kalerkantho


লাগাম নেই চিনির দামে

শওকত আলী   

১২ মার্চ, ২০১৭ ০০:০০



লাগাম নেই চিনির দামে

আন্তর্জাতিক বাজারের ধারাবাহিকতায় দেশের বাজারেও বাড়ছে চিনির দাম। এক বছরের ব্যবধানে ভোক্তা পর্যায়ে প্রতি কেজি চিনির দাম ৫০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে প্রতি কেজি চিনি ৪৮ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। চলতি বছরের একই সময়ে এই চিনি বিক্রি হয় ৭০-৭৬ টাকায়। অর্থাৎ এই সময়ের মধ্যে প্রতি কেজি চিনিতে দাম বেড়েছে ২০-২৫ টাকা।

তবে ঢাকার বেশ কয়েকটি পাইকারি ও খুচরা বাজার এবং টিসিবি থেকে জানা গেছে, গত এক মাসের ব্যবধানেই চিনির দাম বেড়েছে ৮-১০ টাকা। চিনির আমদানি শুল্ক বৃদ্ধির ঘটনা পুরনো হলেও সেটিকে নিয়ে এখনো দাম নিয়মিতভাবে বাড়িয়ে যাচ্ছে ব্যবসায়ীরা।

জানা গেছে, প্রতি কেজি খোলা চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকায়। প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৭৬ টাকায়। এর মধ্যে সিটি গ্রুপের তীর ব্র্যান্ডের প্রতি কেজি চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭৬ টাকায়। মেঘনা গ্রুপের ফ্রেশ ব্র্যান্ডের চিনি বিক্রি হচ্ছে ৭২-৭৫ টাকায়।

যদিও গায়ে দাম লেখা রয়েছে ৬৯ টাকা। এ ছাড়া দিলকুশায় চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের বিভিন্ন মিলে উৎপাদিত প্যাকেটজাত চিনি বিক্রি হচ্ছে ৬৫ টাকায়।

কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের আল-আমিন ট্রেডার্সের বিক্রেতা কামাল বলেন, ‘গত এক মাস থেকে চিনির দাম একটু বাড়তি। খোলা চিনি ৭০ টাকা, আর প্যাকেটের চিনি ৭২-৭৫ টাকায় খুচরা বেচতাছি। আমরা বেশি দামে কিনি, এ জন্য বেশি দামে বেচতাছি। ’

ব্যবসায়ীরা বলছে, চিনির বর্ধিত আমদানি শুল্ক বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পরিশোধিত-অপরিশোধিত চিনির দাম বেড়ে যাওয়াই এর প্রধান কারণ। তাদের মতে, সামনে চিনির দাম আরো বাড়তে পারে। কারণ তারা যে দামে চিনি বিক্রি করছে, তাতে করে লাভ করতে পারছে না।

সর্বশেষ দাম বৃদ্ধির কারণ জানতে চাইলে সিটি গ্রুপের মহাব্যবস্থাপক বিশ্বজিৎ সাহা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে র-সুগারের দাম বেড়েছে। পরিশোধিত চিনির দামও বেড়েছে। আমাদের টনপ্রতি শুল্কায়ন ১০ গুণ বেড়েছে। ফলে উৎপাদন খরচ পড়ছে ৬৪ টাকা। বিক্রি করছি ৬৮ টাকা। সামনে এটা আরো বাড়বে। কারণ আমাদেরও তো লাভ করতে হবে। ’

উল্লেখ্য, গত বছর পরিশোধিত-অপরিশোধিত দুই ধররের চিনি আমদানিতেই ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর আরোপ করা হয়। সেই সঙ্গে সংরক্ষণমূলক শুল্ক আরোপ করা হয়েছে ২০ শতাংশ। এর ফলে টনপ্রতি পরিশোধিত চিনির ক্ষেত্রে চার হাজার টাকা এবং অপরিশোধিত চিনির ক্ষেত্রে দুই হাজার টাকা করে শুল্ক প্রদান করতে হচ্ছে। নতুন করে শুল্কায়নের ঘোষণা আসার আগেই ব্যবসায়ীরা চিনির দাম বৃদ্ধি করেছিল। শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণার পর আরেক দফা দাম বৃদ্ধি করা হয়। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে দাম বেড়ে ৪৮-৫০ টাকার চিনি এখন ৭০ থেকে ৭৬ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চিনি ব্যবসায়ী সমিতির সহসভাপতি আবুল হাশেম বলেন, ‘কনটেইনারে পণ্য ছাড়াতে আমাদের খরচ বেশি হচ্ছে। সে অনুযায়ী দাম যেটা বেড়েছে সেটা স্বাভাবিক। কোনো অসুবিধা তো দেখছি না। তবে আমরা পাইকারি বিক্রেতারা খুব একটা ভালো নেই। বিক্রি কমে গেছে। ’

বাংলাদেশে চিনি ও খাদ্য শিল্প করপোরেশনের তথ্যানুযায়ী, বছরে দেশে প্রায় ১৮ লাখ মেট্রিক টন চিনির চাহিদা রয়েছে। এর মধ্যে দুই লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদিত হয়। সেটা চিনি শিল্প করপোরেশনের ১৫টি চিনিকলের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয়। বাকি চাহিদা পূরণ করা হয় পুরোপুরি আমদানি করে। বেসরকারিভাবে সিটি গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপের মতো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান পরিশোধিত ও অপরিশোধিত চিনি আমদানি করে দেশের চাহিদা পূরণ করে থাকে। অর্থাৎ পুরো চিনির বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় বেসরকারি খাত থেকেই।

এদিকে বাজারের দাম ও টিসিবির তালিকায় ভিন্নতা রয়েছে। বাজারে ৭০ টাকার ওপরে চিনি বিক্রি হলেও তাদের মূল্য তালিকায় দেখা যাচ্ছে ৬৮-৭০ টাকায় চিনি বিক্রি হচ্ছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে টিসিবির তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘আমরা ঢাকার ১৭টি বাজার থেকে দাম সংগ্রহ করি। তারপর সেটা সমন্বয় করে থাকি। সামান্য কিছু দোকানে চিনির দাম বেড়ে গেলে সেটা তো দেখানো যায় না। ’ এ ছাড়া টিসিবি ৫৫ টাকায় চিনি বিক্রি করে বলে জানিয়েছেন এই কর্মকর্তা।

দাম বাড়ছে বিশ্ববাজারেও : জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬ সালে টানা ঊর্ধ্বমুখী ছিল চিনির আন্তর্জাতিক বাজার। সার্বিক হিসাবে গত বছর দাম বেড়েছে ৩৪.২ শতাংশ। ২০১৭ সালের প্রথম মাস জানুয়ারিতেই ৯.৯ শতাংশ দাম বাড়ে।

এফএও জানায়, ২০১৬-১৭ মৌসুমে চিনি উৎপাদন কমবে—এমন আশঙ্কা থেকেই নতুন বছরের প্রথম মাসে দাম বেড়েছে। বিশেষ করে বিশ্বের সবচেয়ে বড় চিনি উৎপাদন ও রপ্তানিকারক দেশ ব্রাজিলসহ ভারত ও থাইল্যান্ডে উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। সম্প্রতি ভারতে চিনি উৎপাদন ৯ শতাংশের ওপরে কমার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে দেশটিতে কয়েক ডজন চিনি কারখানা বন্ধ করে দিতে হয়েছে আখের অভাবে।


মন্তব্য