kalerkantho


সাক্ষাৎকারে এনবিআর চেয়ারম্যান মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া

ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই আমার লক্ষ্য

৭ জানুয়ারি, ২০১৮ ০০:০০



ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই আমার লক্ষ্য

২০১০ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের সেতু বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব হিসেবে নিয়োগ পান মো. মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া। তিনি ২০১৪ সালের ২৬ অক্টোবর শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব পদে যোগ দেন। সিনিয়র সচিব হিসেবে পদোন্নতি পান ২০১৬ সালের ১১ এপ্রিল। গত বছরের ৩০ জুন অবসরউত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা থাকলেও সরকার তাঁর পিআরএল বাতিল করে এক বছরের চুক্তিতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। সেই চুক্তির মেয়াদ থাকতেই গত ৩ জানুয়ারি বিসিএস ১৯৮১ ব্যাচের এই কর্মকর্তাকে দুই বছরের জন্য অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের সচিব ও এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে চুক্তি ভিত্তিতে নিয়োগ দিয়েছে সরকার। রাজস্ব আয় বাড়ানোর পাশাপাশি এ খাতসংশ্লিষ্টদের সততা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করাসহ আগামী দুই বছরের কর্মকৌশল নিয়ে কালের কণ্ঠ’র নিজস্ব প্রতিবেদক ফারজানা লাবনীর সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার কথা বলেন এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান

 

অর্থবছরের অর্ধেক পার হয়ে গেছে। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার এখনো অনেক বাকি। হাতে সময় আর মাত্র ৬ মাস। জুন মাসের মধ্যে চলতি অর্থবছরের রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের দায়িত্ব নিয়ে এনবিআরের নতুন প্রধান বললেন, ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই হবে তাঁর লক্ষ্য। রাজস্বের ভার চাপিয়ে নয়, করের আওতা বাড়িয়ে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের উদ্যোগ নেবেন তিনি। এ ক্ষেত্রে করদাতারা যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকেও তাঁর নজর থাকবে।

ড. মোশাররফ হোসেন বলেন, এনবিআর আগের চেয়ে গতিশীল হয়েছে। আমার চেষ্টা থাকবে এ গতিশীলতা বাড়ানো।

গত কয়েক বছরের জাতীয় বাজেটের প্রায় ৬০ শতাংশ অর্থায়নের দায়িত্ব পড়ে এনবিআরের ওপর। এনবিআর চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর মেয়াদকালে রাজস্ব আদায়ে কোন খাতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে এমন প্রশ্নের জবাবে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া জানান, আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক তিন খাতেই সমান গুরুত্ব থাকবে তাঁর।

ব্যবসায়ীদের দাবি মেনে ভ্যাট আইন-২০১২ সংশোধনের উদ্যোগ নেবেন কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, ব্যবসায়ীরা রাজস্ব পরিশোধ করছেন বলেই সরকারের আয় বাড়ছে। আমরা পদ্মা সেতুর মতো বড় অবকাঠামো নির্মাণে সক্ষম হচ্ছি। ব্যবসায়ীদের নিয়েই ভ্যাট আইন-২০১২ বাস্তবায়ন করা হবে। তাদের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। এ জন্য আলোচনা চলবে।

ভ্যাট আইন-২০১২ প্রণয়নকালীন সময় থেকেই আইনটির কিছু ধারা নিয়ে ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এনবিআরের মতবিরোধ তৈরি হয়। চলতি বাজেটেও সংশোধন ছাড়াই এ আইন অন্তর্ভুক্ত করা হয়। আইনটি সংশোধনের দাবিতে অনড় থাকে ব্যবসায়ীদের সংগঠনগুলো। গত জুলাই থেকে শুরু হওয়া চলতি অর্থবছরে ভ্যাট আইন বাস্তবায়নের প্রস্তুতি নিলেও শেষ পর্যন্ত এনবিআর তা কার্যকর করতে পারেনি।

মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, ভবিষ্যতে ভ্যাট আইন সম্পর্কে ব্যবসায়ীদের মতামত মূল্যায়ন করা হবে। তারা এনবিআরের সহযোগী। একটি আইন নিয়ে কেন তাদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হবে?

‘আমি শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিবের দায়িত্বে ছিলাম। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আমার সুসম্পর্ক রয়েছে। ব্যবসায়ীদের সঙ্গে নিয়েই হাজারীবাগ থেকে বহু দিনের পুরনো ট্যানারি স্থানান্তর করে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে নিতে সক্ষম হয়েছি,’ বললেন এনবিআরের নতুন চেয়ারম্যান।

এরই মধ্যে করদাতার সংখ্যা ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে, এটিকে এনবিআরের বড় ধরনের সাফল্য উল্লেখ করে তিনি বলেন, করদাতার সংখ্যা আরো বাড়ানোর চেষ্টা থাকবে। শহরের পাশাপাশি রাজস্ব প্রদানে সক্ষম দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সম্পদধারীদেরও রাজস্ব জালের আওতায় আনার উদ্যোগ থাকবে।

নতুন রাজস্বের ভার চাপিয়ে বা নতুন রাজস্ব আরোপ করে রাজস্ব আহরণের পরিমাণ বাড়ানো হবে না। বরং রাজস্ব জালের বিস্তার ঘটিয়ে এবং দুর্নীতি বন্ধ করে আয় বাড়ানোর কথা বললেন মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।

রাজস্ব ফাঁকি রোধে আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য দেওয়া বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানালেন তিনি।

এনবিআরের সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি), ভ্যাট (ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স) গোয়েন্দা শাখা এবং শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরকে আরো গতিশীল করা হবে জানিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, যারা রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর থাকবে এনবিআর। অন্যদিকে যারা নিয়মিত রাজস্ব দিচ্ছে, তাদের অবশ্যই সম্মানিত করা হবে।

চলতি অর্থবছরের বাকি ছয় মাস রাজস্ব আদায়ে কী কর্ম পরিকল্পনা থাকবে এমন প্রশ্নের জবাবে এনবিআর চেয়ারম্যান বলেন, চলতি অর্থবছরের আগামী ছয় মাস নিবিড় তদারকির মাধ্যমে রাজস্ব আদায় করা হবে। মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের আরো তত্পর হতে নির্দেশ দেওয়া হবে। করদাতাদের ঘরের দরজায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে বলা হবে কর্মকর্তাদের। প্রযুক্তি নির্ভরতায় জোর দেওয়া হবে। এতে করদাতাদের সঙ্গে এনবিআর কর্মকর্তাদের ইতিবাচক বন্ধন আরো দৃঢ় হবে। ফলে রাজস্ব পরিশোধে করদাতারা উৎসাহিত হবে। এসব উদ্যোগে রাজস্ব আদায় বাড়বে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর থাকবেন জানিয়ে রাজস্ব খাতের নতুন কর্ণধার বলেন, এনবিআরেরও সব কাজে সততা নিশ্চিত করা হবে। সততা ও জবাবদিহিতা সেলের কার্যক্রম আরো জোরদার করা হবে। সৎ কর্মকর্তাদের পুরস্কৃত করা হবে। অসেদর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হবে। কিছু অসৎ ব্যক্তি কৌশলে রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তা দিচ্ছে। এসব অন্যায় বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এনবিআর প্রধান বলেন, অর্থপাচাররোধে নজরদারি আরো বাড়ানো হবে। তবে আমার চেষ্টা থাকবে সৎ ব্যবসাযীরা যাতে দেশে নিশ্চিন্ত মনে বিনিয়োগ করতে পারেন সেই পরিবেশ বজায় রাখা। রাজস্ব সুবিধা দেওয়া হলে দেশের শিল্প খাতের দ্রুত বিকাশ হবে। দেশে কর্মসংস্থান বাড়বে। নিজ দেশে নিশ্চিন্ত থাকতে পারলে কেন তারা অর্থপাচার করবে।

অর্থপাচাররোধে রাজস্ববিষয়ক সহযোগিতা বাড়ানো হবে, একই সঙ্গে কঠোর ব্যবস্থাও নেওয়া হবে। এ বিষয়ে সরকারের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে এনবিআর।

বন্ড সুবিধার অপব্যবহারে বিপুল অঙ্কের অর্থপাচার বন্ধে কী পদক্ষেপ নেবেন—এমন প্রশ্নে চেয়ারম্যান বললেন, রপ্তানিমুখী শিল্পের গতিশীলতায় বন্ড সুবিধাসহ সব ধরনের সুবিধার অপব্যবহার রোধে চলমান কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে। এসব দুর্নীতি বন্ধে আরো নতুন নতুন কৌশল নেওয়া হবে।

চোরাচালান রোধে এনবিআরের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বহাল থাকবে জানিয়ে মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া বলেন, চোরাচালানের কারণে দেশের বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি হয়। সৎ ব্যবসায়ীরা অসম প্রতিযোগিতায় পড়ে। সরকার বড় অঙ্কের রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়। দেশে স্থিতিশীল অর্থনৈতিক পরিবেশ বজায় রাখতে চোরাচালান রোধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ কাজে প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া হবে।

‘কারো কাছে হাত পেতে নয়, আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসেবে বাংলাদেশকে প্রতিষ্ঠিত করতে চান প্রধানমন্ত্রী। তাঁর এ যাত্রায় আমাকে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে রাজস্ব আহরণের দায়িত্ব দিয়েছেন। আমি এ দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনে সর্বোচ্চ চেষ্টা করব,’ বললেন মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়া।



মন্তব্য