kalerkantho


এটিএমের পর এসেছে নতুন প্রযুক্তি সিআরএম

টাকা জমা ও তোলা একই মেশিনে

শেখ শাফায়াত হোসেন   

৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ ০০:০০



টাকা জমা ও তোলা একই মেশিনে

রাজধানীর মতিঝিলের সাউথইস্ট ব্যাংকের একটি সিআরএম

ব্যাংকিং পরিষেবায় অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এটিএম (অটোমেটেড টেলার মেশিন) বুথ। টাকা ওঠানোর সহজ এই যন্ত্র ছড়িয়ে পড়েছে ঢাকাসহ সারা দেশে। প্রায় দুই দশক ধরে এটিএম সেবার প্রসারে টাকা ওঠাতে ব্যাংকে মানুষের চাপ অনেকটাই কমেছে। তবে টাকা জমা দিতে এখনো ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে গ্রাহকদের হয়রান হতে হয়। তাই এবার শুধু টাকা ওঠানোর মধ্যে এই সেবাকে সীমিত না রেখে জমার ব্যবস্থাও করেছে ব্যাংকগুলো। ঢাকা শহরের কিছু মেশিনে টাকা জমা ও উত্তোলন দুই-ই হচ্ছে। এ ধরনের মেশিন ‘ক্যাশ রিসাইকেলার মেশিন’ বা সিআরএম নামে বিশ্বব্যাপী পরিচিত। প্রযুক্তির উত্কর্ষতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশে এখন পর্যন্ত তিনটি ব্যাংক এ ধরনের ৫৫টি মেশিন চালু করেছে। এর ফলে ব্যাংকের গ্রাহকরা এখন শাখায় না গিয়েও প্রতিবার সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা করে নিজের অ্যাকাউন্টে জমা করতে পারছেন।

জানা গেছে, বর্তমানে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক (ইউসিবি) ৩৪টি, সাউথইস্ট ব্যাংক ১৬টি ও সিটি ব্যাংক পাঁচটি সিআরএম চালু করতে সক্ষম হয়েছে। এই তিনটি ব্যাংক আগামী বছরের জুনের মধ্যে এ ধরনের আরো ১০০টির বেশি সিআরএম চালু করার পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে।

আগামী বছরের মার্চের মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংকের আরো ৫০টি সিআরএম চালুর লক্ষ্য রয়েছে জানান ব্যাংকটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম কামাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকার মধ্যে ১৬টি সিআরএম বসানো হয়েছে। ভবিষ্যতে সারা দেশেই এ ধরনের মেশিন আমরা বসাব। এতে গ্রাহকের সময় বাঁচবে। ইদানীং ব্যাংকের শাখায় টাকা জমা দেওয়ার জন্য অনেক বড় সারি দেখা যায়। সিআরএম চালুর ফলে এই ভিড় অনেক কমে আসবে। তা ছাড়া একই মেশিনে টাকা জমা ও তোলার সুযোগ থাকায় ব্যাংকেরও ‘ক্যাশ ফিডিং’-এর খরচ কমে আসবে।’

এম কামাল আরো বলেন, ‘এই মেশিনে টাকা জমা দেওয়ার জন্য কোনো খরচ নেই। দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা যেকোনো সময় টাকা জমা ও উত্তোলন দুটিই করা যাচ্ছে।’

দিলকুশায় সাউথইস্ট ব্যাংকের করপোরেট শাখার ভেতরে এবং বাইরে দুটি সিআরএম রয়েছে। ব্যাংকটির কার্ড বিভাগের প্রধান আবদুস সবুর খান জানান, সিআরএম বুথে টাকা জমা করতে গ্রাহককে এটিএম কার্ড সঙ্গে নিয়ে আসতে হবে। এটিএম বুথের মতো সিআরএমে কার্ডটি প্রবেশ এবং পিন ভেরিফিকেশনের পর টাকা তোলা ও জমা উভয় ‘অপশন’ দেখা যাবে মনিটরে। সেখান থেকে ‘ক্যাশ ডিপোজিট’ বা জমার অপশন সিলেক্ট করে টাকার পরিমাণ লিখে এন্টার বাটনে ক্লিক করলে টাকা জমা দেওয়ার বক্স খুলে যাবে এবং গ্রাহক ৫০০ ও ১০০০ টাকার নোট জমা দিতে পারবেন। নোট কোনো রকম ছেঁড়া-ফাটা বা ভাঁজ করা অবস্থায় দিলে ওই নোটটি সিআরএম গ্রহণ করবে না। সে ক্ষেত্রে নোটটি মেশিন থেকে বেরিয়ে আসবে।

চলতি মাসেই কার্ড ছাড়াও সিআরএম মেশিনে লেনদেন করা যাবে এমন মেশিন চালু করছে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক (এমটিবি)। এ ক্ষেত্রে কার্ড বা অ্যাকাউন্ট নম্বর মুখস্থ রাখতে হবে গ্রাহককে। এ ছাড়া এ মাসে ইসলামী ব্যাংকও সিআরএম মেশিন চালু করছে এবং ইস্টার্ন ব্যাংক এই সেবার সনদ নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করছে বলে জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পেমেন্ট সিস্টেমস বিভাগের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এই মেশিনগুলো চালুর আগে ব্যাংকগুলো প্রায় দুই বছর ধরে মেশিনের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা করেছে। বিভিন্ন অঙ্কের নোট এবং অচল নোট বা বিদেশি মুদ্রা দিয়ে মেশিনগুলো পরীক্ষা করা হয়েছে। মেশিনগুলো এখন জাল নোট থেকে শুরু করে ছেঁড়া-ফাটা বা ময়লাযুক্ত নোট শনাক্ত করতে সক্ষম।’

ভবিষ্যতে দ্য সিটি ব্যাংক নতুন করে আর কোনো এটিএম না বসিয়ে সিআরএম বুথ করবে বলে জানান ব্যাংকটির অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিন। ব্যাংকটির আগামী বছরের জুনের মধ্যে আরো ৫০টি সিআরএম চালুর লক্ষ্য রয়েছে।

প্রসঙ্গত, দেশে দুই দশক ধরে এটিএম সেবা চালু রয়েছে এবং ১২-১৩ বছর আগে চালু হয়েছে ‘ক্যাশ ডিপোজিট মেশিন’ বা সিডিএম। তবে সিডিএমে টাকা জমা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাংক হিসাবে যোগ হয় না। সেখানে একটি প্যাকেটে করে টাকা জমা দেওয়া হয়, যা ব্যাংকের কর্মকর্তারা দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে বের করে ম্যানুয়ালি গ্রাহকের ব্যাংক হিসাবে যোগ করেন বা ক্রেডিট কার্ডের বিল পরিশোধ করেন।

এ ক্ষেত্রে সিআরএমে তাত্ক্ষণিকভাবে ব্যাংক হিসাবে টাকা জমা করা যায়, ব্যাংকের ভাষায় এটাকে বলে ‘রিয়েল টাইম ট্রান্সজেকশন’। জানা গেছে, একজন গ্রাহক ব্যাংক হিসাব খোলার সময় লেনদেন প্রোফাইল বা টিপিতে যে পরিমাণ লেনেদেনের ঘোষণা থাকবে তিনি সে পরিমাণ টাকা জমা দিতে পারবেন সিআরএমের মাধ্যমে। তবে একবারে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা জমা দেওয়া যাবে।

সাউথইস্ট ব্যাংকের এমডি আরো জানান, কোনো বুথে টাকা শেষ হয়ে এলে ব্যাংকের কেন্দ্রীয় সার্ভারে একটি সংকেত যায়। একইভাবে সিআরএম বুথে যে পরিমাণ টাকার ধারণক্ষমতা রয়েছে তার চেয়ে বেশি জমা হলেই সংকেত যাবে। তখন ব্যাংকগুলো বাড়তি টাকা ব্যাংক শাখায় নিয়ে আসবে।

জারা জামান টেকনোলজির কারিগরি সহায়তায় সিআরএম বুথ স্থাপন করা হয়েছে। প্রযুক্তি খাতের প্রতিষ্ঠান আইটিসিএলসহ আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ রকম সেবার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার আগ্রহ দেখিয়েছে।

জারা জামান টেকনোলজির অপারেশন অ্যান্ড বিজনেস ডেভেলপমেন্ট বিভাগের প্রধান এস এম গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘ব্যাংকগুলোর চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে জিআরজি ব্যাংক নামের চীনের সরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এসব মেশিন এনে স্থাপন করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত এক ব্যাংকের সিআরএম থেকে অন্য ব্যাংকের অ্যাকাউন্টধারীদের টাকা জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চালু হয়নি দেশে। আশা করছি, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ন্যাশনাল পেমেন্ট সুইচের (এনপিএসবি) আওতায় সিআরএমকে আনতে পারলে এক ব্যাংকের গ্রাহক অন্য ব্যাংকের সিআরএম ব্যবহার করেও টাকা জমা করতে পারবেন।’

গত বছরের জুনে দেশে প্রথম রিসাইকেলার এটিএম চালু করে সিটি ব্যাংক। তবে চলতি বছরের শুরুতে আনুষ্ঠানিকভাবে রিসাইকেলার এটিএম চালুর ঘোষণা দেয় ইউসিবি। গত মে পর্যন্ত দেশে সব ধরনের এটিএম চালু ছিল ৯৬৯৮টি।



মন্তব্য