kalerkantho


দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য চাই শক্ত অবকাঠামো

২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



দ্রুত প্রবৃদ্ধির জন্য চাই শক্ত অবকাঠামো

শিল্প বিপ্লবে যেসব দেশ এগিয়ে ছিল, তারাই এখন বিশ্ব অর্থনীতির নিয়ন্ত্রক। কৃষি থেকে শিল্পের পথে পা বাড়িয়ে সাফল্যের ছোঁয়া পেয়েছে বাংলাদেশও।

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) খাত এ দেশের সামনে খুলে দিয়েছে উজ্জ্বল সম্ভাবনার দুয়ার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি, বন্দর, যোগাযোগসহ সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগ বাড়ানোর মধ্য দিয়ে বিশ্বে দ্রুততর প্রবৃদ্ধির দেশ হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ। এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেন সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান মুহাম্মদ আজিজ খান। তাঁর মতে, বিনিয়োগ, প্রবৃদ্ধি, সমৃদ্ধি প্রতিটির জন্যই চাই সামগ্রিক অবকাঠামোগত সক্ষমতা। কালের কণ্ঠ’র বিজনেস এডিটর মাসুদ রুমীকে দেওয়া এক সাক্ষাতকারে বিদ্যুৎ, জ্বালানিসহ সার্বিক অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে নিজের পরিকল্পনার কথা জানান দেশের বেসরকারি বিদ্যুৎ খাতের এই পথিকৃৎ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটে স্নাতক পড়ার সময় মাথায় ঢোকে ব্যবসার পোকা। এক বছরের মধ্যে ফেরত দেওয়ার শর্তে বাবার কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা ধার নিয়ে এক বন্ধুর সঙ্গে কস্টিক সোডার ব্যবসায় নামেন মুহাম্মদ আজিজ খান। এক বছরের মাথায় ১৯৭৩ সালে কিনে নেন টঙ্গীর প্লাস্টিক ইন্ডাস্ট্রি ‘হাফিজ ব্রাদার্স’। উদ্যোক্তা হিসেবে সামিট গ্রুপের কর্ণধারের পথচলা শুরু এভাবে।

অর্থনৈতিক উন্নতির জন্য বিদ্যুৎ অপরিহার্য—এ উপলব্ধি থেকে ১৯৯৮ সালে সামিট দেশের প্রথম স্বতন্ত্র বিদ্যুৎকন্দ্র স্থাপন করে যৌথ উদ্যোগে। বর্তমানে এককভাবে সামিটের বিদ্যুৎ উতপাদনের পরিমাণ ১৫০০ মেগাওয়াট, যা দেশের বেসরকারি খাতের কম্পানিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি।

পরে সামিটের ব্যবসা বিস্তৃত হয় জ্বালানি, বন্দর, শিপিং, হসপিটালিটি ও তথ্য-প্রযুক্তি খাতে। বর্তমানে এই গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সাত হাজারের বেশি মানুষ কাজ করে। বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি অফ-ডক ফেসিলিট ওশান কনটেইনারস লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করে সামিট, যেটি বর্তমানে সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টস লিমিটেড নামে পারিচিত। এর মাধ্যমে বর্তমানে দেশের রপ্তানির প্রায় ২০ শতাংশ এবং আমদানির প্রায় ১০ শতাংশ হ্যান্ডলিং করা যায়। এ ছাড়া দেশের তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে অবকাঠামো সেবায় প্রতিষ্ঠিত হয় সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড। এটি বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত ও মিয়ানমারকে যুক্ত করেছে টেরিস্ট্রিয়াল ফাইবার অপটিকসের মাধ্যমে। এই শিল্পগোষ্ঠীর হসপিটালিটি ও রিয়েল এস্টেট কম্পানি ইপকো লিমিটেড তৈরি করেছে একটি পাঁচতারা হোটেল, একটি চারতারা হোটেল, কনভেনশন হলসহ নানা স্থাপনা। সামিট করপোরেশনের প্রতিষ্ঠান সামিট পাওয়ার লিমিটেড, সামিট অ্যালায়েন্স পোর্টস লিমিটেড এবং খুলনা পাওয়ার কম্পানি লিমিটেড ঢাকা ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত, যার সম্মিলিত বাজার মূলধন প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা।

সামিট গ্রুপের জন্য ২০১৬ সালকে সৃষ্টির বছর উল্লেখ করে মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘গত বছর পূর্ণ বেগে আমাদের প্রতিটি কম্পানি বিদ্যুৎ উতপাদন করেছে। আমরা ১৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উতপাদন করছি। আমাদের সামিট কমিউনিকেশন লিমিটেড ৩০ হাজার কিলোমিটার ফাইবার অপটিক লাইন দিয়েছে। বাংলাদেশের দুর্গম পাহাড়ি জেলাগুলোতে কেউ যেখানে ফাইবার অপটিক লাইন নিতে পারেনি, সেখানে তা করার সাহস দেখিয়েছে সামিট। গেল বছর বাংলাদেশের বেসরকারি খাতের প্রথম নৌবন্দর সামিট অ্যালায়েন্স পোর্ট নারায়ণগঞ্জে চালু হয়েছে। এ জন্য ২০১৬ সালকে আমরা নতুন করে যাত্রা শুরুর বছর বলে মনে করছি। একই সঙ্গে এ বছর সামিট গ্রুপের জন্য বিরাট আনন্দের এবং সৃষ্টির বছর। ’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে অর্থ সংগ্রহের লক্ষ্যে সিঙ্গাপুরে নিবন্ধিত সামিটের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পাওয়ার ইন্টারন্যাশনাল গত বছর কার্যক্রম শুরু করেছে। এ প্রসঙ্গে সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘গত বছর আমাদের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ ছিল সিঙ্গাপুরে কম্পানি করা। বাংলাদেশ সরকারের অনুমতি নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় আইএফসির অর্থায়নে আমরা প্রায় ১৭৫ মিলিয়ন ডলার মূলধন পেয়েছি। তা ছাড়া আইএফসি থেকে প্রায় ৩০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ হিসেবে পেয়েছি। এই ৪৭৫ মিলিয়ন ডলার আবার বিনিয়োগ করতে পেরেছি। ’

ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতে প্রচুর অর্থায়ন প্রয়োজন হবে উল্লেখ করে মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘বর্তমানে সবাইকে বিদ্যুৎ দিতে হলে প্রয়োজন ৩০ হাজার মেগাওয়াট। তখন মাথাপিছু আয় বেড়ে ২৫০০ ডলারে চলে যাবে। তখন বেশি উতপাদনের জন্য আবার বেশি বিদ্যুৎ লাগবে। ’ আরো ৫৯০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকন্দ্রের অনুমতির অপেক্ষায় রয়েছে সামিট। ফ্লোটিং স্টোরেজ রিগ্যাসিফিকেশন ইউনিট তথা এলএনজি টার্মিনাল প্রকল্পের জন্যও অর্থ দরকার। এসব খাতে বিনিয়োগের প্রয়োজন মেটাতে সামিট গ্রুপ সিঙ্গাপুরে অফিস নিয়েছে।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশেও ব্যবসা বিস্তৃত করেছে সামিট গ্রুপ। শ্রীলঙ্কায় ৩৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকন্দ্রে বিনিয়োগ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।

দেশে কয়লানীতি চূড়ান্ত হয়নি, গ্যাসের মজুদ ফুরিয়ে আসছে। সে ক্ষেত্রে ভবিষ্যতে বিদ্যুতের অন্যতম প্রাথমিক উৎস হতে পারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি)। সামিট গ্রুপের চেয়ারম্যান বলেন, ‘আমাদের গ্যাসক্ষেত্রে নতুন প্রযুক্তি নির্ভর অনুসন্ধান তৎপরতা চালু রাখতে হবে। একই সঙ্গে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকন্দ্র করা হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরো করতে হবে। ’

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে সরকারের অবস্থান সমর্থন করে মুহাম্মদ আজিজ খান বলেন, ‘আমাদের মাটি খুঁড়ে কয়লা বের করতে যদি পড়ে ১০ ডলার খরচ আর অন্যদের কাছ থেকে যদি আমরা তা ১০ ডলারেই কিনতে পারি তাহলে আমরা কেন মাটি খুঁড়ে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ডেকে আনব?’

কয়লার মতো বিশ্ববাজারে প্রায় সব রকমের জ্বালানির দাম কমে আসছে জানিয়ে সামিট গ্রুপের কর্ণধার বলেন, প্রাকৃতিক গ্যাস, পেট্রল, ডিজেল, ক্রুড অয়েল, কয়লা, এলএনজি—সব কিছুর দাম কমে গেছে। এটা বাংলাদেশের জন্য একটা বিরাট সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে। হেভি ফুয়েল অয়েল দিয়ে বিদ্যুৎ উতপাদনের খরচ পড়ে গেছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা, যেটা আগে ১৩ থেকে ১৪ টাকা ছিল।

বাংলাদেশে জ্বালানি সমস্যার কার্যকর সমাধান কী হতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে গ্যাসের উতপাদন বাড়ানো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নিউক্লিয়ার এনার্জি, আমদানীকৃত তেল, এলএনজি, কয়লা—প্রতিটি মিলেই আমাদের একটি টেকসই জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারি। ’

জ্বালানির দাম কমার যে সুযোগ বাংলাদেশ পাচ্ছে তা কাজে লাগিয়ে এলএনজি, এইচএফও, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকন্দ্র করা যেতে পারে বলে মনে করেন মুহাম্মদ আজিজ খান। তিনি বলেন, ‘আণবিক বিদ্যুৎতর পাশাপাশি সরকারের উচিত হিমালয় পর্বতে যে হাইড্রো-ইলেকট্রিসিটির সম্ভাবনা আছে তা কাজে লাগানোর পথ খোঁজা। সেটার জন্য ভারত ও চীনের সরকারপ্রধানকে নিয়ে বাংলাদেশ ত্রিদেশীয় আলোচনা করতে পারে। ব্রহ্মপুত্র শুরু হয়েছে চীন থেকে এবং ভারতের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে এসেছে। আমরা তিন দেশ মিলে কিভাবে ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে বিদ্যুৎ উতপাদন করে ব্যবহার করতে পারি সে ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছতে হবে। কিংবা যমুনা নদী, যেটা আমাদের দেশে পদ্মা-মেঘনা হয়ে ঢুকেছে সেই নদী কিভাবে আমরা একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারি তা নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। ’

শেয়ারবাজার থেকে বিদ্যুৎ খাতের অর্থ উত্তোলনের সম্ভাবনা কতটুকু জানতে চাইলে আজিজ খান বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতিতে ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ করতে ব্যাংকের কাছ থেকে ঋণ নিতে ৩০ শতাংশ মূলধন দিতে হয়। পৃথিবীর বড় কম্পানি জিই, সিমেন্স, সনি, মাইক্রোসফট বাজার থেকে অর্থ নিয়ে বড় হয়েছে। কিন্তু এ দেশের বাজার থেকে আমরা যদি ইকুইটি না পাই, তাহলে কিভাবে আমরা বড় বড় বিনিয়োগ করব? এই চিন্তাটা যদি আমাদের নিয়ন্ত্রক সংস্থাসহ সংশ্লিষ্ট সবাই বিশ্বাস করে, তাহলে শেয়ারবাজার থেকে আমাদের সব ধরনের মূলধন পাওয়া যাবে। ’

উদ্যোক্তাদের চলার পথ মসৃণ নয়, তার পরও তারা এগিয়ে চলেছে উল্লেখ করে সামিট গ্রুপের স্বপ্নদ্রষ্টা বলেন, ‘মুক্তবাজার অর্থনীতিতে প্রায় সব কিছুই বেসরকারি খাত করে দিয়েছে। কিন্তু আমাদের কোনো স্বীকৃতি নেই। সামিট, বসুন্ধরা গ্রুপ কেন স্বাধীনতা, একুশে পদক পায় না?’

ভবিষ্যতের বাংলাদেশের উন্নয়নে তথ্য-প্রযুক্তি খাতের সম্ভাবনা তুলে ধরে আজিজ খান বলেন, ‘এখন হচ্ছে তথ্য-প্রযুক্তি বিপ্লব। সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নে অবদান রাখছে সামিট কমিউনিকেশনস লিমিটেড। প্রতিটি ঘরে যাতে ইন্টারনেট পৌঁছে যায় তার জন্য আমরা আমাদের সর্বশক্তি নিয়োগ করব। আমার ব্যবসায়িক জীবনের দুটি স্বপ্ন হলো প্রতিটি ঘরে বিদ্যুৎ, প্রতিটি ঘরে ইন্টারনেট। এটা যদি আমরা করতে পারি তাহলে বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়ে যাবে। ’

সামিট গ্রুপের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ উতপাদন আরো বাড়ানো, শ্রীলঙ্কায় বিনিয়োগ, নারায়ণগঞ্জের মতো একইভাবে কলকাতায় বেসরকারি নদীবন্দর করার চেষ্টা করছি। ভারতের সঙ্গে যত ব্যবসা সেটা স্থলপথে না হয়ে যদি নৌপথে হয় তাহলে অনেক সাশ্রয়ী হবে। সামিট গ্রুপ কলকাতা কিংবা পাটনা থেকে সরাসরি নৌপথে পণ্য নারায়ণগঞ্জে এনে ব্যবসায়ীদের ব্যয় সাশ্রয় করতে চায়। ’

সামিট গ্রুপকে সফল করার পেছনে নিজের দর্শন তুলে ধরে আজিজ খান বলেন, ‘আমার দর্শন হচ্ছে বিরাট বড়র দিকে তাকানো, সেই দিকে যাওয়া। আমাদের এই যাত্রাপথ ১৬ কোটি মানুষকে নিয়ে। শুধু মুনাফার জন্য ব্যবসা করছি না। আমার পুরো ব্যবসাকেই আমি করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (সিএসআর) মনে করি। ’


মন্তব্য