kalerkantho


‘বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়া যায় বিদ্যা ও কর্মের সংমিশ্রণে’

শিমুল নজরুল, চট্টগ্রাম   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



‘বিন্দু থেকে সিন্ধু গড়া যায় বিদ্যা ও কর্মের সংমিশ্রণে’

মাত্র ১০০ টাকা বেতনে জীবনের প্রথম চাকরি শুরু করেন তিনি। এরপর যোগ দেন ব্যাংকে। সেখানেও মন বসাতে পারেননি, ছিলেন সাত বছর। এরপর মনস্থির করেন ব্যবসা করবেন। ১৯৭২ সালে শুরু করেন ব্যবসা। খাতুনগঞ্জে এক পরিচিত ব্যবসায়ীর সহযোগিতায় শুরু করেন আমদানি-রপ্তানি ব্যবসা। তাঁর বয়স তখন ২৯ বছর। সফলতার মুখ দেখতে শুরু করেন। এরপর নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এগোতে থাকেন। সেই ব্যক্তির নাম মিজানুর রহমান। সবচেয়ে বেশি পরিচিত সুফি মিজান নামে।

৭৪ বছর বয়সী এ মানুষটির তিলে তিলে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান পরিচিত ‘পিএইচপি ফ্যামিলি’ নামে।

আজ ১২ মার্চ সুফি মিজানুর রহমানের জন্মদিন। তিনি ১৯৪৩ সালের ১২ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। আমদানি-রপ্তানি নিয়ে শুরু করা ৭৪ বছর বয়সী এ ব্যবসায়ী মানুষটির বয়স যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে পিএইচপি ফ্যামিলি। অর্থাৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা। বর্তমানে পিএইচপিতে ২৩টি শিল্প-কারখানা রয়েছে। তাঁর এসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করছে ১০ হাজারের বেশি কর্মী। ঢেউটিন, ফ্লোটগ্লাস, কোল্ড রোল, শিপইয়ার্ড এবং নির্মাণাধীন গাড়ি সংযোজন প্রতিষ্ঠানসহ ২৩টি প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে বার্ষিক টার্নওভার পাঁচ হাজার কোটি টাকা। প্রতিবছর সরকারকে রাজস্ব দেন ৫০০ থেকে ৬০০ কোটি টাকা। সততা, নিষ্ঠা ও একাগ্রতার কারণে এই ব্যক্তির গড়ে তোলা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন রূপান্তর হয়েছে দেশের বৃহৎ শিল্প গ্রুপে।

খুবই মিষ্টভাষী সুফি মিজানুর রহমান বলেন, ‘বিদ্যার সাথে বিনয়, শিক্ষার সাথে দীক্ষা, কর্মের সাথে নিষ্ঠা, জীবনের সাথে দেশপ্রেম এবং মানবীয় গুণাবলির সংমিশ্রণ ঘটাতে পারলে বিন্দু থেকে সিন্ধুও গড়া যায়। ’ সভা-সেমিনারে নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে এই কথাগুলো বলে তিনি সবাইকে উদ্বুদ্ধ করেন। সুফি মিজান স্বপ্ন দেখেন, দেশে শিল্প বিপ্লবের। তিনি স্বপ্ন দেখেন, শিল্পোন্নত দেশের কাতারে থাকবে ‘বাংলাদেশ’—সেটা বেশি দূর নয়।

নারায়ণগঞ্জের সরকারি তোলারাম কলেজে উচ্চ মাধ্যমিক পড়া অবস্থায় জীবিকার খোঁজে নারায়ণগঞ্জের জালাল জুট ভ্যালি কম্পানিতে চাকরি শুরু করেন তিনি। তখন বেতন ছিল ১০০ টাকা। কিন্তু পুরোদমে চাকরি শুরু ১৯৬৫ সালে। তৎকালীন ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের চট্টগ্রামের লালদীঘি শাখায় জুনিয়র ক্লার্কের চাকরি দিয়ে। প্রথম পূর্ণাঙ্গ চাকরিতে বেতন ছিল ১৬৭ টাকা। বেশি দিন এ চাকরি করা হয়নি তাঁর। ১৯৬৭ সালে ব্যাংক পাল্টে যোগ দেন তৎকালীন ইস্টার্ন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের (পূবালী ব্যাংক) চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জ শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে। এবার বেতন দাঁড়ায় ৮০০ টাকা। এভাবে সাত বছর ব্যাংকে চাকরি করেন তিনি।

চাকরি ছেড়ে ১৯৭২ সালে প্রবেশ করেন ব্যবসায়। তিনি একে একে গড়ে তোলেন ২৩টি শিল্পপ্রতিষ্ঠান। সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে সেই ব্যবসায় দায়িত্ব দিয়ে পরিচালনার উপযোগী করে তুলেছেন। বাবার আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়েই এখন সব প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন সন্তানরা। কিন্তু তদারকি করেন বাবা সুফি মিজানুর রহমান।

জানা গেছে, ১৯৮২ সালে সীতাকুণ্ডে একটি শিপইয়ার্ড স্থাপনের মাধ্যমে শিল্প জগতে যাত্রা শুরু করেন সুফি মিজানুর রহমান। তারপর ১৯৮৪ সালে মংলা ইঞ্জিনিয়ার্স ওয়ার্কস নামে দেশের প্রথম বিলেট তৈরির কারখানা স্থাপন করেন তিনি। ১৯৮৬ সালে ঢাকায় ঢেউটিন কারখানা, ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রামের কুমিরায় সিআর (কোল্ড রোল) কয়েলের কারখানা স্থাপন করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৯৭ সালের ২২ জুলাই প্রতিষ্ঠা হয় পিএইচপি ফ্যামিলি।

এরপর সুফি মিজানুর রহমান ২০০৪ সালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের সীতাকুণ্ডে গড়ে তোলেন অত্যাধুনিক ফ্লোট কাচের কারখানা।

মালয়েশিয়ার গাড়ি নির্মাতা কম্পানি প্রোটনের সঙ্গে একত্র হয়েই বাংলাদেশে প্রোটন গাড়ি তৈরি করবে পিএইচপি। নগরের গ্রিনভিউ এলাকায় প্রায় সমাপ্তির পথে এই গাড়ি কারখানা প্রকল্পের কাজ।


মন্তব্য