kalerkantho


সাক্ষাৎকারে চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবসাবান্ধব করতে চাই

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৪ মার্চ, ২০১৮ ০০:০০



চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবসাবান্ধব করতে চাই

দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরকে ব্যবসায়ীবান্ধব বন্দর করতে চান চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের নতুন চেয়ারম্যান কমোডর জুলফিকার আজিজ। দায়িত্ব নেওয়ার পরই তিনি বন্দর ব্যবহারকারী বিভিন্ন ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে অগ্রাধিকার কী হওয়া উচিত সেটি চূড়ান্ত করেন। চট্টগ্রাম বন্দরের পণ্য ওঠানামার বর্তমান ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে স্বল্পমেয়াদি একটি পরিকল্পনাও এরই মধ্যে নিয়েছেন। এখন লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করছেন।

সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কমোডর জুলফিকার আজিজ বলছেন, বন্দরের প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে জেটি-টার্মিনাল নির্মাণের কোনো বিকল্প নেই। এ মুহূর্তে আমার কাছে নতুন জেটি বা টার্মিনাল নেই। বিদ্যমান জেটি বা টার্মিনাল দিয়েই ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি সামাল দিতে হবে। এ জন্য স্বল্পমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে পরিচালন ব্যবস্থা দ্রুত করাকে অগ্রাধিকার দিয়েছি।

সেটি কিভাবে হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্দরের ভেতর কনটেইনার ডেলিভারি, পণ্য কনটেইনারে ভর্তি (স্টাফিং) ও কনটেইনার থেকে নামানো (আনস্টাফিং) এই তিনটি কাজ বন্দরের ভেতর থেকে সরিয়ে বে টার্মিনালে নিয়ে যাওয়া হবে। এই পদ্ধতির ডিজাইন চূড়ান্ত করেছি। এখন বাকি প্রক্রিয়া শুরু হবে। আশা করছি, ২০১৯ সালের জুনের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের ভেতর থেকে পণ্য খালাসের প্রক্রিয়া হালিশহরের ‘বে টার্মিনালে’ স্থানান্তর করতে পারব।

কিন্তু বে টার্মিনালে কাজ শুরু হয়নি। এ প্রসঙ্গে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমরা এরই মধ্যে প্রায় সাত একর জমি পেয়ে গেছি। সেটিতেই ইয়ার্ডের প্রাথমিক কাজ শুরু করব। জমি অধিগ্রহণের পর ইয়ার্ডের পরিধি বাড়বে।

এতে কী সুবিধা হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্দরের ভেতর আমদানি ও রপ্তানি নামে পৃথক জোন থাকবে। আমদানি জোনে জাহাজ থেকে নামা পণ্য থাকবে, আর বেসরকারি ডিপো থেকে আসা পণ্য রপ্তানি জোনে থাকবে। এতে বন্দরের ভেতর প্রচুর খালি জায়গা থাকবে যেখানে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে পণ্য ওঠানামা করতে পারব।

কমোডর জুলফিকার আজিজ মনে করেন, বর্তমানে একটি কনটেইনার জাহাজের গড় অবস্থানকাল ২ দশমিক ৬ দিন। নতুন পদ্ধতি চালু হলে সময় কমে ৩৬ ঘণ্টা বা দেড় দিন লাগবে। শুধু তাই নয়, বছরে জাহাজ হ্যান্ডলিং তিন হাজার থেকে বেড়ে দ্বিগুণ হবে। এর অর্থ হচ্ছে জেটি বা টার্মিনাল সংখ্যা না বাড়িয়েই আমরা এখনকার চেয়ে দ্বিগুণ জাহাজ হ্যান্ডলিং করতে পারব।

৩৬ ঘণ্টার হিসাবের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, বন্দরে আসা একটি জাহাজ খালি হতে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা; আবার জাহাজ ছেড়ে যেতেও লাগে একই সময়। আমদানি কনটেইনার নির্ধারিত জোনে এবং রপ্তানি কনটেইনার নির্ধারিত জোনে রাখি তাহলে হাতের নাগালেই সব পাব। ফলে একটি জাহাজ বন্দরে এসে ছেড়ে যেতে ২৪ ঘণ্টা সময় লাগবে। জোয়ারের সঙ্গে হিসাব কষে সেটি আমরা আরো ১২ ঘণ্টা বাড়িয়ে ৩৬ ঘণ্টা নির্ধারণ করেছি।

কমোডর জুলফিকার বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরে বর্তমানে যে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে সেটি সামাল দিতে এই পদ্ধতি সাময়িক। এই পদ্ধতির সুফল পেতে পেতেই আমরা বন্দরে নতুন টার্মিনাল ও জেটি পেয়ে যাচ্ছি।

চট্টগ্রাম বন্দরের গতিশীলতা বাড়াতে নেওয়া প্রকল্পগুলোর অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল (পিসিটি) নির্মাণকাজ এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে। সেটি ২০১৯ সালের ডিসেম্বরেই চালু হবে, সেখানে তিনটি জেটি পাব।

এ ছাড়া লালদিয়া বাল্ক টার্মিনাল প্রাইভেট পাবলিক পার্টনারশিপ বা পিপিপি মাধ্যমে বাস্তবায়নে সরকার কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে আগেই। পাঁচটি বিদেশি কম্পানির জন্য শর্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এখন আরএফপি ডকুমেন্ট তৈরির কাজ চলছে।

চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানাচ্ছেন, হালিশহরে বে টার্মিনাল প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার তালিকাভুক্ত করার; কিন্তু সেটি এখনো করা হয়নি। এর কারণ জানতে চাইলে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, ফাস্ট ট্র্যাকভুক্ত না হলেও দ্রুত গতিতেই কাজ চলছে। জমি অধিগ্রহণ চলছে, বিদেশি কম্পানির বিনিয়োগ আগ্রহ রয়েছে।

চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, শুধু জেটি টার্মিনাল নির্মাণ নয়; সেগুলোকে আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন করে উন্নত আধুনিক বন্দরের আদলের দ্রুত পণ্য ওঠানামার ব্যবস্থা করতে আমরা এক হাজার ২০০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করছি। ৫১টি বিভিন্ন ধরনের যন্ত্রপাতির মধ্যে ৪২টি কেনার জন্য চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। এর মধ্যে কিছু যন্ত্র চলে এসেছে, আসার পথে আছে আরো বেশ কিছু।

বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (প্রকৌশল) হিসেবে এর আগে কর্মরত থাকা কমোডর জুলফিকার আজিজ বলেন, চলতি ২০১৮ সালের মধ্যেই ৬টি কি গ্যান্ট্রি ক্রেন যোগ হবে বন্দরের যন্ত্রপাতির বহরে। আর দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত অচল গ্যান্ট্রি ক্রেন সচল করতে টিম কাজ করছে, আশা করছি মার্চ মাসের শেষে সেটি সচল হয়ে পণ্য ওঠানামায় যুক্ত হবে। মোট আটটি ‘কি গ্যান্ট্রি ক্রেন’ যুক্ত হলে ২০১৮ সালের শেষে কনটেইনার ওঠানামা ৩০ লাখ একক হবে এবং সেটি আমরা সামাল দিতে পারব। তখন বন্দরে আসা গিয়ারলেস বা ক্রেন ছাড়া জাহাজকে আরো বেশি অনুমতি দিতে পারব, যেটি এখন সীমিত পরিসরে আছে।

যন্ত্রপাতি কেনার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত দরপত্রের বদলে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি বা ডিপিএম করার যুক্তি দিয়ে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, প্রথমত এই যন্ত্রগুলো কেনার জন্য ডিপিএম করার অনুমতি ছিল আগেই, আর দ্রুত যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করতে এর বিকল্প ছিল না। এখন থেকে উন্মুক্ত দরপত্রেই যন্ত্র কেনা হবে।

বর্তমানে বহির্নোঙরে পণ্য নামাতে একটি সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজকে অনেক সময় বসে থাকতে হচ্ছে। লাইটার বা ছোট জাহাজ ও জেটি সংকট এবং এসব পণ্য ওঠানামায় আধুনিক যন্ত্র যোগ না করায় বিপুল আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে আমদানিকারকদের। এই সমস্যার জন্য চট্টগ্রাম বন্দর কোনোভাবে জড়িত না হলেও বন্দরের ভাবমূর্তিই ক্ষুণ্ন হচ্ছে সবচেয়ে বেশি। এই পরিস্থিতি উত্তরণ সম্পর্কে জানতে চাইলে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, মূলত কাজটি নৌ-বাণিজ্য অধিদপ্তর তদারকি করছে। এর পরও জাহাজ থেকে পণ্য লাইটার বা স্থানান্তর কার্যক্রম অত্যন্ত দ্রুত করার পদক্ষেপ নিয়েছি। এ জন্য পতেঙ্গা ইনকনট্রেড লিমিটেড ডিপোর পেছনে একটি জেটি তৈরি হচ্ছে। সেখানে চারটি জেটি পণ্য নামানোর কাজে ব্যবহৃত হবে। আর একটি জেটি সেখানে নির্মিত হচ্ছে যেটি হবে সার্ভিস জেটি অর্থাৎ কাস্টমস বন্দর বা বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া সদরঘাটে মোট পাঁচটি জেটি আমরা লাইটার জেটি হিসেবে পণ্য নামানোর কাজে ব্যবহার করতে পারব। সেই জেটি প্রায় প্রস্তুত; এ মাসেই আমরা জেটিগুলো পরিচালনার জন্য উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করব।

নির্দিষ্ট কোনো প্রতিষ্ঠান বা বড় আকারের পণ্য আমদানিকারককে সেই জেটি বরাদ্দে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, না। আমরা উন্মুক্ত দরপত্র ডাকব, সেখানে যোগ্য নির্বাচিতরাই কাজ পাবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের বহুল আলোচিত ক্যাপিটাল ড্রেজিং নৌবাহিনীর মাধ্যমেই বাস্তবায়ন করা হচ্ছে উল্লেখ করে বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, নোটিফিকেশন অ্যাওয়ার্ড দেওয়া হয়েছে। তারা দ্রুত কাজ শুরু করবে।

আরো দুটি কাজে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে উল্লেখ করে চট্টগ্রাম বন্দর চেয়ারম্যান বলেন, একটি হচ্ছে সিকিউরিটি সিস্টেম আধুনিক করে পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা; আরেকটি হচ্ছে বন্দরের সব বিভাগকে তথ্য-প্রযুক্তির আওতায় আনা। এই দুটি নিশ্চিত করতে পারলে চট্টগ্রাম বন্দর অনেক ধাপ এগিয়ে যাবে।


মন্তব্য