করা হবে বলে বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়। নির্ধারিত সময়ে এমডি পদের জন্য ১৬টি আবেদন জমা পড়েছে বলে জানিয়েছেন সিএসইর কম্পানি সচিব রাজিব সাহা। আগামীকাল সোমবার ২৯ এপ্রিল এই আবেদনগুলো নিয়ে নিয়োগ ও পদোন্নতি কমিটির (এনআরসি) সভা রয়েছে। সেই সভায় আবেদন যাচাই-বাছাই করে শর্ট লিস্ট করে প্রার্থীদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন এনআরসি কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম। তবে সুযোগ থাকা সত্ত্বেও এই পরিবেশ আর আকর্ষণীয় বেতন-ভাতায় নতুন করে আবেদন করেননি বর্তমান এমডি এম সাইফুর রহমান মজুমদার। চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (বোর্ড অ্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন) রেগুলেশন ২০১৩ অনুযায়ী, বোর্ড চাইলে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) অনুমতি নিয়ে এমডির তিন বছরের মেয়াদ শেষে আরেক দফা মেয়াদ বাড়াতে পারবে। কিন্তু কর্মপরিবেশ ও কাজের স্বাধীনতা না থাকায় বর্তমান এমডি নতুন করে আবেদন করবেন না বলে জানা গেছে। বিশেষ করে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর সেখানে নতুন করে আবেদন করা তাঁর জন্য অসম্মানজনকই হবে বলে মনে করছে সূত্রটি। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও নতুন করে আবেদন না করার কথা নিশ্চিত করে সিএসইর ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম সাইফুর রহমান মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এক মেয়াদ তো থাকলাম। বোর্ডকে জানিয়েছি আর থাকতে চাই না। তাই আবেদনও দেব না নতুন করে।’ না থাকার পেছনে পরিবেশ না থাকা ও স্বাধীনভাবে কাজ করার প্রতিবন্ধকতার কথা জানান তিনি। সিএসইর একাধিক সূত্র জানায়, যে উদ্দেশ্যে স্টক এক্সচেঞ্জগুলোকে ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন (মালিকানা থেকে ব্যবস্থাপনাকে পৃথক্করণ) করা হয়েছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কাজের সেই পরিবেশ এখনো সৃষ্টি হয়নি। বরং স্টক এক্সচেঞ্জের স্বার্থে ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের নেওয়া অনেক সিদ্ধান্ত বোর্ডে আটকে যাচ্ছে কিংবা দীর্ঘসূত্রতায় পড়ছে। এভাবে কাজে হস্তক্ষেপ ও স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ না থাকায় ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশনের উদ্দেশ্যই ব্যাহত হচ্ছে। এই সংকট তুলনামূলকভাবে সিএসইতে বেশি হচ্ছে বলে তাঁরা জানান। এর আগে ডি-মিচ্যুয়ালাইজেশনের পর প্রথম নিয়োগকৃত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওয়ালি-উল-মারুফ মতিন তিন বছর মেয়াদের এক বছর পূর্ণ করার এক দিন আগে পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সে সময় পদত্যাগপত্রে ‘কাজের পরিবেশ’ ও ‘অসহযোগিতার’ কথা উল্লেখ করেন তিনি। এই অসহযোগিতা মূলত বোর্ডের কাছ থেকেই ছিল বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। বরং এই প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করেন, ‘সিএসইতে কি ডি-মিউচ্যুয়ালাইজেশন হয়েছে? প্রেসক্রিপশনে অনেক কিছুই থাকে কিন্তু বাস্তবে তা খুঁজে পাওয়া যায় না।’ ১৯৯৫ সালে প্রতিষ্ঠাকাল থেকে সিএসই বর্তমানে সবচেয়ে কঠিন সময় পার করছে। লেনদেন আশঙ্কাজনকভাবে কমার পাশাপাশি পুঁজিবাজারের মার্কেট শেয়ারের হিস্যা ১০ শতাংশ থেকে কমে বর্তমানে ৩ শতাংশে নেমে এসেছে। পরিচালন লোকসান দিন দিন বাড়ছে। এর ওপর ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ এক বছর আগেই কৌশলগত অংশীদার পেয়ে গেলেও সিএসই এখনো কৌশলগত অংশীদার খুঁজে পায়নি। ফলে বহুমুখী এই চাপের মধ্যেই নতুন ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়োগ সব প্রক্রিয়াকে আরো দীর্ঘসূত্রতায় ফেলবে বলে মনে করেন সিএসইসংশ্লিষ্টরা। সিএসইর স্বাধীন পরিচালক এবং এনআরসি কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আইয়ুব ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমডি তিন বছর করে দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের নিয়ম আছে। এ জন্য তাঁকে আবার আবেদন করতে হবে। বোর্ড অনুমোদন দিলে বিএসইসি থেকে অনুমতি নিতে হবে।’ বর্তমান এমডির আবেদন না করার কথা জানানো হলে তিনি বলেন, ‘এখনো সময় আছে, তিনি হয়তো মনোভাব পরিবর্তন করতে পারেন। তবে বাজার পরিস্থিতি খারাপ, আলাদা চ্যালেঞ্জ থাকতে পারে।’ বোর্ড থেকে চাপ আছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বোর্ড থেকে কোনো চাপ ছিল না।’