kalerkantho


সিমেন্টশিল্পে নতুন বিনিয়োগ হবে ৫০০০ কোটি টাকা

ফারজানা লাবনী   

৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৭ ০০:০০



সিমেন্টশিল্পে নতুন বিনিয়োগ হবে ৫০০০ কোটি টাকা

দেশের নির্মাণশিল্পের প্রসারে ইতিবাচক ভূমিকা রেখে চলেছে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ। কম্পানির মানসম্পন্ন সিমেন্ট ব্যবহূত হয়েছে মহাখালী ফ্লাইওভার, যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভার, পদ্মা সেতুসহ আরো অনেক প্রকল্পে। নির্মাণশিল্পে অনবদ্য অবদান রাখায় এবার শিল্প মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া ন্যাশনাল প্রডাক্টিভিটি অ্যান্ড কোয়ালিটি এক্সিলেন্স অ্যাওয়ার্ড পুরস্কার জিতে নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। এসব অর্জনে যাঁর ভূমিকা অনস্বীকার্য, তিনি হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশ লিমিটেডের পরিচালক (মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস) সৈয়দ আবু আবেদ সাহের।

কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হাইডেলবার্গ সিমেন্টের উন্নয়ন ও পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে সৈয়দ আবু আবেদ সাহের বলেন, ‘এ বছর উৎপাদনশীলতায় আমরা প্রথম স্থান অধিকার করেছি এবং এই খাতে দেশের সর্বোচ্চ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছি। সরকারের এ ধরনের পদক্ষেপ অবশ্যই শিল্প মালিকদের অনুপ্রাণিত করবে। আমরা প্রতিনিয়ত পণ্যের মান বাড়ানোর চেষ্টা করি। কারণ আমরা জানি গুণগত মানের পণ্য উৎপাদনই ব্যবসার সফলতার অন্যতম কারণ। একই সঙ্গে চূড়ান্ত পর্যায়ে উৎপাদনশীলতা বজায় রেখে ব্যবসা পরিচালনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যথাযথ পাওনা দেওয়া, কারখানায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাসহ আরো কিছু আমাদের এ সাফল্যের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। ’

এই উদ্যোক্তা আরো বলেন, ‘সাফল্যের ধারাবাহিকতায় দেশের সিমেন্ট বাজারের ১০ শতাংশ এখন হাইডেলবার্গ সিমেন্টের রয়েছে। আমাদের বাজার আরো বড় হবে।

কারণ দেশের ক্রমবর্ধমান নগরায়ণ নির্মাণসামগ্রীর বাজার গতিশীল করছে এবং পর্যায়ক্রমে সিমেন্টের চাহিদা বাড়াচ্ছে। বর্তমানে বাংলাদেশের সিমেন্টশিল্প বিশ্বের ৪০তম বৃহত্তম বাজারে পরিণত হয়েছে। দেশের সিমেন্টশিল্পের বর্তমান উৎপাদন ক্ষমতা ২.৮ কোটি টন, কিন্তু বাস্তবে ব্যবহূত হচ্ছে ২.২ কোটি টন। যা মোট উৎপাদন সক্ষমতার ৭৫-৮০ শতাংশ। চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত উৎপাদন ক্ষমতার কারণে সিমেন্টের মূল্যে একটা নিম্নমুখী প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যার কারণে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখে অনেকেই দাম কমাতে বাধ্য হচ্ছে। ’

সৈয়দ আবু আবেদ সাহের বলেন, যদিও বর্তমান বাজারে ৮ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে, তবুও ক্রমবর্ধমান চাহিদা এবং আসন্ন বছরগুলোতে ১৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা মাথায় রেখে অনেক প্রতিষ্ঠান তাদের সক্ষমতা বাড়িয়েছে, অনেকে বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে। সৈয়দ আবু আবেদ সাহের বলেন, ‘আগামী দুই বছরে এই শিল্পে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকা নতুন বিনিয়োগ হবে। তাতে উৎপাদন সক্ষমতা ৫০ শতাংশ বাড়বে বলে আশা করছি। অতিরিক্ত সক্ষমতার কথা মাথায় রেখে অনেকেই প্রতিবেশী দেশে রপ্তানি করছে, কিন্তু অপ্রতুল যোগাযোগব্যবস্থা এবং কর জটিলতার কারণে তা বৃহৎ পরিসরে সম্ভব হচ্ছে না। ’ তিনি জানান, গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ভারত ও মিয়ানমারে প্রায় ১৭ লাখ ডলার এবং তার আগের বছর ৩৯.৫ লাখ ডলার সমমূল্যের সিমেন্ট রপ্তানি হয়েছে। কর জটিলতার অবসান হলে এবং বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানের মধ্যকার আন্তর্জাতিক যোগাযোগের রুট তৈরি হলে রপ্তানির বাজার আরো সম্প্রসারিত হবে।  

সৈয়দ আবু আবেদ সাহের বলেন, ‘এই শিল্পের ভবিষ্যৎ বেশ আশাব্যঞ্জক। গ্রামীণ অর্থনীতির উন্নয়নের ফলে আমাদের দেশে অনেক নির্মাণকাজ হচ্ছে। বিশেষ করে সরকারি-বেসরকারি অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে সিমেন্টের চাহিদা দিনে দিনে বাড়ছে। বর্তমানে সিমেন্টের মোট চাহিদার ৬০ শতাংশই আসে মফস্বল থেকে। এ ছাড়া সরকার অনেক বড় বড় প্রকল্প হাতে নিয়েছে। যেমন—পদ্মা সেতু, মেট্রো রেল, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে ও কর্ণফুলী টানেল। এসব বড় প্রকল্পের প্রত্যেকটিতে বিপুল পরিমাণ সিমেন্টের প্রয়োজন।

তবে সিমেন্ট খাতে কিছু সমস্যাও আছে বলে মনে করেন সৈয়দ আবু আবেদ সাহের। তিনি বলেন,  দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে যোগাযোগব্যবস্থা সুগম না হওয়ায় সিমেন্ট পরিবহন বাধাগ্রস্ত হয়। বিভাগীয় শহর ও মহাসড়কগুলোর যানজটও সিমেন্ট পরিবহন বাধাগ্রস্ত হওয়ার অন্যতম কারণ। এ ছাড়া শিল্প খাতে উচ্চ জ্বালানি খরচ ও কাঁচামাল সমস্যা রয়েছে। তিনি বলেন, শুধু লাফার্জ ছাড়া অন্য সব কম্পানি সিমেন্টের মূল উপাদান ক্লিংকার আমদানি করে থাকে। বিশ্ববাজারে ক্লিংকারের উচ্চমূল্য অন্যতম সমস্যা।

এসব সমস্যার সমাধানে সৈয়দ আবু আবেদ সাহের কিছু সুপারিশ করেছেন। সুপারিশগুলো হলো দেশের যোগাযোগব্যবস্থা আরো উন্নত করা, যানজট নিরসনে কার্যকরী ও দীর্ঘস্থায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করা, সাশ্রয়ী মূল্যে জালানি নিশ্চিত করা এবং কাঁচামাল আমদানিতে নির্ভরশীলতা কমানো। তিনি বলেন, ‘এ বছরের এপ্রিলে নওগাঁয় ৫০ বর্গকিলোমিটারের একটি লাইমস্টোন খনি আবিষ্কৃত হয়েছে। সরকারের কাছে আমাদের দাবি, পরিকল্পিতভাবে লাইমস্টোন উত্তোলন নিশ্চিত করা। যার ফলে লাইমস্টোন আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে যাবে এবং উৎপাদন খরচ কমবে। ’ দেশের গ্যাস ক্ষেত্রগুলো থেকে পরিকল্পিতভাবে গ্যাস উত্তোলন নিশ্চিত করতে পারলেও জ্বালানিতে সাশ্রয় হবে বলে তিনি মনে করেন।

সৈয়দ আবু আবেদ সাহের বলেন, ‘আমরা প্রতিনিয়ত মানসম্পন্ন পণ্য তৈরি করে তা প্রতিযোগিতামূলক দামে ভোক্তার কাছে পৌঁছে দিতে চেষ্টা করি। এর পাশাপাশি দেশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাতে পৃষ্ঠপোষকতাও দিচ্ছি। আমরা বিপিএলসহ বিভিন্ন সময় একাধিক ক্রিকেট সিরিজে স্পন্সর করেছি। ’

ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে সৈয়দ আবু আবেদ সাহের বলেন, ‘বৃহত্তর ময়মনসিংহের নেত্রকোনা জেলার কেন্দুয়ায় বিস্তৃত হাওর এলাকায় আমার জন্ম। সব সময় চেয়েছি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে, তবে তা সত্ভাবে। সে লক্ষ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইবিএ ও এমবিএ শেষ করে নিজেকে প্রতিযোগিতামূলক চাকরির বাজারে একজন যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে গড়ে তুলি। আমি ১৯৯৫ সালে বাটা শু কম্পানিতে ম্যানেজমেন্ট ট্রেইনি হিসেবে যোগ দিই। বাটাতে প্রায় পাঁচটি ইন্টারন্যাশনাল ব্র্যান্ডে কাজ করার সুযোগ পাই। এরপর নোভার্টিজ বাংলাদেশে যোগ দিয়ে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করে যোগ দিই বার্জার পেইন্টস বাংলাদেশে। এখানে ভিন্ন ধরনের অভিজ্ঞতা নিয়ে আমি ডিরেক্টর, মার্কেটিং অ্যান্ড সেলস হিসেবে হাইডেলবার্গ সিমেন্ট বাংলাদেশে যোগ দিই। ’


মন্তব্য