kalerkantho


উৎস থেকে সরবরাহ বাড়াবে ‘স্বপ্ন’

‘স্বপ্নগ্রাম’ থেকে সরাসরি আসবে নিরাপদ সবজি : সিইও

১৯ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



উৎস থেকে সরবরাহ বাড়াবে ‘স্বপ্ন’

কেনাকাটায় ক্রেতাদের স্বপ্ন পূরণের অঙ্গীকার নিয়ে ২০০৮ সালে যাত্রা শুরু করে ৯ বছরে দেশের সর্ববৃহৎ চেইন সুপারশপে পরিণত হয়েছে ‘স্বপ্ন’। ঢাকা ও বিভাগীয় শহরগুলোতে স্বপ্নর ৫৯টি আউটলেটে এখন প্রতিদিন গড়ে ৪০ হাজার ক্রেতা বাজার করে।

সুপারশপের মোট বাজারের ৪৫ শতাংশ একাই দখল করেছে স্বপ্ন। গ্লোবাল গ্যাপের স্বীকৃতির পাশাপাশি দেশের সেরা রিটেইল চেইন সুপারশপ ব্র্যান্ডের স্বীকৃতিও পেয়েছে এসিআই গ্রুপের এই অঙ্গপ্রতিষ্ঠান। এসিআই লজিস্টিকসের (স্বপ্ন) নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির জানান, ক্রেতাদের আরো নিরাপদ খাদ্যপণ্য সরবরাহে শুরু হচ্ছে ‘স্বপ্নগ্রাম’ নামে নতুন উদ্যোগ। তাঁর বিশ্বাস, এর মাধ্যমে ভোক্তা তার স্বপ্নের তরিতরকারি যেমন পাবে, তেমনি গ্রামের কৃষকও উত্পাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে। কালের কণ্ঠ’র বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমীকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে ‘স্বপ্ন’ নিয়ে নানা পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।

 

‘কষ্টের টাকায় শ্রেষ্ঠ বাজার’—এই স্লোগানেই ভোক্তাদের প্রতি তাঁদের প্রতিশ্রুতির প্রতিফলন রয়েছে বলে জানান এসিআই লজিস্টিকস লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক সাব্বির হাসান নাসির। তিনি বলেন, ‘সুপারশপে সবাই উচ্চবিত্তদের টার্গেট করে। কিন্তু আমাদের সুপারশপ সবার জন্য। সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সরবরাহ করায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তরাও কাঁচাবাজার ছেড়ে স্বপ্নে আসা শুরু করেছে।

ক্রেতাদের স্বপ্ন পূরণে আমরা প্রতিদিন চেষ্টা করি নতুন কিছু দেওয়ার। ’

২০১৬ সালে মেলওয়ার্ড ব্রাউন এবং বাংলাদেশ ব্র্যান্ড ফোরাম স্বপ্নকে সেরা সুপারমার্কেট ব্র্যান্ড হিসেবে পুরস্কার দিয়েছে। ব্র্যান্ড ইকুয়িটি রেটিংয়েও স্বপ্ন তার প্রতিযোগী অন্যান্য ব্র্যান্ড থেকে অনেক এগিয়ে। স্বপ্নই এই উপমহাদেশের মধ্যে প্রথম গ্লোবাল গ্যাপের সদস্যপদ পেয়েছে বলে জানালেন সাব্বির হাসান। গ্রাহকদের আস্থা অর্জনই স্বপ্নর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এ বছর আমরা সেরা ব্র্যান্ড হওয়ারও গৌরব অর্জন করেছি। এতে প্রতীয়মান হয়, স্বপ্নের প্রতি ভোক্তা আস্থা বেড়েছে। ’

তৃণমূলে গিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করছে স্বপ্ন। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ৬৫ শতাংশের বেশি শাকসবজি, মাছ, মাংস ও ফল উৎস থেকে নিজস্ব তত্ত্বাবধানে আসছে। এর মাধ্যমে একদিকে কৃষকরা মধ্যস্বত্বভোগীদের এড়িয়ে ন্যায্যমূল্যে সরাসরি স্বপ্নতে পণ্য সরবরাহ করতে পারছে। অন্যদিকে ক্রেতারাও উৎস থেকে আসা টাটকা পণ্য ন্যায্যমূল্যে কিনতে পারছে। ভবিষ্যতে ৯০ শতাংশ পণ্যই উৎস থেকে সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ‘স্বপ্নগ্রাম’ নামের এ বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে সংগঠিত কৃষকরা স্বপ্নর তত্ত্বাবধানে কৃষিপণ্য উত্পাদন করবে। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ নির্বাহী বলেন, “আমরা দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ‘স্বপ্নগ্রাম’ তৈরির কাজ করছি। এখানে নিজস্ব বীজ, অর্গানিক সার দিয়ে নিরাপদ কৃষিপণ্য উত্পাদন করা হবে। ” এসব পণ্যকে শতভাগ অর্গানিক বলা যাবে না, তবে ক্রেতাদের হাতে নিরাপদ ও বিষমুক্ত খাদ্যপণ্য পৌঁছে দেওয়ার একটি ব্যবস্থা তাঁরা করছেন—জোর দিয়ে এ বার্তাই দিলেন তিনি। সাভার, পাবনাসহ এ বছর পাঁচটি স্বপ্নগ্রাম তৈরির পরিকল্পনা রয়েছে তাঁদের।

সুপারমার্কেটের সবজি কাঁচাবাজারের পণ্যের মতো সতেজ নয় এ ধারণা ভাঙার জন্য সাপ্লাই চেইনে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে স্বপ্ন। উৎস থেকে আউটলেটের সরাসরি সংযোগ স্থাপিত হচ্ছে। আগে তৃণমূল থেকে পণ্য এনে কারওয়ান বাজারের একটি সেন্টার থেকে বিভিন্ন আউটলেটে পাঠানো হতো। এখন মাঠ থেকে সরাসরি আউটলেটে পণ্য চলে যায়। কৃষকের কাছ থেকে লাউ, জালি, শসা কিনে কাগজে মুড়িয়ে সরাসরি আউটলেটে আনা হচ্ছে। ‘কৃষিপণ্য ক্ষেতে দেখতে যেমন আউলেটেও তেমন রাখার চেষ্টা করছি। আমাদের সবজিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭০ শতাংশ। এটাও প্রমাণ করে আমাদের পণ্যে ভোক্তারা আস্থা রাখছে। ’

গ্রাহকদের আরো ভালোমানের পণ্য তুলে দিতে বিভিন্ন উদ্যোগের কথাও জানালেন সাব্বির হাসান নাসির। তিনি বলেন, ‘এ বছর আমরা সোর্স পয়েন্টগুলোতে কুল চেইন স্থাপন করতে যাচ্ছি। এ ছাড়া আমরা বিশেষ ধরনের চিলারভ্যানও বানাতে চাই। ডিমের ক্ষেত্রেও সরবরাহকারীদের সঙ্গে বিশেষভাবে কাজ করছি যাতে পুরো প্রক্রিয়াতে মান নিয়ন্ত্রণ করে গ্রাহকদের ভালোমানের ডিম সরবরাহ করা যায়। ’

বিশ্বের সেরা খুচরা বিক্রেতাদের ‘গ্লোবাল গ্যাপ’ সার্টিফিকেশন দিয়ে থাকে। গত বছর এই উপমহাদেশে প্রথম রিটেইলার হিসেবে ‘স্বপ্ন’ই গ্লোবাল গ্যাপের সদস্যপদ পেয়েছে বলে জানালেন সাব্বির হাসান। আমরা নিরাপদ খাদ্যপণ্য সরবরাহে গ্লোবাল গ্যাপের অভিজ্ঞতাও কাজে লাগানোর চেষ্টা করছি। আমাদের মূল প্রতিষ্ঠান এসিআই এবং গ্লোবাল গ্যাপের সহায়তায় আমরা একটি ‘নলেজ হাব’ তৈরি করতে যাচ্ছি। এর মাধ্যমেই স্বপ্ন ভবিষ্যতে নতুন পথে যাত্রা শুরু করবে।

স্বপ্নর আউটলেটগুলোতে ভোক্তার সংখ্যা ২০ শতাংশ করে বাড়ছে। প্রতিদিন এ সংখ্যা প্রায় ৪০ হাজার। এ তথ্য দিয়ে এসিআই লজিস্টিকসের নির্বাহী পরিচালক বলেন, সুপারমার্কেটের ৪৫ শতাংশ বাজার এখন স্বপ্নর দখলে। গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণ করতে এ বছর আরো আউটলেট খোলার পাশাপাশি অনলাইনেও পণ্য বিক্রি শুরু করবে স্বপ্ন। পাশাপাশি ফ্র্যাঞ্চাইজ নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে সম্প্রসারণ করা হবে।

ঢাকায় মাংস ব্যবসায়ীদের ধর্মঘটের মধ্যেও স্বপ্ন গ্রাহকদের গরুর মাংস সরবরাহ করেছে। প্রচলিত বাজার সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে কাজ করতে গিয়ে নানা বাধা আসছে। এসব বাধা পার হয়ে গ্রাহকদের পাশে দাঁড়াতে সরকারের সমর্থন দরকার হলেও তা পাওয়া যায় না, বরং অনেক সময় বৈষম্যের শিকার হতে হয় তাদের।

উদাহরণ টেনে সাব্বির হাসান বললেন, ভ্যাটের ক্ষেত্রে আমরা বৈষম্যের শিকার। যেখান থেকে ভ্যাট পাওয়া যায় না সেই প্রচলিত বাজারে কোনো অভিযান নেই। কিন্তু যত অভিযান সুপারশপকে ঘিরে। মোবাইল কোর্ট নিয়ে আমাদের আপত্তি নেই। মোবাইল কোর্ট আমাদের যেসব পণ্য পরীক্ষা করতে চায়, সেটা খালি চোখে না দেখে একটা ল্যাবে পাঠানো হোক। তা না করে একটা বিরাট বহর নিয়ে আমাদের স্টোরে এসে পুলিশ-র‌্যাব নিয়ে একটা ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি করা হয়। ভোক্তা অধিকার, ডিএমপি এবং সিটি করপোরেশনের তিনটি কোর্টের একই নীতিমালা হওয়া উচিত। এ ছাড়া আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া উচিত। আমাদের পুরনো সুনাম আছে, ব্র্যান্ড আছে, যেটা রক্ষা করায় সরকারেরও দায়িত্ব আছে।

ভালোমানের পণ্য দিতে ভোক্তাদের কাছে স্বপ্ন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ উল্লেখ করে সিইও বলেন, পচনশীল পণ্যে কখনো ভুলভ্রান্তি হবে না এই নিশ্চয়তা পৃথিবীর কোনো সুপারশপ দিতে পারে না। যদি ভুল হয়েও যায় তাহলে গ্রাহক একমাত্র সুপারশপেই পণ্য ফিরিয়ে নিতে পারে। ‘গ্রাহকরা যেখানে সুন্দর পরিবেশে ভোগান্তি ছাড়া পণ্য কিনতে পারে, কৃষক যেখানে ন্যায্যমূল্য পায়—সেই ব্যবসাকে সরকারের সহযোগিতা করা উচিত। কিন্তু আমরা তার উল্টো চিত্র দেখতে পাই। আমরা উত্পাদন পর্যায়ে ভ্যাট দিচ্ছি। গ্রাহকদের সুপারশপে আনতে ভ্যাটের এখনো কিছুটা আমরা বহন করছি বলে আমাদের মুনাফা আসে না। সরকার যদি ভ্যাট উঠিয়ে দিত তাহলে আজ থেকেই আমরা মুনাফায় যেতে পারতাম। ’

নতুন ভ্যাট আইন জুলাই থেকে কার্যকর হলে অনেকগুলো প্রতিক্রিয়া তৈরি হবে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে স্বপ্নর প্রধান নির্বাহী বলেন, ‘১৫ শতাংশ ভ্যাট দিয়ে সুপারশপ থেকে পণ্য কিনতে ক্রেতা নিরুৎসাহিত হবে। আমরা মুনাফা করি ১৬ থেকে ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে গ্রাহক ধরে রাখতে ভ্যাটের টাকাও আমাদের ভর্তুকি দিতে হলে এতে আমরা টিকে থাকব কিভাবে?’

শুধু টাটকা সবজি, ফল, মাছ, মাংস নয়, আমদানি করা খাদ্যপণ্যেও গ্রাহকদের আস্থা অর্জন করেছে স্বপ্ন। গ্রাহকের আয় বাড়ার সঙ্গে স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়ছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যকর এবং নিরাপদ খাবারের চাহিদা আরো বাড়বে। চাহিদার এ বিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে এগিয়ে চলার চেষ্টা করছে স্বপ্ন। প্রতিষ্ঠানটির শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ‘মানুষের আয় বাড়ছে, জীবনযাত্রা দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছে। এতে ব্যস্ত জীবনে ওই আয় করা মানুষটি কাঁচাবাজারে যাওয়ার সময় পাচ্ছে না। অনেক সময় বাসার গৃহিণীরা বাজার করছেন। তাঁরা একটি নিরাপদ ও আস্থার পরিবেশ চান। স্বপ্ন সেই জায়গাটি নিশ্চিত করতে চায়। ’


মন্তব্য