kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চট্টগ্রাম-চীন জাহাজ চলাচল

আসে পণ্যভর্তি যায় খালি

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

১৬ অক্টোবর, ২০১৬ ০০:০০



আসে পণ্যভর্তি যায় খালি

আমদানি পণ্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম-চীন কনটেইনার জাহাজ সার্ভিস। দুটি কম্পানির তিনটি জাহাজ চীন থেকে আমদানি পণ্য ভর্তি করে চট্টগ্রাম এলেও ফিরতি পথে রপ্তানি পণ্য মিলছে একেবারে নগণ্য।

ফলে আমদানি পণ্যের ওপর ভিত্তি করেই জাহাজ চালাচ্ছে কম্পানিগুলো।

শিপিং লাইন সংশ্লিষ্টরা বলছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য ঘাটতি বেশি হওয়ায় পণ্য আমদানির বিপরীতে রপ্তানি সামান্য। ফলে জাহাজগুলোকে আমদানি পণ্যের ওপরই নির্ভরশীল থাকতে হচ্ছে। জানতে চাইলে এই রুটে প্রথম জাহাজ পরিচালনাকারী প্যাসিফিক ইন্টারন্যাশনাল লাইনের (পিআইএল) মহাব্যবস্থাপক আবদুল্লাহ জহির কালের কণ্ঠকে বলেন, জাহাজভর্তি আমদানি পণ্য নিয়ে চট্টগ্রাম এলেও ফিরতি পথে রপ্তানি পণ্য মিলছে খুব সামান্য। বাকিটা খালি কনটেইনার ভর্তি করেই জাহাজ চীনের উদ্দেশ্যে যাচ্ছে।

আবদুল্লাহ জহির আরো বলেন, ‘আমরা হিসাব কষে দেখেছি এই রুটে প্রচুর আমদানি হচ্ছে এবং ক্রমাগত বাড়ছে। ফলে ২০১১ সালে চালুকৃত প্রথম সার্ভিসকে কিছুটা পরিবর্তন করে নতুন রুট চালু করেছি। চিটাগাং চায়না সার্ভিস (সিসিএস) নামের এই রুট আমদানিনির্ভর হবে—এই ধারণা মাথায় রেখেই আমরা পণ্য পরিবহন শুরু করি। ফলে রপ্তানি পণ্য না পাওয়ায় হতাশের কিছু নেই। চীন থেকে ব্যবসায়ীরা সরাসরি পণ্য নিয়ে আসছে এটাই আমাদের তৃপ্তি। ’

শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানায়, সমুদ্রপথে বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের সরাসরি খোলা পণ্যবাহী জাহাজ এলেও কোনো কনটেইনার জাহাজ সার্ভিস ছিল না। চীন থেকে পণ্য সিঙ্গাপুর হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আনতে ২২ থেকে ২৫ দিন সময় লাগত। প্রতি কনটেইনার চীন থেকে সিঙ্গাপুরে পৌঁছার পর সেখানে পণ্য নামিয়ে রাখা হয়, পরে কনটেইনারটি আরেকটি জাহাজে তুলে চট্টগ্রামে আনা হয়। এতে ট্রান্সশিপমেন্ট খরচ এবং বাড়তি বসে থাকার জন্য প্রচুর মাসুল গুনতে হতো ব্যবসায়ীদের। এই সমস্যা দূর করতে সিঙ্গাপুরভিত্তিক পিআইএল কম্পানি ২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রাম-চীন রুটে সরাসরি কনটেইনার জাহাজ সার্ভিস চালু করে। দেশের ইতিহাসে চীন থেকে সরাসরি কোনো কনটেইনারবাহী জাহাজ আসার ঘটনা এটিই প্রথম। চালুর পর কনটেইনার পরিবহন বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ সংখ্যা বাড়িয়ে পাঁচটিতে নির্ধারণ করে পিআইএল। সরাসরি সার্ভিস চালু হওয়ায় ১৩ থেকে ১৫ দিনে পণ্য দেশে পৌঁছছে। চীন থেকে সরাসরি সার্ভিস চালু হওয়ায় এই খরচ প্রতি কনটেইনারে কমপক্ষে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার সাশ্রয় হয়। কিন্তু ফিরতি পথে রপ্তানি কনটেইনার সংকটে পড়ে সার্ভিসটির প্রথমে জাহাজ সংখ্যা কমানো হয়। চালুর সাত মাসের মাথায় লোকসানে পড়ে এই রুটে জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সেই রুটটি ছিল সাংহাই-নিমবো-নানশা-সিঙ্গাপুর-চট্টগ্রাম। ফিরতি পথে চট্টগ্রাম-সিঙ্গাপুর-লামচাবাং-সাংহাই রুটে পণ্য পরিবহন করত। সার্ভিসটির নাম ছিল বাংলাদেশ-থাইল্যান্ড-চায়না (বিটিসি)।

পরে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে সেই রুট পরিবর্তন করে চীনের নানশা-শিকোবন্দর-সিঙ্গাপুর-চট্টগ্রাম করা হয়। আর ফিরতি পথে পণ্য নিয়ে জাহাজটি চট্টগ্রাম-পেনাং-সিঙ্গাপুর-নানশা হয়ে পণ্য পরিবহন করছে। এই সার্ভিসের নামকরণ করা হয়েছে চিটাগাং-চায়না সার্ভিস (সিসিএস)। এই রুটে এখন জাহাজ চলছে সপ্তাহে একটি। পিআইএল বলছে, ‘আসা-যাওয়া মিলিয়ে ২৮ দিনে আমরা সার্ভিসটি পরিচালনা করি। কিন্তু চট্টগ্রাম বন্দরে জট হলে বাড়তি সময় যোগ হয় তার সঙ্গে। এই সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের ব্যবসায়ীরা প্রধানত চীন থেকে টাইলস, সিরামিকজাতীয় পণ্য আনে। ’

শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানায়, পিআইএলের সার্ভিসের পাশাপাশি ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে এমসিসি ট্রান্সপোর্টের এই রুটে সরাসরি কনটেইনার জাহাজ চলাচল শুরু করে। ‘সাংহাই সার্ভিস’ নাম দিয়ে সপ্তাহে চারটি জাহাজ দিয়ে পণ্য পরিবহন শুরু হলেও চালুর সাত মাসের মাথায় জাহাজের সংখ্যা একটিতে নেমে আসে। পরে অবশ্য তারাও রুট পরিবর্তন করে ‘এসএইচ-১’ নামে সার্ভিসটি চালু করে। বর্তমানে ‘এসএইচ-১’ একটি জাহাজ প্রতি সপ্তাহে সাংহাই বন্দর থেকে রওনা দিয়ে সিঙ্গাপুর বন্দর হয়ে চট্টগ্রাম আসছে ১৩ দিনে। আমদানি পণ্য বেড়ে যাওয়ায় নতুন আরেকটি সার্ভিস ‘ইন্ট্রা এশিয়া-৭’ চালু করে। এই রুটে ১৯ দিনে পণ্য আসছে চীনের সাংহাই ও ইয়ানতিয়ান বন্দর থেকে। সঙ্গে ভিয়েতনাম, সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ার পোর্ট কেলাং বন্দর হয়ে চট্টগ্রাম আসছে। এমসিসি কম্পানির সার্ভিসের মাধ্যমে বর্তমানে শিল্প-কারখানার কাঁচামাল, শিল্পের যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল পদার্থ, তৈরি পোশাক শিল্পের কাঁচামাল ও অ্যাকসেসরিজ এবং শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কনটেইনারে প্রচুর ফলমূল, আদা, রসুন ও পেঁয়াজ আমদানি হচ্ছে।

সার্ভিসটি কেমন চলছে জানতে চাইলে মার্কস লাইন বাংলাদেশের কান্ট্রি ম্যানেজার (অপারেশন) সারোয়ার আলম চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘একমাত্র আমরাই সরাসরি এই সার্ভিসটি চালু রেখেছি। দুভাবে বিভিন্ন দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে আমরা পণ্য পরিবহন করছি। ’ আমদানিনির্ভর হিসেবেই এই রুটটি চালু রাখার কথা স্বীকার করে সারোয়ার আলম আরো বলেন, ফিরতি পথে রপ্তানি পণ্য না মিললেও আমরা বড় প্রতিষ্ঠান বলেই চালু রাখা সম্ভব হয়েছে। সব সময় তো আর লাভ করলে চলে না, দেশের জন্যই কিছু করতে হয়। ’

সারোয়ার আলম মনে করেন, চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক জোন স্থাপন করলেও আমদানি বাড়বে, কিন্তু রপ্তানি বাড়বে বলে মনে হয় না। কারণ এখানে উৎপাদিত পণ্য ইউরোপ-আমেরিকায় রপ্তানি করা হবে। যে রকম কোরিয়ান ইপিজেড থেকে পণ্য বিভিন্ন দেশে রপ্তানি হচ্ছে।

 


মন্তব্য