kalerkantho


বীমা খাতের অগ্রগতিতে বড় বাধা আস্থার অভাব

শওকত আলী   

১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



বীমা খাতের অগ্রগতিতে বড় বাধা আস্থার অভাব

নানা সমস্যায় জর্জরিত দেশের বীমা খাত। এর মধ্যে প্রধান সমস্যা ইমেজ সংকট।

কম্পানিগুলো গ্রাহকদের যেসব বিষয়ে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে তার বেশির ভাগই পূরণ করে না। বিশেষ করে একটি স্কিমের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর বীমা দাবি পূরণ করা নিয়ে জটিলতা একটি নিয়মিত সমস্যা। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশন (বিআইএ) আয়োজিত এক সেমিনারে বাংলাদেশের বীমা খাতের সার্বিক বিষয় নিয়ে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত উল ইসলাম।

‘বাংলাদেশের বীমা খাতের ব্যবসায় সমস্যা ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক এ প্রবন্ধে বলা হয়, দেশের বীমা কম্পানিগুলো তাদের গ্রাহকদের যেসব প্রতিশ্রুতি প্রদান করে, তা ঠিকঠাকভাবে পালন করে না। বিভিন্ন আকর্ষণীয় অফার দিয়ে গ্রাহকদের বীমা করানো হয়। কিন্তু স্কিমের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার পর বীমা দাবি পূরণে নানাভাবে গড়িমসি করা হয়, যা অনৈতিক আচরণ। এতে কম্পানিগুলো সম্পর্কে গ্রাহকদের মধ্যে খারাপ ধারণা তৈরি হয়। সমস্যাটি পুরো খাতের প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। পাশাপাশি বীমা দাবি পূরণের আগে দীর্ঘসূত্রতা ও নানা ধরনের সমস্যা তুলে ধরা, ভুল তথ্য প্রদান এবং অবৈধ কমিশন নেওয়া এ খাতের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

  

এর পাশাপাশি মূলধন সমস্যায়ও ভুগছে বীমা কম্পানিগুলো। অনেক কম্পানির কম মূলধন থাকায় অর্থিক দুর্বলতা কাটাতে পারছে না। এতে তারা ব্যবসার মধ্যে অনেক অবৈধ পন্থা যুক্ত করে। সাম্প্রতিক সময়ে বীমা কম্পানিগুলোর ভালো প্রিমিয়াম আয় করছে। তার পরও দেখা গেছে অনেক কম্পানিরই মূলধন ও বিনিয়োগের অবস্থা খুব একটা ভালো নয়। ইনস্যুরেন্স কম্পানির সংখ্যা যে পরিমাণ বেড়েছে সে তুলনায় তাদের মূলধন বাড়েনি। এতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হলো অনেক কম্পানি বছরজুড়ে যা আয় করেছে তার চেয়ে পরিচালন ব্যয় বেশি।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআর) তথ্যানুযায়ী, দেশের অধিকাংশ মানুষই এখনো বীমা সুবিধার বাইরে রয়েছে। যাদের আসলে বীমা সম্পর্কে কোনো প্রকার ধারণাই নেই। প্রতি এক হাজার মানুষের মধ্যে মাত্র চারজনের লাইফ ইনস্যুরেন্স পলিসি করা আছে। বাকিরা এটাকে অপ্রয়োজনীয় এবং ঝামেলাপূর্ণ কাজ বলে মনে করে। অন্যদিকে বীমা কম্পানিগুলোর যেসব শাখা রয়েছে তার অধিকাংশই হচ্ছে শহরে। গ্রামীণ এলাকায় খুবই কম শাখা রয়েছে। যে কারণে অনেক মানুষ ইনস্যুরেন্সের ছাতার মধ্যে আসতে পারছে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেখানে ব্যাংকগুলোকে বাধ্য করেছে গ্রামে একটি নির্দিষ্ট হারে শাখা খোলার জন্য, সেখানে বীমা কম্পানিগুলোর জন্য এ ধরনের কোনো নীতিই নেই।

এ ছাড়া দক্ষ কর্মকর্তা এবং এজেন্টের অভাবে বীমা খাতের কাজগুলো যথাযথভাবে হচ্ছে না বলে জানা গেছে। যা এ খাতের উন্নয়নে একটি বড় বাধা। যাঁরা গ্রাহককে ঠিকমতো বোঝাতে পারেন না, মার্কেটিং করতে পারেন না, একটি পলিসির যে পরিমাণ তথ্য থাকে তার সবটুকু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নিজেই জানেন না। ফলে গ্রাহকের আগ্রহ থাকলেও তাঁর সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে ব্যর্থ হন এজেন্টরা। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এজেন্টরা গ্রাহকের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তা তাঁর কম্পানিতে জমাই দেন না। এসব কর্মকর্তা ও এজেন্টকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ প্রদানেরও কোনো ব্যবস্থা নেই। কম্পানিগুলোও প্রশিক্ষণের বিষয়ে খুব একটা মাথা ঘামায় না, যা দক্ষ কর্মকর্তার বড় একটি সংকট তৈরি করেছে এ খাতে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে বিআইএর প্রেসিডেন্ট শেখ কবির হোসেন কালের কণ্ঠ’কে বলেন, কম্পানিগুলো নানা ধরনের সংকটে ভুগছে এ কথা সত্য। এর জন্য যেসব বিষয় প্রয়োজন সেসব বিষয়ে কেউই কথা বলে না। না কম্পানি, না আইডিআরএ। এ ক্ষেত্রে আইডিআরের বড় ভূমিকা রাখার কথা থাকলেও তা তারা রাখতে পারছে না। তারা শুধু জরিমানা করেই ক্ষান্ত। কিন্তু যদি তারা কম্পানিগুলোকে নীতি পালনে জোর দেয়, ট্রেনিংয়ের জন্য জোর দেয়, তাহলে কম্পানিগুলো অগোছালো চলতে পারে না। এ বিষয়টি দেখা উচিত।

গবেষণা প্রবন্ধে আরো বলা হয়েছে, গ্রাহকের চাহিদা এবং ক্যাটাগরি অনুযায়ী নতুন নতুন পণ্য নিয়ে আসতে পারে না তারা। ফলে নতুন নতুন গ্রাহকও তারা পায় না। এর পাশাপাশি দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থাও বীমা খাতের উন্নয়নে প্রতিবন্ধক বলে মনে করেন প্রবন্ধকার। এতে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশের আশপাশে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমাদের মাথাপিছু আয় এক হাজার ৩৮৫ মার্কিন ডলার, যা অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশ যেমন ভারত, চীন ও পাকিস্তানের তুলনায় খুব একটা ভালো অবস্থানে নেই। এ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মানুষা তাদের আকস্মিক বিপদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে খুব বেশি ব্যয় করতে পারবে না। এটা অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয়। দেশের সার্বিক আর্থিক অবস্থাই বীমা ব্যবসার জন্য একটি বাধা।

এসব সমস্যা দূর করতে পারলে ভবিষ্যতে বীমা কম্পানিগুলো আরো বেশি শক্তিশালী হবে উল্লেখ করে বলা হয়, আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো বীমা খাতও একটি মাধ্যম। তবে মানুষ সাধারণভাবে ব্যাংকনির্ভর, যা একটি কমন ধারণা। মানুষ ব্যাংকের কাছে যায় টাকা সঞ্চয়ের উদ্দেশ্যে এবং সেখান থেকে কিছু আয় করা। কিন্তু মানুষকে যদি এটা নিশ্চিত করা যায় যে বীমা খাতে টাকা সঞ্চয়ের পাশাপাশি জীবন এবং সম্পদের একটি ভালো নিরাপত্তা রয়েছে, তাহলে এ খাতে গ্রাহকরা আকৃষ্ট হবে।

এ বিষয়ে আইডিআরের সদস্য ও মুখপাত্র যুবের আহমেদ খান বলেন, ‘বীমা খাতে নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে আমরা কাজ করছি। সমস্যাগুলো দূর করতে হলে প্রথমত কম্পানিগুলোকে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করতে হবে। আর যারা কাজ করছে তাদের যথাযথ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। ’

উল্লেখ্য, ২০১৬ সাল শেষে দেশে ৩২টি লাইফ বীমা কম্পানির মোট সম্পদের পরিমাণ ২৯ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা, যা দুই বছর আগে ছিল ২৪ হাজার ৪৬৮ কোটি টাকা।   কম্পানিগুলো গত বছর প্রিমিয়াম আয় করেছে ছয় হাজার ৬৮৭ কোটি ৯০ লাখ টাকা,  যা ২০১৪ সালের তুলনায় ৪ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশ বেশি। ২০১৪ সালের তুলনায় ২০১৬ সালে লাইফ ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলোতে বিনিয়োগ বেড়েছে ১৫ শতাংশের বেশি।

পাশাপাশি গত বছর শেষে ৪৭টি নন লাইফ ইনস্যুরেন্সের সম্পদের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৯১১ কোটি টাকা, যা ২০১৪ সালে ছিল আট হাজার ৫৮৯ কোটি টাকা। গত বছর কম্পানিগুলোর মোট প্রিমিয়াম আয় হয়েছে দুই হাজার ২৬৭ কোটি টাকা, যা ২০১৪ সালের তুলনায় ৮১ শতাংশ বেশি।   এ ছাড়া দুই বছরের ব্যবধানে কম্পানিগুলোর বিনিয়োগ বেড়েছে প্রায় ৫৫ শতাংশ।


মন্তব্য